বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিএনপি সরকার গণভোটের রায় বাতিল করে দিয়েছে। তিনি বলেন, "যে সরকার দেশের ৭০ শতাংশ জনগণের গণভোটের রায় বাতিল করে, তাদেরকে জনগণের সরকার বলা যায় না।" তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, "কোনো ফ্যাসিবাদী সরকারকে বাংলাদেশের জনগণ বেশিদিন বরদাস্ত করেনি, করবে না। হাসিনার পথে হাঁটলে হাসিনার মতোই বিদায় নিতে হবে।"
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে রোববার (২ আগস্ট) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে সায়েন্স ল্যাব মোড়ে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় তিনি আরও বলেন, "রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের জন্য জনগণ জুলাই বিপ্লবে জীবন দিয়েছে এবং গণভোটে সংস্কারের পক্ষে 'হ্যাঁ' ভোট দিয়েছে। সরকার গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে আজ হোক কাল হোক নাকে খত দিয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বাধ্য করা হবে।" তিনি বলেন, "বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও মেনে নিতে চায়নি। পরবর্তীতে আন্দোলনের মুখে নাকে খত দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মেনে নিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে বিদায় নিয়েছিল। এখনো সময় থাকতে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে তা বাস্তবায়নে বাধ্য করা হবে।"
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ষড়যন্ত্রের সরকার হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিল উল্লেখ করে মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, "অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন উপদেষ্টা নিজে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে, জামায়াতে ইসলামীকে তারা মেইনস্ট্রিম হতে দেননি! আরেকজন উপদেষ্টা বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এতে বোঝা যায়, ইউনূস সরকারের অনেক উপদেষ্টা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে লিপ্ত ছিলেন।"
তিনি আরও বলেন, "জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে, এখনো হচ্ছে। তবে যারাই জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করেছে, তাদেরকেই নিঃশেষ হতে হয়েছে। কেউ জামায়াতে ইসলামীর অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি, পারবে না।"
চব্বিশের ১ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করে—এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রশ্ন রাখেন, "কিন্তু তারা কেন জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করেছিল?" তিনি উল্লেখ করেন, জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকে ছাত্ররা সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ওই আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় পেশিশক্তি প্রয়োগ করে। রংপুরে আবু সাঈদকে হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, রিকশা-ভ্যানচালক, কবি-সাহিত্যিক, শিক্ষক-অভিভাবক, সাংবাদিক, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সকল শ্রেণি-পেশার সাধারণ জনতা ছাত্রদের সাথে আন্দোলনে যুক্ত হয়।
সরকার যখন দেখে আন্দোলন কোনোভাবেই দমানো যাচ্ছে না, তখন সরকারের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, 'এই আন্দোলন ছাত্রদের নয়, এই আন্দোলন জামায়াত-শিবিরের'। পরবর্তীতে শেখ হাসিনা তাঁর শরিক ১৪ দলের সঙ্গে আলোচনা করে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ১ আগস্ট নিষিদ্ধ করে। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার ৩ দিনের মাথায় ৫ আগস্ট হাসিনা তাঁর দলবল নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
অথচ আন্দোলনে যাদেরকে রাজপথে দেখা যায়নি, যাদের দলের মহাসচিব বলেছিলেন 'এই আন্দোলন ছাত্রদের, এই আন্দোলনের সাথে তাঁর দল বা দলের কেউ জড়িত নয়'—এখন তারাই দাবি করছে ওই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড নাকি তারা! তিনি প্রশ্ন রাখেন, "যদি জুলাই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড তারাই হয়, তবে জুলাইয়ের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষা কেন তারা ধারণ করতে পারছে না? কেন সরকার গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছে না? কারণ, সরকার জুলাই বিপ্লবকে স্বীকার করে না, বিশ্বাস করে না, ধারণ করে না।"
কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডাকসু ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেন, "যাঁরা বিপ্লবের ফসল ভোগ করছেন, তাঁরাই বিপ্লবকে অস্বীকার করছেন। বিপ্লব-পরবর্তী সরকার জনগণের সরকারে পরিণত হতে পারেনি, তারা বিএনপির দলীয় সরকারে পরিণত হয়েছে। যার কারণে তারা সর্বত্র দলীয়করণ করছে। রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সকল প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতাদের নিয়োগ দিচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত দলীয় প্রার্থী ও দলীয় নেতাদের সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা নির্বাচনের পর সংস্কারের পরিবর্তে পুরোনো ফ্যাসিবাদের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছে। তারা নির্লজ্জের মতো বলছে, নির্বাচনের জন্য তারা সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছিল! যারা কথা দিয়ে কথা রাখে না, তারাই প্রতারক, তারাই মুনাফিক। বিএনপি জাতির সাথে প্রতারণা করেছে, মুনাফেকি করেছে।"
জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জসীম উদ্দীন সরকার, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলাওয়ার হোসেন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মোহাম্মদ কামাল হোসেন এমপি, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি আব্দুস সালাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য যথাক্রমে অ্যাডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন, অধ্যাপক নুর নবী মানিক, আব্দুর রহমান প্রমুখ।
সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন বলেন, "জুলাইয়ের চেতনাই হচ্ছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই, জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াই, শোষণ ও জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াই। আমাদের শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আমাদের সেই লড়াই চলবেই। যতক্ষণ না গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে, ততক্ষণ আমাদের আন্দোলন চলতেই থাকবে।"