রাজধানীর কাঁচাবাজারে আলু, পেঁপে ও গাজর ছাড়া প্রায় সব সবজির কেজি ৮০ টাকার ওপরে। এমনকি গ্রীষ্মের সবজি বেগুন, পটোল, ঢ্যাঁড়সের দামও ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে, যা স্বাভাবিক অন্য বছরের ভরা মৌসুমের দামের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। বেড়েছে মাছের দামও। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে সবজি কিনতে হিমসিম খাচ্ছেন নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের ক্রেতারা। অনেকেই ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় খরচ মেলাতে পারছেন না এক সপ্তাহের সবজির চাহিদা।
শাহজাহানপুর কলনী বাজারের পাশের এক ভ্যান থেকে সবজি কিনছিলেন একজন ক্রেতা। তিনি বলেন, এককেজি করে পটোল, ঢ্যাঁড়স ও বরবটি কিনেছি। সবগুলোর দামই ১০০ টাকা কেজি। এই সবজি দিয়ে আমার পরিবারের তিন-চারদিন যাবে না। তাহলে সবজির পেছনে যদি সপ্তাহে এত খরচ করি, তাহলে মাছ, মাংস খাবো কীভাবে? তিনি বলেন, এখন কিন্তু গ্রীষ্মের এসব সবজির দাম এত হওয়া কোনোভাবে মানা যায় না। এগুলো অন্যান্য বছর ৪০-৫০ টাকার মধ্যে থাকতো। এবার একদম ব্যতিক্রম।
এদিকে বিক্রেতারা জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি কয়েকদিনের বৃষ্টিতে বাজারে বেড়ে গেছে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম। শাহজাহানপুর কলনী বাজারের বিক্রেতা মনু মিয়া বলেন, ভোরবেলা কারওয়ান বাজারের যে পরিমাণ সবজির সরবরাহ হয়, তার চেয়ে চাহিদা বেশি। তিনি বলেন, বেশি দামে সবজি কিনে তো আমরা কম দামে বিক্রি করতে পারি না। আমাদেরও দামের কারণে সব সবজি অল্প অল্প করে কিনতে হচ্ছে। এতে বিক্রি ও লাভ কমেছে। এক গৃহিণী বলেন, প্রতিদিন বাজারে এসে নতুন হিসাব করতে হয়। আগে যে টাকায় কয়েকদিনের সবজি কেনা যেত, এখন তা একদিনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। দাম একটু কমলেও সেটা আমাদের জন্য তেমন কাজে আসছে না। মধ্যবিত্ত আরেক ক্রেতা বলেন, বাজারে সামান্য কমার খবর শুনে এসেছিলাম। কিন্তু বাস্তবে এসে দেখি তেমন সুবিধা হয়নি। বিশেষ করে যাদের বড় পরিবার, তাদের জন্য এই দাম এখনও চাপের। সবজি বিক্রেতা কাউসার আহমেদ বলেন, গত কয়েকদিনে কিছু সবজির সরবরাহ বেড়েছে, তাই দাম কিছুটা কমেছে। তবে সবজির গাড়ি নিয়মিত না আসলে আবার দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকে। সবজি বিক্রেতা সবুজ জানান, ক্রেতারা মনে করেন আমরা বেশি দামে বিক্রি করি। কিন্তু পাইকারি বাজার থেকেই অনেক সময় বেশি দামে কিনতে হয়। পরিবহন খরচও বেড়েছে। সব মিলিয়ে কম দামে বিক্রি করা কঠিন হয়ে যায়। আরেকজন বিক্রেতার ভাষ্য, বাজারে এখন চাহিদা আছে, কিন্তু সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তাই সবজির দাম পুরোপুরি কমছে না। সামনে সরবরাহ আরও বাড়লে দাম কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌসুমি সবজির সরবরাহ আরও বাড়লে এবং পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলে বাজারে দাম ধীরে ধীরে সহনীয় পর্যায়ে আসতে পারে। তবে আপাতত সাধারণ ক্রেতাদের জন্য সবজির বাজারে পুরোপুরি স্বস্তি ফিরতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করছেন তারা।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ সবজির দামই ৮০ টাকার ওপরে। শুধু আলুর দাম ২৫ টাকা এবং পেঁপে ও গাজর বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজিতে। বাজারে নতুন আসা বেগুন মান ও জাতভেদে বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। যা সপ্তাহ দুয়েক আগেও ৮০ টাকায় পাওয়া যেত। এছাড়া পটোল ও ঢ্যাঁড়শ ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বরবটি, ঝিঙা, চিচিঙা, শিম, সজনে ১০০ থেকে ১২০ টাকা, কাকরোল, করলা ১২০ থেকে ১৪০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে কম রয়েছে কাঁচামরিচ ও পেঁয়াজের দাম। প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ৮০ থেকে ১০০ টাকা ও পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। এছাড়া প্রতি কেজি শসা ৬০ থেকে ৮০ ও টমেটো ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে, বাজারে ব্রয়লার মুরগির দাম স্বাভাবিক। পাশাপাশি কিছুটা কমতে শুরু করেছে সোনালি মুরগির দাম। বাজারভেদে প্রতি কেজি সোনালি মুরগি ৩৮০ টাকা থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা ৪৫০ টাকায় উঠেছিল। এছাড়া ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকার মধ্যে। প্রতি ডজন ফার্মের ডিম কিনতে ভোক্তাকে খরচ করতে হচ্ছে ১১৫ থেকে ১২০ টাকা। বাজারে গত ঈদে বেড়ে যাওয়া গরুর গোশতের দাম এখনো কমেনি। প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ টাকা দরে। তবে দরদাম করে অনেক দোকানে ২০ থেকে ৩০ টাকা কমেও কেনা যাচ্ছে।
তবে মাছের বাজারে অস্থিরতা দেখা গেছে। সব ধরনের মাছের দাম বেড়েছে। ৩০০ গ্রাম সাইজের ১ কেজি ইলিশ মাছ ১৪০০ টাকা থেকে ১৫০০ এবং ৫০০ গ্রামের ইলিশ ২০০০ থেকে ২২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক কেজি শিং মাছ চাষের (আকারভেদে) বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায়, দেশি শিং ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা, প্রতি কেজি রুই মাছের দাম বেড়ে (আকারভেদে) ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকায়, দেশি মাগুর মাছ ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা, মৃগেল ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকায়, চাষের পাঙ্গাস ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়, চিংড়ি প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ১৪০০ টাকায়, বোয়াল মাছ প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায়, বড় কাতল ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকায়, পোয়া মাছ ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়, পাবদা মাছ ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায়, তেলাপিয়া ২০০ টাকায়, কৈ মাছ ২০০ থেকে ২২০ টাকায়, মলা ৫০০ টাকা, বাতাসি টেংরা ১৪০০ টাকায়, টেংরা মাছ ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা, কাচকি মাছ ৫০০ টাকায় এবং পাঁচমিশালি মাছ ২২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।