টানা আট মাস পর খরা কাটছে বাংলাদেশের তৈরি পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানির। ফলে চলতি অর্থবছরের এপ্রিল মাসে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৪ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সর্বেশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রকাশিত ইপিবির প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪০০ কোটি ৯৯ লাখ ৩০ হাজার ডলারে। যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ ৪০ হাজার ডলার। অর্থাৎ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ।

শুধু গত বছরের একই সময়ের তুলনায়ই নয়, চলতি বছরের মার্চের তুলনায় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ১৫ দশমিক ২০ শতাংশ। মার্চে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৩৪৮ কোটি ৭ লাখ ২০ হাজার ডলার।

রপ্তানি আয় বাড়ার চার কারণ উল্ল্যেখ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেছেন, রপ্তানি প্রত্যাশা তুলনায় অনেক ভালো করেছে। তার প্রথম কারণ, ৪০০ কোটি ডলার রপ্তানি আসলে আমাদের স্বাভাবিক রপ্তানি যা কিনা গত জুলাইয়ের পর থেকে অসাভাবিক কমে গিয়েছিল ট্রাম্প শুল্ক আর আমাদের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প শুল্ক অবৈধ ঘোষণা এবং আমাদের মসৃন রাজনৈতিক উত্তরণের পর এই দুই অনিশ্চয়তা কেটে গেছে।

দুই, যুক্তরাষ্ট্রে চাহিদায় এখন পর্যন্ত শুল্ক বা যুদ্ধের কোনও প্রভাব দেখা যায়নি। যার ফলে আমাদের রফতানি চাহিদায় পতন ঘটেনি।

তিন, ইউরোপীয় বাজারে ভারত ও চিন থেকে প্রতিযোগিতা সুপ্রিম কোর্ট রুলিংয়ের কারণে কমে থাকতে পারে কারণ তারা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে হারানো বাজার ফিরে পেয়েছে।

চার, আমাদের দেশে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার উন্নতি হয়েছে। আগের মতো এখন আর কারণে অকারণে রাজপথ রেলপথ অবরোধ করা, যা পণ্য পরিবহনে বড় বাধা তৈরি করত, তা হচ্ছে না। ফলে ক্রেতাদের আস্থা ফিরে আসছে হয়তো। তবে চলমান মধ্যপ্রাচের যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকট রফতানির জন্য এখনও বড় ঝুঁকি। কাজেই আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। এপ্রিলের রফতানি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আশার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটা আগামীতে ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ এখনও কাটেনি।

প্রতিবেদন অনুসারে, বিদায়ী মাস এপ্রিলের এর আগে চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। তারপরের মাস আগস্ট থেকে গত ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত টানা আট রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ছিল। গত আগস্টে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ নেতিবাচক ছিল আর মার্চে নেগেটিভ ছিল ১৮ দশমিক ০৭ শতাংশ। তারপর চলতি বছরের এপ্রিলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হল ৩৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জুলাইÑএপ্রিল সময়ে মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৩৯ কোটি ৬৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৪ হাজার ০২০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার–সে তুলনায় ২ দশমিক ০২ শতাংশ কম। তবে সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির ধারা ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী মাসগুলোতে এই ব্যবধান কমে আসতে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির মূলভিত্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত তার আধিপত্য বজায় রেখেছে। এ খাতে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩ হাজার ১৭১ কোটি ৯৩ লাখ ডলার, যা বছরওয়ারি ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে আরএমজি রপ্তানি দাঁড়ায় ৩১৪ কোটি ৯ লাখ ডলার, যা ২০২৫ সালের এপ্রিলের ২৩৯ কোটি ৩৭ লাখ ৮০ হাজার ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। যদিও আগের সময়ের মোট ৩ হাজার ২৬৪ কোটি ১ লাখ ২০ হাজার ডলারের তুলনায় সামান্য কম, তবুও মাসভিত্তিক শক্তিশালী পারফরম্যান্স খাতটির স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির ধারা তুলে ধরে।

রপ্তানি গন্তব্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো প্রধান বাজারে বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ৪৩ দশমিক ০১ শতাংশ ও ২৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের শীর্ষ ২০টি রপ্তানি গন্তব্যের সবগুলোতেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে, যা বৈশ্বিক চাহিদার বিস্তার এবং বাজার বৈচিত্র্েযর ইঙ্গিত দেয়।