- ডিম সবজির বাজারে অস্বস্তি, বেড়েছে তেলের দাম
নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নিত্যদিনের খাবারের তালিকায় অন্যতম ভরসা ডিম। তবে সেই ডিমের দামও এখন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। শুধু ডিম নয়, সবজির বাজারেও বেড়েছে অধিকাংশ পণ্যের দাম। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় প্রতিটি সবজি কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। গত সপ্তাহের তুলনায় লিটার প্রতি ৫ টাকা বেড়েছে সয়াবিন তেলের দাম। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। এদিকে প্রচলিত আছে, কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ। কেন না, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল ঘোষণার আলোচনা শুরু হতেই নিত্যপণ্যের বাজারে অস্বস্তি বাড়তে শুরু করেছে। চাপে পড়েছেন নিম্নমধ্যবিত্তের মানুষ।
বাজারে ফার্মের ডিম প্রতি ডজন ১৬৫ টাকা এবং হালি ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগে এক ডজন ডিম কিনলে বিক্রেতারা সামান্য ছাড় দিলেও এখন সেই সুযোগও থাকছে না। ডিম বিক্রেতা কালাম বলেন, ‘ফার্মের মুরগির ডিম এখন হালি ৫৫ টাকা। দাম বাড়লেও কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।’
বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ও নতুন দাম নির্ধারণের পরও রাজধানীর খুচরা বাজারে সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট কাটেনি। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এদিকে সবজির বাজারে বেগুন, করলা, বরবটি, ঢ্যাঁড়স, পটল ও কাঁকরোলের মতো সাধারণ সবজির বেশির ভাগই ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। শসা তুলনামূলক কম দামে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে পাওয়া গেলেও দেশি শসার দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা। বর্ষা মৌসুমেই বাজারে আসা আগাম শিমের দামও বেশ চড়া। প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। তুলনামূলক স্বস্তি দিচ্ছে পেঁপে, যার কেজি ৪০ টাকা।
এদিকে কাঁচা মরিচের দামও বেড়েছে। গত সপ্তাহে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া কাঁচা মরিচ এখন ১৬০ টাকা। লম্বা বেগুন ১০০ টাকা, গোল বেগুন ১২০ টাকা এবং টমেটো ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বরবটি, ঝিঙে ও করলার দাম ৮০ টাকা কেজি। প্রতি পিস লাউ ৫০ থেকে ৭০ টাকা এবং কচুরমুখি ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। শাকের বাজার অবশ্য তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত। প্রতি আঁটি লাল শাক ও কলমি শাক ২০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। ডাঁটা শাক ৩০ থেকে ৪০ টাকা, পুঁইশাক ৪০ থেকে ৫০ টাকা, লাউ শাক ৪০ থেকে ৬০ টাকা এবং কচু শাক ২৫ থেকে ৩০ টাকা আঁটি দরে পাওয়া যাচ্ছে।
সবজির বাড়তি দামে ক্ষোভ প্রকাশ করে ক্রেতা ইব্রাহিম বলেন, প্রায় সব সবজির দামই বেড়েছে। কোনো কোনো সবজিতে অন্তত ১০ টাকা করে বাড়তি দিতে হচ্ছে। ৮০ টাকার নিচে এখন তেমন কোনো সবজি নেই। টমেটো, বেগুন ও করলা কিনতে গেলেও কেজিপ্রতি ১০০ টাকার বেশি গুনতে হচ্ছে।’ মুরগির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। রাজধানীর বাজারে ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গরুর গোশতের দাম অবশ্য আগের অবস্থাতেই রয়েছে। প্রতি কেজি গরুর গোশত কিনতে ৮০০ টাকা গুনতে হচ্ছে। মাছের বাজারেও চড়া দাম অব্যাহত রয়েছে। তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা এবং রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ির দাম আকারভেদে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। এছাড়া পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ট্যাংরা ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ভেটকি মাছ ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি। চাষের কই পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৩০০ টাকায়। পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে চাষের শিং মাছের দাম ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা। মাঝারি আকারের রুই মিলছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। অন্যদিকে রূপচাঁদা, শোল ও নদীর বেলে মাছের মতো কিছু মাছ কিনতে কেজিপ্রতি হাজার টাকারও বেশি খরচ করতে হচ্ছে। কারওয়ান বাজারের মাছ বিক্রেতা শামিম ইসলাম জানান, মাঝারি আকারের রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশী ও তুলনামূলক বেশি চাহিদার মাছ, বিশেষ করে নদীর বেলে কিনতে গেলে কেজিপ্রতি বেশি দিতে হচ্ছে ১ হাজার টাকা ।
পে-স্কেলের অজুহাতে বাজারে আগাম চাপ
এদিকে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল ঘোষণার আলোচনা শুরু হতেই নিত্যপণ্যের বাজারে অস্বস্তি বাড়তে শুরু করেছে। একদিকে সীমিতসংখ্যক সরকারি চাকরিজীবীর বেতন বাড়ার সম্ভাবনা স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে এ সুযোগকে কেন্দ্র করে বাজারে আগাম মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা উদ্বেগ বাড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। প্রচলিত আছে, কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ। সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়ার সম্ভাবনায় যেখানে এক শ্রেণির মানুষের স্বস্তি, সেখানে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কায় উৎকণ্ঠিত নিম্ন ও মধ্যবিত্তসহ কোটি কোটি মানুষ। কারণ, বেতন বাড়ার আগেই যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকে, তাহলে বাড়তি আয়ের সুফল যেমন সীমিত হয়ে যাবে, তেমনি যাদের আয় বাড়ছে না তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কার মধ্যেই বাজারে অনেক পণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেতন বৃদ্ধি সরাসরি মূল্যস্ফীতির একমাত্র কারণ নয়।
মূল সমস্যা হলো দুর্বল সরবরাহব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য এবং বাজার সিন্ডিকেটের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব। অনেক ক্ষেত্রেই পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা যায়। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু খুচরা দোকানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেই বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। উৎপাদন ও আমদানি থেকে শুরু করে পাইকারি এবং খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে নজরদারি বাড়াতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ার কারণে সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে না। তাহলে পে-স্কেল ঘোষণার আলোচনা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাল, ডাল, তেল কিংবা সবজির দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। রাজধানীর বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা মায়েদা আক্তার বলেন, কারও বেতন বাড়লে তাতে আপত্তির কিছু নেই। বরং মানুষের আয় বৃদ্ধি হওয়া আনন্দের বিষয়। কিন্তু সেই সুযোগে বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। সীমিত আয়ের মানুষকে প্রতি মাসে ঘরভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও যাতায়াতসহ বিভিন্ন খরচ মেটাতে হয়। সব ব্যয় সামলানোর পর খাদ্য কেনার জন্য যে অর্থ থাকে, বাজারের মূল্যবৃদ্ধি সেই হিসাব ওলটপালট করে দেয়। ফলে অনেক পরিবারকে খাবারের তালিকা থেকে পুষ্টিকর পণ্য বাদ দিতে হয়। কেউ চিকিৎসা খরচ কমান, আবার কেউ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় কাটছাঁট করেন। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও যাদের আয় অপরিবর্তিত থাকবে, তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে সেই চাপ সামলাবে কে?