বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে হাজারো শহীদের রক্ত ও মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নের জন্ম হয়েছিল, তার অন্যতম ভিত্তি ছিল জুলাই জাতীয় সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার। কিন্তু গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সরকার সেই অঙ্গীকার থেকে ক্রমেই সরে যাচ্ছে। তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে প্রকৃত রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) যশোরে “২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি” শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রসুল এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও খুলনা-যশোর অঞ্চল পরিচালক মো. মোবারক হোসাইন এবং বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার এ.এস.এম. শাহরিয়ার কবীর।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, যে জুলাই সনদ পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো স্বাক্ষর করেছিল, আজ সেই সনদের আইনি ভিত্তি ও গণভোটের চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের পরিবর্তে সীমিত সংশোধনের পথে হাঁটা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রতারণার শামিল। রাষ্ট্রের দলীয়করণ, দুর্নীতি, প্রশাসনের রাজনৈতিক প্রভাব এবং জবাবদিহিতার সংকট দূর করতে হলে প্রকৃত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, জনগণের সরাসরি রায়ের মর্যাদা সর্বোচ্চ। গণভোটে জনগণ যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকার ও সংসদের। জনগণের সেই রায় উপেক্ষা করে ক্ষমতার রাজনীতি করা হলে নতুন করে বৈষম্য, সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হবে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংঘাত নয়, সংলাপের পথে আসুন। সব রাজনৈতিক পক্ষকে নিয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষার আলোকে রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নিন। অন্যথায় জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়ে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন আরও জোরদার হবে। তিনি বলেন, তাঁদের লক্ষ্য কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়, বরং জবাবদিহিমূলক, বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত এবং সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থেকে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার আন্দোলনে সক্রিয় থাকার আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মো. মোবারক হোসাইন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ, আহত ও পঙ্গুদের আত্মত্যাগ জাতি কখনো ভুলবে না। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী শুরু থেকেই শহীদ পরিবারের পাশে নীরবে সহযোগিতা করে আসছে। কিন্তু আহতদের অনেকেই এখনও প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সম্মান থেকে বঞ্চিত। তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনার সঙ্গে কোনো ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা দেশের মানুষ মেনে নেবে না। শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুদের যথাযথ মর্যাদা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি জুলাই সনদ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে জনগণ আবারও শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে নামতে প্রস্তুত রয়েছে। তিনি সবাইকে ধৈর্য, ঐক্য ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথি ব্যারিস্টার এ.এস.এম. শাহরিয়ার কবীর বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও জাতীয় পরিচয়ের বিভিন্ন বিষয় নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনা, সংবিধানের কিছু মৌলিক বিষয় এবং ভারতের ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা আলোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে ইসলামী মূল্যবোধ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। এসব মোকাবিলায় নেতাকর্মীদের ধৈর্য, সততা ও ঈমানের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সাংবাদিকদের তথ্য যাচাই করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে তিনি ন্যায়ভিত্তিক, ইনসাফপূর্ণ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান বাচ্চু, যশোর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা মো. আজীজুর রহমান, যশোর-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক, যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুক্তার আলী, নাগরিক পার্টির জেলা সমন্বয়ক নুরুজ্জামান, ভিপি আব্দুল কাদের, অধ্যাপক গোলাম কুদ্দুস, শামসুজ্জামান, আবুল হাশেম রেজা, নূর-ই-আলী, নূর আল মামুন ও যশোর শহর শিবির সভাপতি ওবায়দুল্লাহ। সভা সঞ্চালনা করেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা আবু জাফর সিদ্দিক।