বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেছেন, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রতিটি পর্যায়ে শ্রমিকের ঘাম ও রক্ত জড়িয়ে আছে। অথচ স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মানে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি ইসলামী শ্রমনীতির আলোকে দেশের শ্রম আইন গঠন করতে হবে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাজবাড়ীতে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন জেলা শাখার উদ্যোগে নান্নু টাওয়ার কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত শ্রমিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট রনজু বিশ্বাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশ সঞ্চালনা করেন জেলা সাধারণ সম্পাদক কবির উদ্দীন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জেলা প্রধান উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম, বিআরইএল কেন্দ্রীয় সভাপতি আক্তারুজ্জামান, কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক আজহারুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন সম্পাদক সোহেল রানা মিঠু, কেন্দ্রীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সম্পাদক এসএম শাহজাহান, কেন্দ্রীয় কর্মসংস্থান সম্পাদক গোলাম রসুল খান, বাংলাদেশ পরিবহন ফেডারেশনের সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, উপদেষ্টা হাসমত আলী হাওলাদার, আলীমুজ্জামান প্রমুখ।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাকালীন ভূমিকা তুলে ধরে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, “এটি বাংলাদেশের একটি প্রাচীনতম শ্রমিক সংগঠন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ সংগঠন দেশের শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণ, জীবনমান উন্নয়ন, অধিকার আদায় এবং শ্রমিকের মুক্তির জন্য লড়াই করে আসছে।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে এমন কোনো অর্জন নেই, যে অর্জনের পেছনে শ্রমিকদের ভূমিকা নেই। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সবকিছুর সঙ্গে শ্রমিকের ঘাম ও রক্ত জড়িত।”
দেশের বিভিন্ন গণআন্দোলনে শ্রমিকদের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৬৯-এর গণআন্দোলন, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ দেশের বিভিন্ন ক্রান্তিকালে শ্রমিকরা অগ্রভাগে থেকে লড়াই করেছেন। অনেক শ্রমিক জীবন দিয়ে শহীদ হয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রাজবাড়ীর কৃষি শ্রমিকদের অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জেলার কৃষি শ্রমিকরা মাঠে ফসল ফলিয়ে দেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে এমনকি বজ্রপাতে মৃত্যুর ঝুঁকি উপেক্ষা করেও তারা কৃষিকাজ করে যাচ্ছেন। অথচ তাদের জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি।
গার্মেন্টস ও প্রবাসী শ্রমিকদের অবদানের কথাও তুলে ধরেন আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের শ্রম দেশের রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখছে। একইভাবে প্রবাসী শ্রমিকরা কঠোর পরিশ্রম করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। পরিবহন, নির্মাণসহ দেশের এমন কোনো খাত নেই, যেখানে শ্রমিকদের অবদান নেই।
শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, একসময় শ্রমিকদের দাসের মতো ব্যবহার করা হতো। তাদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা মজুরির কোনো বিধান ছিল না। পরবর্তীতে শ্রমিকদের আন্দোলনের মাধ্যমে আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম ও আট ঘণ্টা বিনোদনের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে বাংলাদেশে এখনো অনেক শ্রমিক আট ঘণ্টার কর্মঘণ্টা থেকে বঞ্চিত।
তিনি বলেন, “শ্রমিকদের দিয়ে আট ঘণ্টার বেশি কাজ করানো হলে অবশ্যই ওভারটাইমের মজুরি দিতে হবে। রাষ্ট্রের উচিত এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।”
সম্প্রতি অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত মজুরি কাঠামোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, “বর্তমান বাজারদর, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বাস্তবতায় এই মজুরি নির্ধারণ হাস্যকর। একটি পরিবারের মাসিক খরচ কত হতে পারে, বর্তমান পরিস্থিতি কী—এসব বিবেচনা না করে পুরোনো ফরমুলায় মজুরি নির্ধারণ করা বৈষম্য। এ বৈষম্য চলতে দেওয়া যায় না।”
চা শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। আতিকুর রহমান বলেন, চা-বাগানের শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের মজুরি, চিকিৎসা, পুষ্টি ও সন্তানদের শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “গার্মেন্টস শ্রমিকদের সাড়ে ১২ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ একটি শ্রমিক পরিবারের মাসিক খরচ ২৬ থেকে ২৭ হাজার টাকা। সেখানে সাড়ে ১২ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণ অমানবিক।”
তিনি আরও বলেন, দেশে কলকারখানা ও শিল্পকারখানা বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি সেভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে না। মজুরি বৃদ্ধির দাবি উঠলেই অনেক ক্ষেত্রে ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটে। ফলে ভয়ে অনেক শ্রমিক তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে চান না।
বিগত সরকারের সময়ে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলার সুযোগ ছিল না দাবি করে আতিকুর রহমান বলেন, “আজ পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তাই আমরা কথা বলছি। অধিকার আদায়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হবো। আমরা কথা বলেই যাব। জেল-জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করেও দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাব না।”
শ্রমিকদের স্থায়ী সমস্যা সমাধানে ইসলামী শ্রমনীতির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের শ্রমিকরা শোষিত, নির্যাতিত ও অধিকারহারা। ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত ও শ্রমিকদের বৈষম্য থেকে মুক্ত করতে ইসলামী শ্রমনীতির আলোকে বাংলাদেশের শ্রম আইন গঠন করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “শ্রমিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হলে ইসলামের শ্রমনীতি দিয়ে বাংলাদেশের শ্রম আইন গঠন করতে হবে। এর মাধ্যমেই শ্রমিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।”
সমাবেশে বক্তারা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, কর্মঘণ্টা, কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান। পাশাপাশি শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে নিজেদের অধিকার আদায়ে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।