- বেসরকারি হাতে পরিশোধিত তেল গেলে রুগ্ন হবে রাষ্ট্রীয় তিন প্রতিষ্ঠান
নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো
একটি অনুমতি থেকেই কি খুলে যাবে জ্বালানি বাজার বেসরকারিকরণের দরজা? আর সেই দরজা দিয়ে ঢুকে পড়বে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ? পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগের মধ্যেই এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সংস্থাটির উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটির প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে একদিকে রুগ্ন হয়ে পড়তে পারে রাষ্ট্রীয় তিন বিপণন কোম্পানি-পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা; অন্যদিকে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠা দেশের জ্বালানি বিপণন নেটওয়ার্ক। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা-সংকটের সময় সরকারকে জ্বালানি সরবরাহকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। কয়েকটি কোম্পানি বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে সিন্ডিকেট গড়ে তুললে তখন জ্বালানির দাম ও সরবরাহ-দুই ক্ষেত্রেই সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছে বিপিসি। বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের নীতিমালা-২০২৬ তৈরির কাজ যখন এগোচ্ছে, ঠিক তখনই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বিপিসির এই প্রতিবেদন। ফলে নতুন নীতিমালায় এ সতর্কবার্তা কতটা গুরুত্ব পায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
একটি অনুমতি, এরপর : বিপিসির প্রতিবেদনের সূত্রপাত দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আবেদনে। বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড গত ২৪ মে এবং বখতিয়ার আহমেদ জেনারেল ট্রেডিং ও.পি.সি. গত ১১ নভেম্বর ২০২৫ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও ফার্নেস অয়েল আমদানি করে বিক্রি ও বিপণনের অনুমতি চেয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে আবেদন করে। এর পরই বিপিসি ও তিন রাষ্ট্রীয় বিপণন কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে ১১ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গত ১৯ জুলাই প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। প্রতিবেদনে বিপিসির অন্যতম যুক্তি-একটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দিলে সেটি নজির হয়ে দাঁড়াবে। এরপর একই সুবিধা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দিতে হবে। ধীরে ধীরে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিপণনের বড় অংশ চলে যেতে পারে বেসরকারি খাতে।
ঝুঁকিতে রাষ্ট্রীয় তিন কোম্পানি : দেশের জ্বালানি বাজারে পদ্মা অয়েল, যমুনা অয়েল ও মেঘনা পেট্রোলিয়ামের রয়েছে দীর্ঘদিনের অবকাঠামো ও বিপণন নেটওয়ার্ক। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে ২৭টি ডিপো। ভোক্তা পর্যায়ে ২ হাজার ৩৭৯টি ফিলিং স্টেশন, ৬৬৭টি প্যাকড পয়েন্ট ডিলার, ২ হাজার ৬৪০টি এজেন্সি, ১২৯টি মেরিন ডিলার, ৩ হাজার ১১১টি এলপিজি ডিলার ও ১৭টি বাঙ্কার ডিলার রয়েছে। বিপিসির আশঙ্কা, বেসরকারি কোম্পানিগুলো লাভজনক বাজার দখল করতে শুরু করলে রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর বিক্রি কমে যাবে। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের আয় কমবে, বিপুল অবকাঠামো ব্যবহারের সক্ষমতা কমে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত তারা রুগ্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে-তাহলে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্কের ভবিষ্যৎ কী?
সংকটে কে দেবে ভর্তুকি : বিপিসির প্রতিবেদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার একটি হলো সংকটকালে জ্বালানি সরবরাহ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে কিংবা ডলারের সংকট তৈরি হলে বেসরকারি আমদানিকারকরা আমদানি কমিয়ে বা বন্ধ করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কমিটি। কারণ তাদের প্রধান লক্ষ্য ব্যবসায়িক মুনাফা। অন্যদিকে সরকার জনস্বার্থে অনেক সময় লোকসান বা ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার মধ্যেও সরকার ও বিপিসি দেশের বাজারে সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করেছে। বেসরকারি কোম্পানিগুলো একইভাবে ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ করবে কি না, সে প্রশ্ন তুলেছে কমিটি। অর্থাৎ সংকটের সময় লাভের হিসাব নাকি জনস্বার্থ-কোনটি অগ্রাধিকার পাবে, সেটিই হতে পারে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বাড়বে দেশেও : বিপিসির আশঙ্কা, বেসরকারি আমদানি বাড়লে দেশের জ্বালানি বাজার আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে আরও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারেও দ্রুত দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও সেই সুবিধা একই গতিতে ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে কি না, তার নিশ্চয়তা থাকবে না। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে মজুতদারি। দাম বাড়ার পূর্বাভাস পেলেই বেশি মুনাফার আশায় তেল ধরে রাখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। কয়েকটি বড় কোম্পানি বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর আশঙ্কাও করেছে কমিটি।
রাজস্ব হারানোর শঙ্কা : বিপিসির আরেকটি বড় উদ্বেগ সরকারি রাজস্ব। গত পাঁচ বছরে বিপিসি সরকারকে ৭১ হাজার ৮৭১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেই সংস্থাটি সরকারকে দিয়েছে ১৪ হাজার ৮৫৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পরিশোধিত তেল আমদানিতে বড় অংশ দখল করলে এই রাজস্বের উল্লেখযোগ্য অংশ কমে যেতে পারে বলে মনে করছে বিপিসি। অর্থাৎ বেসরকারিকরণের সুবিধা শুধু প্রতিযোগিতা ও বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়তে পারে রাষ্ট্রীয় আয়েও।
নয় ধরনের ঝুঁকির তালিকা : বিপিসির কমিটি কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারির অন্তত নয় ধরনের ঝুঁকির কথা তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে নীতিগত বিরোধে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ, দাম বাড়ার আগে তেল মজুত, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরবরাহ কমানো, সংকটকালে সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়া, ভেজালের ঝুঁকি এবং জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ, পানি, চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া। সবশেষে কমিটির সুপারিশ-পরিশোধিত জ্বালানি তেলকে কৌশলগত পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে আমদানি, মজুত ও বিপণনের একক নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে রাখা। তবে বেসরকারি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত না করে অপরিশোধিত তেল আমদানি এবং রিফাইনারি স্থাপনে তাদের উৎসাহিত করা যেতে পারে। এখন সিদ্ধান্ত সরকারের। প্রশ্ন একটাই-জ্বালানি বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি করতে গিয়ে সরকার কি এমন একটি বাজার তৈরি করবে, যেখানে সংকটের সময় সরবরাহের চাবিকাঠি কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাবে? নাকি কৌশলগত এই পণ্যের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতেই থাকবে?