বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার এবং বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ ঐতিহ্যের প্রতীক সুন্দরবন আজ এক গভীর ও বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এই বনের বাস্তুতন্ত্র যখন নানামুখী চ্যালেঞ্জের শিকার, ঠিক তখন মানবসৃষ্ট ত্রিমুখী সংকট সুন্দরবনের অস্তিত্বকে এক মহাসংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বন রক্ষার জন্য নিয়োজিত পর্যাপ্ত জনবলের অভাব, আইনি প্রক্রিয়ার মারপ্যাঁচ বা দুর্বলতা এবং স্থানীয় মহাজনদের ‘দাদন’ প্রথার নিষ্ঠুর ঋণের জালÑএই তিনের যাঁতাকৃতে পিষ্ট হচ্ছে সুন্দরবন। এর ফলে বনের অমূল্য জীববৈচিত্র্য, নয়নাভিরাম ল্যান্ডস্কেপ এবং এর ওপর নির্ভরশীল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক গতি আজ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
সুন্দরবন কেবল একটি সাধারণ বনভূমি নয়; এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের প্রাকৃতিক ঢাল এবং বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। বর্তমানের এই ত্রিমুখী সংকটÑজনবল স্বল্পতা, আইনি দুর্বলতা এবং দাদন প্রথার বিষাক্ত জালÑখুব দ্রুত উপড়ে ফেলা না গেলে এই অনন্য ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়বে।
সুন্দরবনের বিশাল আয়তন এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান পাহারা দেওয়ার জন্য যে পরিমাণ প্রশাসনিক শক্তি, জনবল ও আধুনিক সরঞ্জামের প্রয়োজন, তার তীব্র ঘাটতি রয়েছে। সুন্দরবন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুধু খুলনা রেঞ্জেই অনুমোদিত ৬৪৪টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৪২৩ জন বনকর্মী। দীর্ঘকাল ধরে এখানে ২২১টি পদ শূন্য পড়ে আছে। এত বিপুল পরিমাণ পদ শূন্য থাকায় সীমিত জনবল নিয়ে বনরক্ষীদের দিনরাত বিশাল বনাঞ্চলে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যা প্রায় অসম্ভব এক ব্যাপার।
সুন্দরবন সুরক্ষার মূল ভিত্তি হলো নিয়মিত টহল ফাঁড়ি ও স্মার্ট প্যাট্রোলিং। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে এই প্যাট্রোলিং কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক স্টেশনে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল এবং আধুনিক জলযানের মারাত্মক সংকট রয়েছে। নদীমাতৃক সুন্দরবনে স্পিডবোট কিংবা আধুনিক নৌযান ছাড়া বনদস্যু ও চোরাকারবারিদের ধাওয়া করা বা তাদের গতিবিধি রোধ করা অত্যন্ত দুরূহ। অনেক সময় দুর্গম এলাকায় পায়ে হেঁটে অভিযান চালাতে গিয়ে বনকর্মীরা অস্ত্রধারী অপরাধীদের সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখেও পড়েন। ফলে অপরাধ দমনের এই অসম লড়াইয়ে অনেক সময় অপরাধীরাই কৌশলগত সুবিধা পেয়ে যায়।
আইনি দুর্বলতা এবং জামিনের গ্যাঁড়াকল
বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড ও নৌ পুলিশের ধারাবাহিক ও কঠোর অভিযান সত্ত্বেও অপরাধীরা প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন কৌশলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে যৌথ অভিযানে বনদস্যু, চোরা শিকারি কিংবা বিষ প্রয়োগকারী চক্রের সদস্যরা গ্রেপ্তার হলেও আইনি ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা ও ষড়ড়ঢ়যড়ষবং-এর সুযোগ নিয়ে অনেকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে মুক্ত হয়ে যায়। জামিনে বেরিয়ে এসে এই অপরাধীরা আবার একই অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে।
আইনজীবীদের মতে, বন আইন, ১৯২৭-এর ২৬(১)(চ) ধারায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নির্দিষ্ট কিছু অপরাধ জামিন অযোগ্য ঘোষণা করা হলেও মামলার নথিপত্র, পরিস্থিতির গুরুত্ব এবং বিচারিক বিবেচনায় আদালত অনেক সময় আসামীদের জামিন মঞ্জুর করতে বাধ্য হন। এই আইনি শিথিলতা বা দুর্বলতার কারণে অপরাধীদের মনে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে না। ফলে খুলনা রেঞ্জসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বনদস্যু, চোরা শিকারি ও বিষ প্রয়োগকারীদের তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে।
দাদন প্রথা এবং কীটনাশক প্রয়োগের মহোৎসব
সুন্দরবন ধ্বংসের নেপথ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করেছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহাজনদের ‘দাদন’ প্রথা। সুন্দরবনের ভেতরে কীটনাশক দিয়ে মাছ শিকার করার পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী অর্থলগ্নিকারী ও পাচার সিন্ডিকেট। স্থানীয় প্রভাবশালী মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে বা শর্তে অগ্রিম দাদন নিয়ে দরিদ্র জেলেরা সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। মহাজনের ঋণ পরিশোধের চাপ এবং অতি দ্রুত লাভের আশায় তারা আইনের তোয়াক্কা না করে নিষিদ্ধ অভয়ারণ্যে প্রবেশ করেন এবং নদী ও খালের পানিতে মারাত্মক ক্ষতিকর কীটনাশক প্রয়োগ করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, খালের পানিতে নির্বিচারে ব্যবহার করা হচ্ছে রিপকর্ড, সাইপারমেথ্রিন, ডাইমেক্রন এবং ইনতেফা কোম্পানির ‘শেফা’-সহ বিভিন্ন বিষাক্ত কীটনাশক। এই বিষ প্রয়োগের ফলে মুহূর্তের মধ্যে খালের ছোট-বড় সব মাছ মরে ভেসে ওঠে। জেলেরা সহজেই সেই মাছ সংগ্রহ করে মহাজনের আড়তে পৌঁছে দেন।
কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল করিমের মতে, কীটনাশক প্রয়োগ করে শিকার করা এসব মাছ মানবদেহের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই মাছ খেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র বমি, পেটব্যথা, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্টসহ ফুড পয়জনিং হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে মানুষের লিভার ও কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শরীরে ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য এ ধরনের বিষাক্ত মাছ খাওয়া চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ।
চলতি অর্থবছরের পরিসংখ্যান ও অপরাধের চিত্র
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় নানা অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এই অর্থবছরে মোট ২৯৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বিভিন্ন অপরাধে ৩৯৬ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলাগুলোর বিশদ বিশ্লেষণে দেখা যায়: অবৈধভাবে বনাঞ্চলে প্রবেশের অপরাধে ১০৬টি মামলা। বনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগে ৩৩টি মামলা। হরিণ শিকারের অপরাধে ৩৩টি মামলা। এই সমস্ত ধারাবাহিক অভিযানে অপরাধীদের ব্যবহৃত ২২টি ট্রলার, ৩৪৯টি নৌকা, ৬ হাজার ৯৮৬টি আটন (বিশেষ জাল), ৫ হাজার ৭০০ মিটারেরও বেশি হরিণ ধরার ফাঁদ, ৪৮৭ কেজি হরিণের মাংস, ২ হাজার ৬১২ কেজি মাছ, ১ হাজার ৯৮১ কেজি কাঁকড়া, ২০৩ কেজি মধু এবং ৮৭ বোতল বিষাক্ত কীটনাশক জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া সুন্দরবনের সুরক্ষায় বন বিভাগ ১৩৫ জন চিহ্নিত শিকারির একটি ‘রেড লিস্ট’ বা তালিকা প্রস্তুত করে তাদের সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারিতে রেখেছে।
নিরাপত্তার ফাঁকফোকর ও চোরাচালানের রুট
সুন্দরবনের বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারের জন্য বেশ কিছু রুট দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কয়রায় কোনো স্থায়ী নিরাপত্তা চেকপোস্ট না থাকায় পাচারকারীরা দক্ষিণ বেদকাশী থেকে কাটকাটা হয়ে কয়রা সদর এবং মহেশ্বরীপুর হয়ে দাকোপের বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বনজ সম্পদ পাচার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কয়রা উপজেলা সুন্দরবন ও পরিবেশ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি আবু হাসান সরদার মনে করেন, সুন্দরবন বাঁচাতে হলে অবিলম্বে বন বিভাগের জনবল ও আধুনিক অস্ত্রের ঘাটতি দূর করতে হবে। একই সঙ্গে কয়রার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতে স্থায়ী নিরাপত্তা চেকপোস্ট স্থাপন, বাজারে ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশকের বিক্রি কঠোরভাবে বন্ধ করা এবং এই ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্যে থাকা গডফাদার মহাজনদের আইনের আওতায় আনা অপরিহার্য।
সুন্দরবনকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। খুলনা জেলা ডি-সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আমির হামজা জানান, দক্ষিণ বেদকাশী, কাটকাটা, শাকবাড়িয়া ও আমাদী নৌ পুলিশ ক্যাম্প থেকে নিয়মিত টহল ও চেকপোস্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। সুন্দরবনকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে পুলিশ আরও কঠোর ও শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করবে।
সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, স্মার্ট পেট্রোলিংয়ের পাশাপাশি দুর্গম ও গহীন বনে পায়ে হেঁটে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে মাঝেমধ্যে অস্ত্রধারী অপরাধীদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ড্রোন প্রযুক্তি ও ফুট পেট্রোলিংয়ের সমন্বয় করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বনাঞ্চলে অপরাধ দমনে কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে এবং অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।