ক্স সেচ সুবিধা নিশ্চিতে ঢাকায় লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত
ক্স গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না
অনেকটা ঘোষণা দিয়েই লোডশেডিং করতে যাচ্ছে সরকার। জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত এ ঘাটতি পূরণে লোডশেডিং করতে হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
লোডশেডিংয়ে গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি অনেক নাজুক এখন গ্রামের পাশাপাশি ঢাকা শহরেও লোডশেডিং দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। সরকার অকপটে বিদ্যুত সংকটের কথা স্বীকার করছে। সংকট উত্তরণে চলছে নানামূখী উদ্যোগ। সরকার ও বিরোধী দলের ১০ সদস্য নিয়ে কমিটি হয়েছে।
লোডশেডিংয়ে জনদূর্ভোগের কথা জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, লোডশেডিংয়ে মানুষের দুর্ভোগ হচ্ছে। স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই এই উত্তপ্ত গরমে আমাদের অনেকে বিদ্যুৎ সমস্যায় নাজেহাল হচ্ছেন। বিদ্যুৎ সমস্যা বর্তমান নির্বাচিত সরকারের নয়, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অব্যবস্থাপনার দায় আমাদের সবাইকে নিতে হচ্ছে। উৎপাদন ক্ষমতা কাগজে-কলমে বেশি থাকলেও বাস্তবতায় গড়মিল রয়েছে।’
এদিকে জ্বালানিসংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। তারা বলছে, গতকাল বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। একই সময়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি হতে পারে ৩ হাজার মেগাওয়াট। এ ঘাটতি পূরণে লোডশেডিং করতে হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিদ্যুৎ বিভাগ আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, বুধবার বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৬৮১ মেগাওয়াট। তার মানে, ২ হাজার ৮৬ মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং হয়েছিল।
সাংবাদিক সম্মেলন করেন বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা। তিনি জ্বালানির প্রস্তুতিতে ঘাটতি–সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা অনেক, কিন্তু গ্যাস ও জ্বালানি স্বল্পতার কারণে উৎপাদন করা যাচ্ছে না। গ্যাস ব্যবহার করে ৫ হাজার ২৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে গতকাল। যদিও উৎপাদনক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট; অর্থাৎ গ্যাসের স্বল্পতার কারণে অর্ধেকের কম উৎপাদন করা গেছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে হলে দিনে ২০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ প্রয়োজন। যদি ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসও সরবরাহ করা হয়, তাহলে ৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ কোটি ঘনফুট। উৎপাদন খরচ সাশ্রয় করতেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল কম ব্যবহার করা হয়।
সাংবাদিক সম্মেলনে বলা হয়, শিল্পাঞ্চল বেড়েছে, গরম বেড়েছে। বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। সব মিলিয়ে বিদ্যুতের চাহিদাটা অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু জ্বালানিসংকট অনেক বেশি।
কয়লাভিত্তিক ৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ। তবে ২৬ এপ্রিল এটি উৎপাদনে ফিরতে পারে। এ ছাড়া বাঁশখালীতে এসএস পাওয়ারের একটি ইউনিটে বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের কারণে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে। ২৮ এপ্রিল থেকে এটি পাওয়া যেতে পারে। আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ১ হাজার ৯৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, গ্রাম ও শহরের মধ্যে লোডশেডিং সমন্বয় করার নির্দেশনা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ, যাতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত না হয়। এ ছাড়া ভারসাম্য বজায় রেখে যাতে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তবে ঢাকা শহর লোডশেডিংমুক্ত রাখা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, বুধবার (২২ এপ্রিল) বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার মেগাওয়াট অথচ উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ১২৬ দশমিক ৩৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দিনে ২ হাজার ৮৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি; তাই লোডিশেডিং করতে বাধ্য হতে হচ্ছে।
জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকারি-বিরোধীদল এক হয়েছে জানিয়ে বিদ্যুত প্রতিমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি বিষয় নিয়ে সরকারি দল এবং বিরোধীদল বিষদ আলোচনা করেছে। এই আলোচনার সবচেয়ে বড় অর্জন যে টোন সেট হয়েছে অর্থাৎ ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ পরিচালনা করার। যার ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী ১০ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এটা জাতির জন্য নতুন পথের দিশা হয়ে থাকবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সাপ্লাই নিশ্চিত করার জন্য বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে আলোচনা করে পরামর্শ গ্রহণ করেছি।
এদিকে দিনাজপুরের পাবতীপুর বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে সচল ১ নম্বর ইউনিটটির উৎপাদন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে রয়েছে। বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ১ নম্বর ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পড়েছে দিনাজপুরসহ উত্তরের আট জেলা।
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক সাংবাদিকদেও জানান, কয়লার সঙ্গে পাথর আসায় ১ নম্বর ইউনিটের বয়লার পাইপ ফেটে ও কুলিং ফ্যান ভেঙ্গে গেছে। এতে বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন। তিনি আরও বলেন, মেরামত কাজ চলছে। মেরামত করে আবার উৎপাদন শুরু করতে ৪ থেকে ৫ দিন সময় লাগতে পারে। এর আগে দীর্ঘদিন থেকেই বন্ধ রয়েছে ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ২ নম্বর ইউনিট এবং ২৭৫ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ৩ নম্বর ইউনিট।
এদিকে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও উত্তরাঞ্চলের চাহিদা পূরণে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, অন্যদিকে সরবরাহে ঘাটতি। এতে মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েছেন উত্তরাঞ্চলের মানুষ। জাতীয় গ্রিড থেকেও মিলছে না চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ।
সেচ সুবিধা নিশ্চিতে ঢাকায় লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানান, গতকাল দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট,যার বিপরীতে উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে ১৪ হাজার ১২৬ দশমিক ৩৫ মেগাওয়াট। ফলে দেশজুড়ে ২ হাজার ৮৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। দেশের কৃষি খাতে সেচ ব্যবস্থা নির্বিঘœ রাখতে এবং শহর ও গ্রামের মধ্যকার বৈষম্য দূর করতে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
গ্রামের কৃষক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং তারা যেন পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পায়, সেটি নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রতিমন্ত্রী এই তথ্য জানান।
বিবৃতিতে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণের আস্থা কমে যাওয়ার কারণে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য আসলে সেখানে বিশ্বাস অর্জন করতে দেশবাসীর কিছুটা সময় লাগবে। তবে বর্তমান সরকার তাদের শপথের মর্যাদা এবং পবিত্র সংসদের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। বর্তমানের এই বিদ্যুৎ সমস্যা একদিনের নয়, বরং এটি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের পুঞ্জীভূত অব্যবস্থাপনার ফল। বর্তমানে কাগজে-কলমে উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশি থাকলেও বাস্তবতার সঙ্গে সেটির গড়মিল রয়েছে।’
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, বর্তমানে ফসল কাটার মৌসুম চলায় কৃষকদের সেচ কাজের সুবিধার্থে প্রধানমন্ত্রী নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বৈষম্যহীন বাংলাদেশের চেতনা সমুন্নত রাখতে রাজধানী ঢাকায় প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, জানান, দেশে প্রতিদিন ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে নিজস্ব উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে ২ হাজার ৬৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন ১ হাজার ১৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে। পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় দ্রুত গ্যাস আমদানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
সূত্র জানায়, একটি আমদানিকৃত বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য বর্তমানে বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এগুলো পূর্ণ উৎপাদনে ফিরলে সাত দিনের মধ্যে লোডশেডিং পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। জনগণের এই সাময়িক কষ্টের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ হয়।