মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বেলা ১১টায় রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কর্তৃক ‘আজাদী সংগ্রামের পটভূমিতে জুলাই বিপ্লব ২০২৪’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।

তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, যাঁরা এই সাহসী কাজ হাতে নিয়েছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমরা মনে করি না, এই বিপ্লবের প্রতি অবদানের কারণে আমাদের কৃতজ্ঞতা আদায় হয়ে যাবে। মোটেই তা মনে করি না। আমরা মনে করেছি, এটা আমাদের দায়িত্ব ছিল। ব্যাংককের হাসপাতালে যাঁদের দেখে এসেছি, তাঁদের অনেকেই এখনও ছটফট করছেন। কারও সারা শরীর অবশ হয়ে পড়ে আছে। সেখানকার ডাক্তাররা ইতোমধ্যে সার্টিফাই করে দিয়েছেন—জীবনে তিনি আর উঠে বসতে পারবেন না। এই মানুষগুলোর কথা যদি কেউ না ভাবে, যদি ক্ষমতা আমাদের এমনভাবে অন্ধ করে দেয় যে দুনিয়ার স্বার্থে আমরা সবকিছু ভুলে যাই, তাহলে সেটি হবে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

তিনি আরও বলেন, আমি আবারও অনুরোধ করব—আপনার আমার পছন্দ হোক বা না হোক, যার যেখানে যে অবদান রয়েছে, সেটি যেন আড়াল না হয়। আপনাদের কলমে, ইতিহাসের পাতায় সেই অবদান উঠে আসুক। একসঙ্গে একটি নির্ভুল ইতিহাস তৈরি হোক।

তিনি বলেন, আফসোসের বিষয়, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হতে চলল, অথচ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা হলো না। শুনেছি, মাত্র স্বল্পসংখ্যক শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান। বলা হয়, এত এত লক্ষ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, তাহলে তাঁদের সঠিক রেকর্ড কেন থাকল না?

তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সামনে আনতে হবে; এটা সরকারের দায়িত্ব। আমি সরকারকে অনুরোধ করব—আপনারা উদ্যোগ নিন, সঠিক ইতিহাসের সূচনা করুন। পরিবারগুলোকে স্বীকৃতি দিতে হবে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ২০২৪ সালের পরিবর্তনের আগে রাজনীতিবিদদের কণ্ঠে যে সুর ছিল, ৫ আগস্টের পর থেকে সেই সুর আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর পর তা ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। একটি বিশেষ রাজনৈতিক মহল নতুন ন্যারেটিভ দাঁড় করাচ্ছেন, বয়ান তৈরি করছেন।

আমীরে জামায়াত গণভোট প্রসঙ্গে বলেন, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে জনগণের অভিপ্রায় সর্বোচ্চ মর্যাদা পায়। গণভোটে ৭০ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে—সরকারি দল তা মানবে না, তা হতে পারে না। মানতেই হবে। ইনশাআল্লাহ, মানতে বাধ্য করা হবে।

জুলাই ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য আমাদের অনেক প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। আমাদের সোজাসাপটা কথা—জুলাই ভুলিয়ে দেওয়ার সকল অপচেষ্টা তছনছ করে দেওয়া হবে। জনগণ যে রায় দিয়েছে, সেটাই মানতে হবে। তার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাই না। কেউ করলে আমরা তা মানব না।

ফ্যাসিস্টদের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতগুলো মানুষ গুম হলেন, পঙ্গু হলেন, নির্যাতিত হলেন, মিথ্যা মামলার শিকার হলেন—তাঁদের বিচার এখন স্থবির হয়ে পড়েছে। আগের সরকারের সময় যেটুকু গতি ছিল, সেটাও এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খুনিদের অবশ্যই বিচার হতে হবে।

তিনি সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের গায়ে হাত দেবেন না। যাঁদের কারণে আজ আপনি সরকারে, সেই জুলাই যোদ্ধাদের চোখগুলো কেড়ে নেবেন না, হাত-পা ভাঙবেন না, এক ফোঁটাও রক্ত ঝরাবেন না। যদি রক্ত ঝরান, এটি অবশ্যই চরম নিমকহারামি হবে। যাঁদের রক্ত, সাহসিকতা ও সংগ্রাম আজকের বাংলাদেশকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলবেন না, বলার চেষ্টা করবেন না।

তিনি জাতির প্রতি প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে বলেন, আমরা কথা দিচ্ছি—এই প্রিয় জাতির প্রয়োজনে আমাদের যতটুকু সামর্থ্য আছে, সবটুকু দিয়ে আমরা কাজ করে যাব। আমরা এখানে কোনো ক্ষান্ত দেব না, কোনো কম্প্রোমাইজ করব না।

তিনি আরও বলেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে, যেকোনো সময়, দেশের স্বার্থে, যেকোনো বিষয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে রাজি আছি। কিন্তু জনগণের একটি সিঙ্গেল অধিকারকেও বিসর্জন দিতে হবে—এমন কোনো আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করব না, এই মাথা সমুন্নত থাকবে। দরকার হলে ফাঁসির তক্তায় যাব, আয়নাঘরে যাব—আল্লাহ যেটা নির্ধারণ করেছেন, সেখানে যাব। সবাই মিলে দেশের জন্য আমরা লড়ে যাব এবং বিজয় হবে, ইনশাআল্লাহ।

আইআরডি উপদেষ্টা ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির মো. নূরুল বুলবুল, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, মেজর (অব.) আখতারুজ্জাজামন প্রমুখ।