স্টাফ রিপোর্টার

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এই (গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের) দাবি থেকে সরে আসতে আমাদেরকে লোভ দেখানো হয়েছে, চাপও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কোনো লোভ কিংবা চাপ আমাদেরকে জনগণের গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবি থেকে একচুলও সরাতে পারবে না। প্রয়োজনে জীবন যাবে তবুও জনগণের সাথে সরকারের মতো বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না, করবও না।

গতকাল বুধবার সকালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন ও জুলাই গণহত্যায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেইটে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, আজকের প্রধানমন্ত্রী নিজেও নির্বাচনের আগে সংস্কারের পক্ষে দেশবাসীকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের দিনেই বিএনপির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রীসহ তাঁর দলের সকল সংসদ সদস্য জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকা করেছে। তাঁরা গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ করেননি। এর মাধ্যমে তারা শুধু জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকাই করেননি, তাঁরা জাতির সঙ্গে ধোঁকাবাজিও করেছেন।

তিনি আরও বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছেন, যারা রক্ত দিয়েছেন তাদের সকলকে আমি দায়বদ্ধতার সাথে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। ১৯৭১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত যতজন মানুষ দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন সকল শহীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং আহতদের সুস্থতা কামনা করছি।

জামায়াত আমীর বলেন, জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বের ক্রেডিট তরুণ প্রজন্মের। দেশবাসীর জীবন ও রক্তের ফসল হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান। এই আন্দোলনে একক কোনো ব্যক্তি বা দল মাস্টারমাইন্ড দাবি করলে জাতি সেটি মানবে না, বরং ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করবে। আমরা জুলাই যোদ্ধাদের বিভাজন চাই না। তাদেরকে নিয়ে রাজনীতি করা পছন্দ করি না।

তিনি বলেন, এখনো হাসপাতালে জুলাই যোদ্ধারা কাতরাচ্ছে, ঘরে বিছানায় পড়ে কাতরাচ্ছে কিন্তু তাদের দিকে সরকার তাকাচ্ছে না। শহীদ পরিবারের দায়িত্ব ও আহতদের পুনর্বাসন করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। কিন্তু সরকার সেই কর্তব্য পালনের পরিবর্তে ভিন্ন পথে হাঁটছে।

তিনি আরও বলেন, ওনারা (সরকার) বলছেন, মাত্র ৫ মাসে আমরা (বিরোধী দল) এতো ব্যস্ত হলাম কেন? আমি তাদের পাল্টা প্রশ্ন করবো, মাত্র ৫ মাসে আপনারা এতো বিশ্বাসঘাতকা করলেন কেন? কেন ফ্যাসিবাদের ফটোকপি হিসেবে আবির্ভূত হলেন? এজন্যই আরেকটি বিপ্লব অনিবার্য।

তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই হবে আপসহীন, তীব্র এবং বিজয় ছিনিয়ে আনার। জনগণের অধিকার হরণ হলেই অগ্নিগিরি হয়ে আমরা জ্বলে উঠব।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর আল্লামা মামুনুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গণসমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপির) চেয়ারম্যান, সাবেক মন্ত্রী ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, আমি বিগত কয়েকমাস থেকে প্রধানমন্ত্রীকে বারবার অনুরোধ করেছি বিভেদ সৃষ্টি করবেন না। আমাদেরকে এমন জায়গায় ঠেলে দেবেন না যাতে আমাদের রাজপথে নামতে বাধ্য হতে হয়। কিন্তু আপনি আমাদের সেই অনুরোধ শুনেননি। আপনার দলের নেতারা আপনাকে পতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আজকে আপনার দলের নেতারা আমাকে রাজাকার বানাচ্ছে। আপনার মা বেগম জিয়া জামায়াতের সমর্থনে ১৯৯১ সালে সরকার গঠন করেছে, ২০০১ সালে সরকার গঠন করেছে তাহলে কী আপনার মা বেগম জিয়া রাজাকার ছিলেন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, রাজাকার রাজাকার বয়ান এখন আর জনগণ শুনতে চায় না। এই বয়ান বহু আগে শেষ হয়ে গেছে।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, যেখানেই যাই মানুষের সর্বত্র একটাই দাবি গণভোটের রায় বাস্তবায়িত হতে হবে। তিনি আরও বলেন, গতকাল প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দিয়েছেন ফ্যাসিবাদ বিরোধী ঐক্য অটুট রাখতে হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, আর যা ঘটিয়েছেন তার মাঝে কোনো মিল আছে কি-না প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, একদিকে দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল, যুবদলের হেলমেট বাহিনীকে দিয়ে বিরোধী দলমতকে আক্রান্ত করবেন, রক্তাক্ত করবেন আরেকদিকে বলবেন ঐক্য বজায় রাখতে! এটাই ফ্যাসিবাদের আচরণ।

জাতীয় নাগরিক পার্টির মূখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমীর লন্ডন চুক্তির পার্ট হয়ননি। তিনি আজ জুলাই জাদুঘর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়েও সেখানে না গিয়ে রাজপথে জনতার কাতারে এসে হাজির হয়েছেন। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আমীরে জামায়াতের প্রশংসা করে বলেন, আমীরে জামায়াত এক দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই সিদ্ধান্ত হচ্ছে সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে সরকারের সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ না দেওয়া।

নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমীর মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী বলেন, গণভোটের গণরায় অবজ্ঞা করার কোনো সুযোগ নেই। তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, গণভোটের গণরায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে পরিণতি ভয়াবহ হবে, যা কল্পনাও করতে পারবেন না।

আমার বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ৫ আগস্ট মানে মুক্তি। তিনি আরও বলেন, আজকের বিএনপি বেগম জিয়ার বিএনপি নয়। এই বিএনপি আপসকামী বিএনপি। এই বিএনপি গণবিরোধী কাজ করে হাসিনার পথে যাত্রা শুরু করেছে। বিএনপি যদি হাসিনার পথেই হাঁটতে থাকে প্রয়োজনে আমরা আবারও গুপ্ত হবো। তবুও গণভোটে জনগণের গণরায় বাস্তবায়নের দাবি আমরা আদায় করবই, করব।

বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, বিএনপির ইতিহাস হচ্ছে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করা। সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, অতীত ভুলে যাবেন না। নব্য স্বৈরাচার হবেন না। নতুবা জনগণের রোষাণল থেকে রক্ষা পাবেন না।

জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, আজকের এই দিনে ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়ে গেছে। কিন্তু ২ বছর যেতে না যেতেই নতুন সরকার আবারও সেই পুরোনো ফ্যাসিবাদ ফিরিয়ে এনেছে।

গুম প্রতিরোধ আইনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এই আইনে গুমের শিকার পরিবারের আবেদন তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপর দেওয়া হয়েছে। ওই আইনে বলা হয়েছে পুলিশ যদি আদালতে রিপোর্ট দেয় গুমের শিকার পরিবারের আবেদন সঠিক নয়, তবে আদালত গুমের শিকার পরিবারের আবেদনকারীকে ৫ বছরের কারাদ- দেবে! স্বৈরাচারি আইন করায় তিনি বলেন, বাহ্ বিএনপি চমৎকার, তোমারই নতুন স্বৈরাচার।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, গতকাল বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালে আপনার হেলমেট বাহিনী যেই ন্যক্কারজনক সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে এই হেলমেট বাহিনী বিগত ১৫ বছর কোথায় ছিল? ক্ষমতার জোরে আবারও বিরোধী দলমতকে নিঃশেষ করতে বিএনপি সরকার চেষ্টা চালাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিরোধী দলমতকে নিঃশেষ করাই ফ্যাসিবাদির সংস্কৃতি।

বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন বলেন, ক্ষমতা গ্রহণের পাঁচ মাসের মধ্যেই তারেক জিয়ার সরকার স্বৈরাচার সরকারের রূপ জাতিকে দেখিয়েছে। তারা ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সহ রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করেছে। আবারও একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চলেছে। নব্য স্বৈরাচারকে আবারও বিপ্লবের মাধ্যমে জবাব দেওয়া হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি করেন।

সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেন, নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং করে ড. ইউনূস বিএনপিকে ক্ষমতায় বসিয়েছে তার উজ্জল দৃষ্টান্ত আজ সকালে ড. ইউনূসকে প্রধানমন্ত্রীর পেছনে পেছনে ব্যাগ নিয়ে হাঁটতে দেখা গেছে।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, গণভোটের গণরায় উপেক্ষা করে বিএনপি গণবিরোধী কাজ করেছে। এরজন্য বিএনপিকে চরম মূল্য দিতে হবে। বিদেশি প্রভুদের আনুগত্য ছেড়ে জনগণের গণরায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর আল্লামা মাওলানা মামুনুল হক বলেন, অতীতের সন্ত্রাস নির্ভর রাজনীতি বাংলাদেশে আর চলবে না। এজন্য হেলমেট বাহিনী সন্ত্রাস নির্ভর রাজনীতি থেকে ফিরে আসতে সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, এই ধারা বজায় রাখলে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের হেলমেট বাহিনী সন্ত্রাসীদের যেই পরিণতি হয়েছে তারচেয়ে করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেড় হাজার জুলাই শহীদ, ৩০ হাজারের অধিক আহত পঙ্গুত্ব বরণকারী জুলাইযোদ্ধার রক্তের বিনিময়ে গণভোটের গণরায় উপেক্ষার কোনো সুযোগ নেই। ক্ষমতায় থাকতে চাইলে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দুটি ভোটেরই ফলাফল মানতে হবে এবং বাস্তবায়ন করতে হবে।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিকের যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠিত গণসমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপির) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মোহাম্মদ ফয়সাল, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন, আমার বাংলাদেশ পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত উল্লাহ টুটুল, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির মহাসচিব নিজামুল হক নাঈম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মুখপাত্র নাজমুল ইসলাম তালুকদার প্রমুখ।

এ সময় আরোও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর আব্দুস সবুর ফকির এবং এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলাওয়ার হোসেন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মোহাম্মদ কামাল হোসেন এমপি, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এমপি, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি। এছাড়াও ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও মহানগরীর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।