• ৪ কোটি ৯৫ লাখ গ্রাহকের ঘাড়ে চাপতে বসেছে বাড়তি বিলের বোঝা
  • স্ল্যাব পরিবর্তন করে বাড়তি বিল নেয়ার উদ্যোগ

কামাল উদ্দিন সুমন : জ্বালানি তেল, এলপিজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চড়া দামের কারণে যখন দিশেহারা দেশের সাধারণ মানুষ ঠিক সেই সময়ে গ্রাহকদের ঘাড়ে চাপতে বসেছে বিদ্যুতের বাড়তি বিলের বোঝা। সরকার পাইকারি ও খুচরা দুই পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কথা ভাবছে। পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকদের বিলিং স্ল্যাব বা ধাপ পুনর্গঠনের প্রস্তাবও এসেছে। প্রস্তাব কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে মাসে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী নি¤œ-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর।

কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত দাম নিয়ে আজ বুধবার সকাল ১০ টায় খামারবাড়ি কেআইবি (কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন বাংলাদেশ) মিলনায়তনে শুরু হচ্ছে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি। দুই দিনব্যাপী শুনানিতে প্রথমদিনে থাকছে বিদ্যুতের পাইকারি দাম ও সঞ্চালন চার্জ বৃদ্ধির প্রস্তাব। দ্বিতীয় দিন ২১ মে বিতরণ কোম্পানিগুলোর গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি গ্রহণ করবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান লোকসানের কারণ দেখিয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে সঞ্চালন সংস্থাসহ দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে খুচরা পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের জন্য ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর আবেদন জমা দিয়েছে। প্রস্তাব অনুমোদন হলে দেশের প্রায় ৪ কোটি ৯৫ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক এর প্রভাবের মুখে পড়বেন।

বিদ্যমান ট্যারিফ কাঠামোর কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিতরণ সংস্থাগুলোর সম্মিলিত লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। তাদের আশঙ্কা, সমন্বয় না করা হলে ২০২৬ অর্থবছরে এই ঘাটতি ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। অধিকাংশ সংস্থাই আগামী ১ জুন থেকে নতুন দাম কার্যকর করতে চায়।

পর্যালোচনা করা নথিতে দেখা গেছে, সংস্থাগুলো শুধু পাইকারি ও সঞ্চালন ব্যয় নয়, নিজেদের পরিচালন ব্যয় ও জমে থাকা ঘাটতির বোঝাও গ্রাহকের ওপর চাপাতে চায়।

স্ল্যাব পরিবর্তনে বাড়বে বিল

পিডিবির প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আবাসিক গ্রাহকদের বিলিং স্ল্যাব পুনর্গঠন। বর্তমানে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী ‘লাইফলাইন’ গ্রাহক এবং ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা কম হারে বিদ্যুতের বিল দেন। এমনকি যারা মাসে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তারাও প্রথম ৭৫ ইউনিটের জন্য কম দরের সুবিধা পান। কিন্তু নতুন প্রস্তাবে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য এই সুবিধা তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, কেউ যদি ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাহলে পুরো ইউনিটের বিলই উচ্চ হারে গণনা করা হবে।

বর্তমানে ২০০ ইউনিট বিদ্যুতের জন্য (ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জ ছাড়া) বিল আসে ১ হাজার ২৯৫ টাকা। এর মধ্যে প্রথম ৭৫ ইউনিটের জন্য প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা এবং বাকি ১২৫ ইউনিটের জন্য ৭ টাকা ২০ পয়সা করে হিসাব করা হয়। শুধু স্ল্যাব পরিবর্তন কার্যকর হলেও একই পরিমাণ বিদ্যুতের বিল বেড়ে দাঁড়াবে ১ হাজার ৪৪০ টাকায়। কারণ তখন পুরো ২০০ ইউনিটই উচ্চ হারে গণনা হবে।

আর যদি প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ২০ পয়সা করা হয়, তাহলে ২০০ ইউনিট ব্যবহারের বিল দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৬৪০ টাকা। অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি।

পিডিবির হিসাবে,শুধু স্ল্যাব পুনর্গঠনের কারণেই প্রায় ৩৫ শতাংশ গ্রাহক বাড়তি বিলের চাপে পড়বেন। এর মধ্যে ২৩ শতাংশই নি¤œ-মধ্যবিত্ত পরিবার। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা রাজস্ব আসতে পারে বলেও হিসাব দিয়েছে সংস্থাটি।

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৪ কোটি ৩১ লাখের বেশি আবাসিক গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ শতাংশ লাইফলাইন গ্রাহক, যারা মাসে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। আরও ২২ শতাংশ গ্রাহক ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। অন্যদিকে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ গ্রাহক মাসে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। স্ল্যাব পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে এই শ্রেণির ওপর।

আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি সেচ পাম্প, নির্মাণ খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাণিজ্যিক ভবন, শিল্পকারখানা ও ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনগুলোর বিদ্যুতের দামও ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি ১৯ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। আর ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনগুলোর জন্য প্রস্তাবিত বৃদ্ধির হার প্রায় ২৪ শতাংশ।

সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে ইউনিট প্রতি ১.২০ টাকা (১৭ শতাংশ) থেকে ১.৫০ টাকা (২১ শতাংশ) দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদন খরচ পড়বে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ১২.৯১ টাকার মতো। বিদ্যমান পাইকারি দামে বিক্রিতে আয় হবে ৭৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। এতে করে ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। ইউনিট প্রতি ১.২০ টাকা (১৭ শতাংশ) বৃদ্ধি হলে ঘাটতি কমবে ১ হাজার ৩২৯ কোটি আর ১.৫০ টাকা (২১ শতাংশ) হারে দাম বাড়লে ঘটতি কমবে ১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।

ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (ডেসকো) তার প্রস্তাবে বলেছে, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত পাইকারি দাম ৩৬.৯৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ওই সময়ে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়েছে মাত্র ২৫.০২ শতাংশ। এতে করে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ হাজার ৬২ কোটি, পরবর্তী দুই অর্থবছরে যথাক্রমে ৯৫২ এবং ৫৯৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। লোকসান ঠেকাতে হলে দাম ৯.৬৭ শতাংশ বাড়ানো জরুরি।

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) তার প্রস্তাবে বলেছে পাইকারি দাম যে হারে বেড়েছে খুচরা দাম সে হারে বাড়েনি। তাই ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬৪৩ কোটি টাকা, পরের বছর ৩০২ কোটি, এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৩৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। লোকসান সামাল দিতে হলে ৬.৯৬ শতাংশ হারে দাম বাড়ানো প্রয়োজন।

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) তার প্রস্তাবে বলেছে, ৮০ টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নীট লোকসান দিয়েছে ১৬৯৮ কোটি টাকা। গ্রাহক পর্যায়ে দাম না বাড়লে চলতি অর্থবছরে ২ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা লোকসান হবে। লোকসান ঠেকাতে হলে ৫.৯৩ শতাংশ হারে দাম বাড়ানো প্রয়োজন। পাইকারি দাম বাড়লে ৫.৯৩ শতাংশের সঙ্গে সেই পরিমাণও যোগ করার আবেদন করেছে আরইবি।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) তার প্রস্তাবে বলেছে পাইকারি দামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খুচরা দাম বৃদ্ধি না হওয়ায় বিপিডিবির বিতরণ অঞ্চলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১২ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। লোকসান বন্ধ করতে হলে প্রতি ইউনিটে ২৯ পয়সা দাম বাড়ানো দরকার। এছাড়া পাইকারি দাম নতুন করে বৃদ্ধি পেলে সেই পরিমাণও যোগ করার আবেদন করেছে।

ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি তার প্রস্তাবে বলেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩১ কোটি লোকসান হয়েছে। লোকসান ঠেকাতে হলে ১০ শতাংশ হারে দাম বাড়াতে হবে।

সবচেয়ে কম ঘাটতি দেখিয়েছে নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো)। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের শহরাঞ্চলে বিতরণের দায়িত্বে থাকা কোম্পানিটি ইউনিট প্রতি ৩ পয়সা ঘাটতিতে রয়েছে। পাইকারি দাম নতুন করে ২০ শতাংশ বাড়লে, খুচরা দাম ২২ শতাংশ বাড়ানোর আবেদন করেছে।

দেশের ৫০টি গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ১২ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট। যা মোট উৎপাদন ক্ষমতার ৪৩ শতাংশ। ফার্নেস অয়েল ভিত্তিক ৫৪ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১৯ শতাংশ (৫৬৩৪ মেগাওয়াট), ডিজেল চালিত ৫ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষমতা ৩ শতাংশ, কয়লা চালিত ৮ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২২ শতাংশ (৬১৯৩ মেগাওয়াট), ১টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১ শতাংশ (২৩০ মেগাওয়াট) সৌর এবং বায়ু বিদ্যুতের ১৭টি কেন্দ্রের ক্ষমতা ৩ শতাংশ (৮২৯ মেগাওয়াট) এবং আমদানি করা হচ্ছে ৯ শতাংশ (২৬৩৬ মেগাওয়াট)।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, স্ল্যাব পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়ার এখতিয়ার বিতরণ সংস্থাগুলোর নেই। পিডিবি দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব করতে পারে, কিন্তু কীভাবে ঘাটতি মেটানো হবে তা তারা নির্ধারণ করে দিতে পারে না। স্ল্যাব সুবিধা বাতিল করলে মধ্যবিত্তরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের সুরক্ষার জন্যই স্ল্যাব প্রথা চালু করা হয়েছিল। এই ধরনের প্রস্তাব মূলত নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিইআরসি) রায়কে প্রভাবিত করার একটি অপচেষ্টা।

অধ্যাপক শামসুল আলম বিতরণ সংস্থাগুলোর এই ‘অযৌক্তিক ব্যয়’ গ্রাহকদের ওপর চাপানোর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, গত ১০-১৫ বছর ধরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দাম নিয়ে সংস্থাগুলো যে মুনাফা করেছে, তার হিসাব কোথায়?

তিনি বলেন, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় না এনে, উন্নয়নের নামে করা সব অবাস্তব খরচের দায় সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ বিইআরসির অনুমোদনের প্রয়োজন হলেও তারা কখনোই সেই নিয়ম তোয়াক্কা করেনি।