বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ছয়টি বিতরণ অঞ্চল বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ একটি সেবা খাত, এটি বেসরকারিকরণ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে এবং এই ষড়যন্ত্র সফল হবে না।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন (রেজি. নং-বি-১৫০৫)-এর মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন (রেজি. নং-বি-১৫০৫)-এর সভাপতি মাহবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক বুলবুল কবিরের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন সম্পাদক সোহেল রানা মিঠু, ডিপিডিসির সভাপতি আ ন ম বজলুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের, সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিন, সহ-সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ।
মানববন্ধনে প্রধান অতিথি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান নবাবগঞ্জের কানসাটের ট্র্যাজেডি স্মরণ করে দিয়ে বলেন, “দেশের বিদ্যুৎ খাত একটি সেবা খাত। এই খাতকে বেসরকারিকরণ কেন? এই সিদ্ধান্ত যাঁরা নিয়েছেন, জনগণের কাছে তাঁদের কৈফিয়ত দিতে হবে।” না হয় জনগণ জীবন দিয়ে তা রক্ষা করবে।
তিনি বলেন, “ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারের আমলে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির আদলে এস আলম গ্রুপকে ব্যবহার করা হয়েছিল। সরকারের ঘাড়ে এস আলমের প্রেতাত্মারা ভর করেছে। বর্তমান বিদ্যুৎমন্ত্রীও একই পথে হাঁটছেন। লুটপাটকারী এস আলম গ্রুপকে এই কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎমন্ত্রী ষড়যন্ত্র করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত যদি হয়ে যায়, তাহলে দেশের মানুষ জীবন দিয়ে হলেও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায় করবে, ইনশাআল্লাহ। চব্বিশ-পরবর্তী বাংলাদেশে যা খুশি তা করা যাবে না। বিদ্যুতের বর্ধিত বিল প্রত্যাহার করতে হবে। ভুতুড়ে বিল দিয়ে জনগণের পকেট কেটে আবার হারিকেনের যুগে ফেরত নিতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ছয়টি বিতরণ অঞ্চলকে বেসরকারিকরণের ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।”
বিদ্যুৎমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, “মাননীয় মন্ত্রী, আপনি কি এ দেশের মন্ত্রী, না কি কোনো একটা গোষ্ঠীর সঙ্গে আঁতাত করে এই সরকারকে বিতর্কিত করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন?”
বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “জনগণের ট্যাক্সের টাকায় প্রতিষ্ঠান নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনের মাধ্যমে এই প্রতিবাদের কথাগুলো সরকারের কর্ণগোচর করে দেবেন, যেন বিদ্যুৎ বিভাগ নিয়ে তালবাহানা বন্ধ হয়।”
বেসরকারিকরণের ফলে বিদ্যুৎ বিল আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে আতিকুর রহমান বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা গেলে তারা ইচ্ছামতো বিদ্যুৎ বিল বাড়াতে পারে। তখন সরকারও সাধারণ মানুষের জন্য কার্যকর কিছু করতে পারবে না। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে বিল বাড়িয়ে নেওয়া হবে। কোনো বেসরকারি সংস্থার হাতে বাংলাদেশের মানুষ আর জিম্মি হতে চায় না।
তিনি বলেন, “দুই হাজার টাকার একটি ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি ও তেলের দাম বৃদ্ধি করলেন—আমাদের পকেট থেকে প্রায় দশ হাজার টাকা কেটে নিলেন।”
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, “যারা আপনার আশপাশে আছে, তারা আপনাকে ভুল পরামর্শ দেয়, আপনাকে বিতর্কিত ও ফ্যাসিবাদী আচরণে বাধ্য করছে। জনগণের মাথায় একটি জগদ্দল পাথর চাপিয়ে দেওয়ার জন্যই বিদ্যুৎকে বেসরকারিকরণ করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমরা অনুরোধ করব, এই জনবিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না।”
গ্রামে বিদ্যুৎ না থাকা নিয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ করে তিনি বলেন, “জনগণকে বোকা মনে করবেন না। চব্বিশ-পরবর্তী বাংলাদেশে জনগণকে বোকা মনে করে যদি কিছু করতে চান, তাহলে হিতে বিপরীত হবে।”
ভুতুড়ে বিলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বর্ধিত বিল আদায় করা হলে সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বিদ্যুৎ ভবন ঘেরাও করে প্রতিবাদ করার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
বর্তমান সরকারের পাঁচ মাসের সময়ের প্রসঙ্গ টেনে আতিকুর রহমান বলেন, “মাত্র পাঁচ মাসে কিছু করতে পারি না, সময় দেন—এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। যে পারে, সে এক মাসে পারে। যারা পাঁচ মাসে পারে না, তারা পাঁচ বছরেও পারবে না।”
তিনি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ছয়টি বিতরণ অঞ্চল বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিদ্যুৎ শ্রমজীবীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করতে হবে। সাধারণ মানুষের পাশে সব সময় শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন থাকবে এবং আন্দোলন সফল হবে। সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে শ্রমিকরা।
বক্তব্যের শেষদিকে পুরোনো স্লোগান স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ দে, গ্যাস দে—নইলে গদি ছেড়ে দে।”
মানববন্ধনে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং বিদ্যুৎ খাতের শ্রমিক-কর্মচারীরা উপস্থিত থেকে বক্তব্য প্রদান করেন এবং সরকারের কাছে আট দফা দাবি জানান। দাবিগুলো হলো—
১. বিদ্যমান বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি না করে আধুনিকায়ন, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ ও যুগোপযোগী পরিকল্পনার মাধ্যমে লাভজনক করা।
২. চলমান সব শূন্য পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সমন্বয় করা।
৩. কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী বিদ্যুৎকর্মীদের যোগ্যতম পোষ্যদের নিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অপেক্ষমাণ অসহায় পরিবারগুলোকে বঞ্চনা থেকে মুক্তি দেওয়া।
৪. অবিলম্বে সিবিএ নির্বাচন দিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়নকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনা।
৫. পে-স্কেলের ঘোষণা দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
৬. আউটসোর্সিং ভিত্তিতে নিয়োজিত গাড়িচালকসহ সব কর্মচারীকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া।
৭. বোর্ডের কাজের স্বার্থে পদ শূন্য হলেই সময়সীমার পরিবর্তে দ্রুত পদোন্নতি দেওয়া।
৮. আবাসন সমস্যা নিরসনে বোর্ডের সব দপ্তরে আধুনিক মানসম্পন্ন বৈষম্যহীন সঠিক আয়তনের আবাসিক ভবন নির্মাণ করা।