- তথ্য কিনেছে ৫টি বিদেশী কোম্পানি
- আগ্রহ দেখাচ্ছে আমেরিকান ও চীনা কোম্পানি
সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র কিনেছে তুর্কিয়ের (তুরস্ক) রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টার্কিশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (টিপিএও)। আন্তর্জাতিক দরপত্রে সাড়া বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া ৫টি বিদেশী কোম্পানি তথ্য কিনেছে বলে নিশ্চিত করেছেন পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব। তিনি জানান, দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য আমরা ভালো সাড়া পাবো বলে আশা করছি। অফসোর বিডিং রাউন্ডের (আন্তর্জাতিক দরপত্র) বিষয়ে অনেক কোম্পানি আগ্রহ দেখাচ্ছে।
বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রে ১১টি ব্লকের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য গত ২৪ মে তারিখে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়া যাবে। দরপত্রের মূল্য ধরা হয়েছে ৭ হাজার ডলার। সবগুলো অথবা সুনির্দিষ্ট কোন ব্লকের জন্য দরপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
টিপিএও বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম, যারা নিজের দেশের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কাজ করছে। ইরাকের কির্কুক প্রকল্পের ১৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে তাদের হাতে। ব্রিটিশ এনার্জি জায়ান্ট বিপি এবং মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপস এর সাথে যৌথভাবে কাজ করছে। কোম্পানিটি ২০২০ সালে কৃষ্ণ সাগরে সাকারিয়া গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারকে সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছে। গ্যাস ফিল্ডটিতে প্রায় ২৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট মজুদ গ্যাস রয়েছে। যা বাংলাদেশে এ যাবতকালে আবিষ্কৃত সবগুলো গ্যাসফিল্ডের মজুদের প্রায় সমান।
অন্যদিকে ৫টি কোম্পানি তথ্য কিনেছে তারা হচ্ছেন সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি ক্রিসএনার্জি, যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক কোম্পানি বিরিংগিয়া এনার্জি গ্লোবালের লোকাল এজেন্ট বিরিংগিয়া পাওয়ার বাংলাদেশ লিমিটেড, পিয়াল এনার্জি এন্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, জাপানি কোম্পানি অনোডা ইনকরপোরেটেড এবং নরওয়েজিয়ান কোম্পানি রিস্টাড এনার্জি। এরমধ্যে ক্রিসএনার্জি বাংলাদেশের ৯ নম্বর ব্লকে অবস্থিত বাঙুরা গ্যাস ফিল্ড (কুমিল্লা) পরিচালনা করে আসছে।
২০২৬ সালের আগে ২০২৪ এর মার্চে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বান করা হয়। তখন মার্কিন কোম্পানি এক্সোন মবিলসহ ৭টি আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা কোম্পানি দরপত্র কিনেছিল, ২টি কোম্পানি পেট্রোবাংলা থেকে ডাটাও কিনেছিল। রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ নানা কারণে দরপত্র জমাদান থেকে বিরত থাকে।যে কারণে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করা হয় বিডিং রাউন্ড-২০২৪।
অন্তবর্তীকালীন সরকার কারণ উৎঘাটন কমিটি গঠন করে। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গভীর সমুদ্র থেকে স্থলভাগ পর্যন্ত পাইপলাইনের খরচ, ডব্লিউপিপিএফ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১.৫ শতাংশ করাসহ বেশকিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। এছাড়া গ্যাসের দাম ব্রেন্ট ক্রুডের ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে গভীর সমুদ্রে ১১ শতাংশ এবং অগভীরে সাড়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। যা মডেল পিএসসি-২০১৯ এ যথাক্রমে অগভীর ও গভীর সমুদ্রে ৫.৬ ডলার ও ৭.২৫ ডলার স্থির দর ছিল।
আন্তর্জাতিক আদালতে ২০১২ সালে মায়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সাগর সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির পর সর্বমোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটারের বেশি সমুদ্র অঞ্চলের ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের। সেই সম্ভাবনাময় সাগরাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে চুড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে বিগত সরকার। একই পথে হেটেছে অন্তবর্তীকালীন সরকারও। যে কারণে অধরাই থেকে গেছে সম্ভাবনাময় জলরাশি। বাংলাদেশের পাশের অংশ থেকে মায়ানমার দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস উত্তোলন করছে। যে কারণে বাংলাদেশে গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল বিবেচনা করা হয়।
২০০৮ সালে ডিএস-১০ ও ডিএস-১১ জন্য আমেরিকান কোম্পানি কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। কনোকো গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিসহ কিছু শর্ত সংশোধনের আবেদন করে। বাংলাদেশ সেই শর্তে সাড়া না দিলে ২০১৪ সালে ছেড়ে চলে যায়। অন্যদিকে অফসোর বিডিং রাউন্ড ২০১২ আওতায় ওএনজিসি ভিদেশ লিমিটেড এসএস-৪ ও এসএস-৯ এর চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।
২০১৭ সালে এসএস-১২ ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি পসকো দাইয়ুর সঙ্গে চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। ২০২০ সালে ব্লক ফেল চলে যায় পসকো দাইয়ু। ২০২৪ সালের আগে সর্বশেষ ২০১৬ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এরপর ২০১৯ সালে পিএসসি আপডেট করা হলেও দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। কয়েক মাসের কাজ পিএসসি (উৎপাদন ও বন্টন চুক্তি) আপডেট করতেই ৫ বছর সময় পার করে দেয় আওয়ামী লীগ সরকার।
বাংলাদেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে, সহসা এই সংকট দূর হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং দিনদিন বেড়েই চলছে সংকট। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশে ৮টি গ্রাহক শ্রেণিতে দৈনিক অনুমোদিত লোড রয়েছে ৫ হাজার ৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট, প্রকৃত চাহিদা ধারণা করা হয় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। দৈনিক ২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে, ঘাটতি থেকে যাচ্ছে প্রায় ১৩০০ মিলিয়নের মতো। বলা যায় সব ধরণের গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এতে করে স্থবিরতা নেমে এসেছে শিল্পায়নে।
একদিকে যখন দেশীয় গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে গ্যাসের চাহিদা। এক সময় ২৮০০ মিলিয়ন উৎপাদন হলেও এখন ১৬৪৫ মিলিয়নে (১৭ জুন) নেমে এসেছে। এর অন্যতম কারণ বিবেচনা করা হয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে স্থবিরতাকে। অনুসন্ধানের চেয়ে আমদানিতে মনযোগ বেশি ছিল বিগত সরকারগুলোর।
স্থলভাগে কূপ খনন করেও বড় রিজার্ভ পাওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন বাড়ানো থাকল দুরের কথা বর্তমান উৎপাদন অব্যাহত রাখাই কঠিন মনে করা হচ্ছে। একমাত্র ভরসা হচ্ছে গভীর সমুদ্র। যতো দ্রুত অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করা যাবে ততই মঙ্গল মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তবে সেখানে গ্যাস পেলেও আগামী ৫ বছরের মধ্যে ব্যবহারের সম্ভাবনা ক্ষীণ। যে কারণে আসছে বছরগুলোতে গ্যাস সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে শঙ্কা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, অনেক কোম্পানি যোগাযোগ করছে, বিশেষ করে আমেরিকান ও চীনা কোম্পানি আগ্রহ দেখাচ্ছে। এবার সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র সফল হবে বলে আমরা আশাবাদী।