শুধু জিপিএ-৫ অর্জনই সফলতা নয়; মেধার সঙ্গে সততা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের সমন্বয় ঘটিয়ে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। তিনি বলেন, মেধা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বড় নেয়ামত এবং এ নেয়ামত কীভাবে কাজে লাগানো হয়েছে, সে বিষয়ে কিয়ামতের ময়দানে জিজ্ঞাসা করা হবে।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ছাত্রশিবির ঢাকা জেলা দক্ষিণ শাখার উদ্যোগে রাজধানীর কেরানীগঞ্জের জিনজিরার সায়মন মাল্টিটিউড কমপ্লেক্স সেন্টারে এসএসসি, দাখিল ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত চার শতাধিক শিক্ষার্থীকে দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সকাল সাড়ে ৯টায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের হাতে ক্রেস্ট ও উপহারসামগ্রী তুলে দেন অতিথিরা। জেলা এইচআরডি সম্পাদকের কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে জেলা সভাপতি আবু ফাত্তাহ মোহাম্মদ তূর্যের উদ্বোধনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়।

Shibir President Calls for a Blend of Merit, Morality, and Patriotism.

শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, শিক্ষার্থীরা ক্লাস ওয়ানে যাত্রা শুরুর সময় প্রায় ২৭ লাখ ৫০ হাজার ছিল। কিন্তু ক্লাস নাইনে এসে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার শিক্ষার্থী নিবন্ধিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৯ লাখ শিক্ষার্থী মাঝপথে ঝরে পড়েছে। প্রতিকূলতার কারণে তাদের অনেকের ডাক্তার, প্রকৌশলী বা গবেষক হওয়ার স্বপ্ন থেমে গেছে।

জিপিএ-৫ ধরে রাখার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে তিনি বলেন, ২০২৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় ১ লাখ ৮২ হাজার শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় তাদের মধ্যে মাত্র ৬৯ হাজার শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ ধরে রাখতে পেরেছে। এমনকি জিপিএ-৫ পাওয়া প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থী এইচএসসিতে অকৃতকার্য হয়েছে। তাই বর্তমান সাফল্যে আত্মতুষ্ট না হয়ে শিক্ষার্থীদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

প্রচলিত শিক্ষা কাঠামোর সমালোচনা করে ছাত্রশিবির সভাপতি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা কাঠামো ব্রিটিশদের তৈরি করা, যা মূলত চাকরিনির্ভর মানসিকতা তৈরি করেছে। লেখাপড়া শেষে সরকারি চাকরি পাওয়াকেই সফলতা হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে। অথচ উদ্ভাবক বা উদ্যোক্তা হওয়ার চিন্তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে যথেষ্টভাবে তৈরি করা হয় না। উন্নত দেশগুলো উদ্ভাবকদের মূল্যায়ন করে।

মেধাবীদের দেশ গঠনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে, তাদের পড়াশোনার খরচের জোগান আসে দেশের সাধারণ করদাতাদের কাছ থেকে। রিকশাচালক, কৃষকসহ সাধারণ মানুষও এ ব্যয়ের অংশ বহন করেন। তাই মেধাবীদের দেশ গঠনে কাজে লাগাতে হবে।

নৈতিকতা ছাড়া মেধার অপব্যবহারের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষা শুধু গাড়ি-বাড়ি অর্জনের বিষয় নয়; শিক্ষা হলো শরীর, মন ও আত্মার সুষম বিকাশ। শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতা না থাকলে মেধাবী ব্যক্তিরাই রাষ্ট্রের বড় বড় পদে বসে দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট করতে পারেন। তাই মেধাকে এমনভাবে কাজে লাগাতে হবে, যাতে দেশ ও বিশ্ব উপকৃত হয়।

শিক্ষার্থীদের সময়ের সঠিক ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সামনে মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিযোগিতা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য স্থির করে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবের মতো ‘টাইম কিলিং মেশিনে’ সময় নষ্ট না করে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। মেধাবী হওয়ার পাশাপাশি নৈতিকতাসম্পন্ন ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য ও ঢাকা জেলা আমির মাওলানা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ট্যাগিং দিয়ে ছাত্রশিবিরকে দাবিয়ে রাখা হয়েছে। দেশের মানুষ ছাত্রশিবিরের কল্যাণমুখী কাজ সম্পর্কে জানে। ছাত্রশিবিরকে আর আটকানো যাবে না।

ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় জেনারেল ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম বলেন, প্রত্যেক কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। এই জবাবদিহির বিষয়টি সামনে রেখে নিজেদের তৈরি করতে পারলেই সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরি করা সম্ভব। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিনিয়ত এ ধরনের কাজ করে যাচ্ছে।

অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্যে জেলা সভাপতি আবু ফাত্তাহ মোহাম্মদ তূর্য ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় তাদের এক কর্মীকে গ্রেপ্তারের সময় নামাজের জন্য জায়নামাজে দাঁড়ানোর মুহূর্তে পুলিশ তাকে বলেছিল, ‘নামাজ অনেক পড়েছো, এখন জেলে গিয়ে নামাজ পড়বে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা নৈতিক জাতি তৈরির জন্য কাজ করছি এবং ভবিষ্যতেও করব, ইনশাআল্লাহ।’

ছাত্রশিবির ঢাকা জেলা দক্ষিণের সেক্রেটারি ইব্রাহীম মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক আনিসুল রহমান, সাবেক ঢাকা জেলা দক্ষিণ সভাপতি আব্দুর রহিম মজুমদার ও আমিনুল ইসলাম।

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা জেলার নায়েবে আমির অধ্যক্ষ শাহানুল ইসলাম, জেলা দক্ষিণের অফিস সম্পাদক নাজমুল হোসেন, জেলা অর্থ সম্পাদক সাব্বির আহমেদ, জেলা প্রচার সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম, জেলা সাহিত্য সম্পাদক রাকিবুল ইসলামসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।