ক্স বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে প্রায় ৯০ বছর
ক্স পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যুক্ত হবে আগস্টে
পারমানবিক বিদ্যুতের যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ। এক দশক ধরে অবকাঠামো নির্মাণ ও জটিল কারিগরি সক্ষমতা অর্জনের পর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং বা ব্যবহার শুরু হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। এই ফুয়েল লোডিংয়ের মাধ্যমে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারীর আন্তর্জাতিক দেশের তালিকায় ৩৩তম দেশ হলো বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে প্রবেশ ঘটছে বাংলাদেশের।
জানা গেছে, পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফুয়েল লোডিং (জ্বালানি ভরা) শুরু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ৩টার দিকে পদ্মার তীরঘেঁষা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি। এখন নানা ধাপ পেরিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে পারে রূপপুরের প্রথম ইউনিট।
সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী জুলাই বা আগস্টে পরীক্ষামূলকভাবে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে। এক বছর পর প্রথম ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় বাণিজ্যিক উৎপাদনে গেলে পাওয়া যাবে নিরবচ্ছিন্ন ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে। কারণ, নিরাপত্তাই বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার। এই পারমাণবিক কেন্দ্র ঢাকা ও মস্কোর মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেবে। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, দিনটি বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রটি চালু হলে এর স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল হবে প্রায় ৬০ বছর। তবে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে আরও প্রায় ৩০ বছর পর্যন্ত এর কার্যক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব ফলে মোট প্রায় ৯০ বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে।
প্রথম ইউনিটের জন্য প্রয়োজন ১৬৩টি ইউরেনিয়াম বান্ডেল, যেখানে প্রতিটি বান্ডেলে রয়েছে ১৫টি করে জ্বালানি রড। ইতোমধ্যে ১৬৮টি বান্ডেল সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬৩টি ব্যবহার করা হবে এবং বাকি ৫টি সংরক্ষণে রাখা হবে। জ্বালানি চুল্লিতে স্থাপন করতে সময় লাগবে আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৫ দিন। এরপর পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপন্ন তাপে পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুতের অন্যতম বড় সুবিধা হলো দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি ব্যবহার করা যায়। একবার জ্বালানি লোড করলে তা প্রায় দেড় বছর পর্যন্ত চলবে। এরপর পুরো জ্বালানি একসঙ্গে পরিবর্তন না করে ধাপে ধাপে এক-তৃতীয়াংশ করে প্রতিস্থাপন করা হয়। তবে জ্বালানি লোডিং শেষ হলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে না। এর আগে শতাধিক নিরাপত্তা ও কারিগরি পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। সব ধাপ সফলভাবে শেষ হলে কয়েক মাসের মধ্যে ধীরে ধীরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত করা হবে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশকে যেভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও সেভাবে পাশে থাকবে রোসাটম। বাংলাদেশের মানুষকে নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বস্ত করতে চাই। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সর্বোচ্চ মানদ- বজায় রাখা হয়েছে। নিরাপদ পারমাণবিক কেন্দ্র থেকেই সরবরাহ করা হবে বিদ্যুৎ। এমনকি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ ভবিষ্যতের প্রয়োজনে সহযোগিতা থাকবে রোসাটমের।’
জানা গেছে, ২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আকাশপথে রাশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছায় পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান। এরপর আসে আরও কয়েকটি চালান। বিশেষ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে অক্টোবরে রূপপুরে নিয়ে যাওয়া হয় জ্বালানি। এরপর এটি মজুত করে রাখা হয়েছে রূপপুরে। ১৬৪টি বান্ডিল দেশে আনা হয়। রূপপুরে ব্যবহৃত প্রতিটি বান্ডিলে ৩১২টি জ্বালানি রড রয়েছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল জ্বালানি ইউরেনিয়াম। প্রথমে ইউরেনিয়াম অক্সাইড দিয়ে ছোট ট্যাবলেটের মতো জ্বালানি দানা (প্যালেট) বানানো হয়। এগুলোর ব্যাস সাধারণত ৮ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার। এমন অনেক প্যালেট প্রায় চার মিটার দীর্ঘ ধাতব নলের ভেতরে সাজিয়ে তৈরি হয় জ্বালানি রড। আবার নির্দিষ্ট কাঠামোতে অনেকগুলো রড একসঙ্গে যুক্ত করে তৈরি হয় জ্বালানি বান্ডিল বা ফুয়েল অ্যাসেম্বলি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই জ্বালানি বান্ডিল চুল্লির কেন্দ্রে বসানো হবে। রূপপুরের প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে ১৬৩টি বান্ডিল ব্যবহার করা হবে। একবার জ্বালানি বসালে প্রায় ১৮ মাস নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। এরপর ব্যবহৃত জ্বালানির তেজস্ক্রিয় অবশেষ বিশেষ নিরাপত্তায় রাশিয়ায় নেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নজরদারিতে প্রতিটি জ্বালানি বান্ডিলের হিসাব থাকবে
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মূলত ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ বা নিউক্লিয়াস বিভাজন প্রক্রিয়ায় কাজ করবে। রিঅ্যাক্টরে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোড করা হলে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপশক্তি উৎপন্ন হবে। এই তাপশক্তি দিয়ে পানিকে উচ্চ চাপে উত্তপ্ত করা হবে, সেই পানি আরেকটি উৎসের পানিকে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরাবে, টারবাইন ঘোরাবে জেনারেটর এভাবে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন প্রক্রিয়া।
রিঅ্যাক্টরের ডিজাইন অনুযায়ী, ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি রিঅ্যাক্টর কোরে স্থাপন করতে হবে; যার জন্য সময় লাগবে ৩০ দিন। প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুসরণ করে সম্পন্ন করতে হয় এবং বিশেষ মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। জ্বালানি লোডিং শেষে শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ। এই পর্যায়ে ডিজাইন অনুযায়ী নিউক্লিয়ার ফিশন রিঅ্যাকশন ঘটানো হয় এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয়, যার জন্য প্রায় ৩৪ দিন সময় লাগে। পরীক্ষা শেষে রিঅ্যাক্টরের পাওয়ার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করে পর্যায়ক্রমে ৩, ৫, ১০, ২০ ও ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে; যার জন্য সময় লাগবে ৪০ দিন। রিঅ্যাক্টরের পাওয়ার ৩ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। পরে ধাপে ধাপে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি চলবে নিরাপত্তাবিষয়ক নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সব মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস।
কেন্দ্রটিতে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা দিয়ে চলবে টানা দেড় বছর। ফলে অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো তেল, গ্যাস কিংবা কয়লা কেনার ঝক্কিঝামেলা নেই। দেড় বছর পর এক-তৃতীয়াংশ করে জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে।
নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। অর্থাৎ এই সময়ে জ্বালানি আমদানি নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। এরপর বাংলাদেশকে জ্বালানি তথা ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। তবে সেই জ্বালানি দুই বছর পরপর পরিবর্তন করলেই চলবে।
আর্থিক বিবেচনায় বাংলাদেশের একক প্রকল্প হিসেবে সবচেয়ে বড় প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সব সহযোগিতা করছে রাশিয়া। প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের ৯০ শতাংশ ঋণ দিচ্ছে রাশিয়া, যেটি ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ চলছে।