অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী

  • বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি
  • জামালপুরে সড়ক অবরোধ

গ্যাস ও বিদ্যুতে সংকট বেড়েই চলছে। মহেশখালীর দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে। এর সঙ্গে কয়লা সংকটে কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ভারত থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি কমেছে। সব মিলিয়ে বিদ্যুতের ঘাটতি বড় আকার নিয়েছে এবং উৎপাদনে ধস নেমেছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে তীব্র গ্যাস সংকট ও ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে খবর পাওয়া গেছে। গ্যাস না পেয়ে বৃহস্পতিবার সকালে জামালপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেছে ক্ষুদ্ধ জনতা। এছাড়া লোডশেডিয়েংর কারণে মানুষের ক্ষোভ বেড়েই চলেছে। অনেক স্থান নিরাপত্তা চেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা। এছাড়া রাজধানীতে গ্যাস সংকটের তীব্রতা বাড়ছে। উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে গ্যাসের চাপ।

বৃহস্পতিবারও রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে তীব্র গ্যাস সংকটের দেখা মিলেছে। সিএনজিচালিত যানবাহনগুলো নিয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার পরিবহন মালিক ও চালকরা। অনেকেই ভোর থেকে অপেক্ষা করে ২০ থেকে ৫০ টাকার গ্যাস পাচ্ছেন। এমনকি বেশিরভাগ স্টেশনগুলোতে ‘গ্যাস নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে অনেকেই গাড়িতে জ্বালানি নিচ্ছেন।

এদিকে, রাজধানীর অনেক জায়গায় দিনের বেশিরভাগ সময় বাসাবাড়িতে গ্যাস পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। অনেক এলাকায় চুলা জ্বললেও রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও কোথাও গ্যাস একেবারে মিলছেই না বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে ভোগান্তি আরো সইতে হবে এমনটা বেরিয়ে এসেছো খোদ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের বক্তব্যে। গতকাল বৃহস্পতিবার এক সেমিনারে মন্ত্রী বলেছেন, এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) মেরামত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই।

সংকট নিরসনে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন,এইটুকুই বলতে চাই, উই আর ওয়ার্কিং...এই ক্রাইসিসের সময় আসলে এখন আমার কিছু করার নাই। কারণ, এখন আমি গ্যাসও উত্তোলন করতে পারব না বা উইদাউট এফএসআরইউ, আমার যে গ্যাস আছে, সেটাও নামাতে পারব না।’

সংশিস্ট সূত্র জানিয়েছে সংকট কাটিয়ে উঠতে আরও অন্তত এক সপ্তাহ লাগতে পারে। ফলে এখনই বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতির আশা কম। গত কিছুদিনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, একদিকে বিদ্যুতের উৎপাদন কমেছে, অন্যদিকে চাহিদা বেড়েছে। লাইনের গ্যাস না পেয়ে বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বেড়েছে। সেটিও বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এ ছাড়া গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানায় নিজস্ব

বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় তারাও গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করছে। এর সঙ্গে গরমে ফ্যান ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) ব্যবহার বাড়ায় বিদ্যুতের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভুগছেন গ্রামের মানুষ। কোনো কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে কোথাও কোথাও ১৭ থেকে ২০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। তবে গ্রামের লোডশেডিং কমাতে এরই মধ্যে রাজধানীসহ শহরগুলোতেও লোডশেডিং শুরু হয়েছে।

লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি জায়গায় বিদ্যুৎ অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও কর্মীদের অবরুদ্ধ করার ঘটনা ঘটেছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি নিজেদের অফিস, উপকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে চিঠি দিয়েছে।

তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি:

জাতীয় গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ঘণ্টাতেই দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি ছিল। বিকেল ৩টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট। উৎপাদন ও সরবরাহ হয়েছে ১৩ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল তিন হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট। রাতে সংকট আরও বেশি। মঙ্গলবার রাত ২টায় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪৬ মেগাওয়াট। সরবরাহ হয়েছে ১৩ হাজার ২৩০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল তিন হাজার ১১৬ মেগাওয়াট। রাত ৩টায় ঘাটতি ছিল তিন হাজার ৫৬ মেগাওয়াট এবং ভোর ৪টায় দুই হাজার ৯৫১ মেগাওয়াট। তবে সবচেয়ে বেশি ছিল রাত ১২টায় তিন হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট। এর আগের দিনগুলোতেও পরিস্থিতি ছিল একই রকম। সোমবার সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল রাত ১২টায়, লোডশেডিং হয়েছিল তিন হাজার ৫৩৭ মেগাওয়াট। রোববার রাত ১টায় এযাবৎ কালের রেকর্ড লোডশেডিং হয়েছিল, তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট।

পিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সাংবাদিকদের বলেন, গত বছর একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। এবার তা বেড়ে ১৮ থেকে ১৯ হাজার মেগাওয়াটে উঠেছে। গ্যাস না থাকায় অনেক কারখানা গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। বাসাবাড়িতেও লাইনের গ্যাস না থাকায় বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বেড়েছে। সর্বোচ্চ উৎপাদন বাড়াতে চেষ্টা চলছে।

গ্যাস সরবরাহ কমেছে :

এদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায়। মহেশখালীর সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন কার্গো খালাস করা যাচ্ছে না। এতে টার্মিনালটি থেকে গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুটে। এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালও বয়লার-সংক্রান্ত সমস্যায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। সেখান থেকে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২০ থেকে ২২ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে এ টার্মিনাল থেকে ৫৫ থেকে ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়।

দুটি টার্মিনাল মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ এখন প্রায় ৪১ কোটি ঘনফুট। আগামী ১৫ আগস্ট নতুন কার্গো না আসা পর্যন্ত সামিটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা কম। এর পর এক্সিলারেটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখা হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে দেওয়া হয় ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট। এলএনজি সংকটের মধ্যে তা ৭০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছিল।

সিএনজি স্টেশনে চাপ :

পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি স্টেশনেও চাপ পড়েছে। কোথাও কোথাও কয়েক ঘণ্টা পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ জেলার ৩৩টি সিএনজি স্টেশনের মধ্যে ৩০টিতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন পাম্পে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষায় থাকা চালক ও ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা জানান, কয়েক দিন ধরে গ্যাস সংকটে ভুগছেন তারা। রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতেও দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ লাইন। কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পর সামান্য টাকার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে কোথাও কোথাও।

গ্রামাঞ্চলে দুর্ভোগ বেশি:

দেশের প্রায় পাঁচ কোটি ২০ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে প্রায় চার কোটি গ্রাহক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায়। মোট গ্রাহকের প্রায় ৮০ শতাংশই এসব সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ পান। উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশও এসব এলাকায় সরবরাহ করা হয়। পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে সমিতিগুলোর গড় চাহিদা ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ, চাহিদার তুলনায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে সমিতিগুলো।

জাতীয় গ্রিডের ঘাটতির চাপ পড়েছে রাজধানী ও আশপাশ এলাকাতেও। কেরানীগঞ্জে সকাল থেকে দফায় দফায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করেছে। শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দিনরাতে প্রায় ১২ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের অভিযোগ রয়েছে। আড়াইহাজারে তা ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা। নরসিংদীর রায়পুরায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা এবং সাভারে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে জনদুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সরকার। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা কৌশল নিয়েছি। আশা করছি বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হবে। গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর জন্য সম্ভাব্য সব বিকল্প নিয়ে কাজ করছি। মালয়েশিয়া থেকে অন্তত এক এলএনজি কার্গো আনার চেষ্টা চলছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। তবে সংকট কমাতে আমাদের চেষ্টার কোনো ঘাটতি নেই।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উৎপাদন কমেছে:

এদিকে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট তাদের উৎপাদনশীলতা ও আয় কমছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কোনো কোনো এলাকায় এখন দিনের প্রায় অর্ধেক সময় লোডশেডিং থাকছে।

ধামরাই বিসিক শিল্প নগরীর পিপলস ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদারগুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজবিন হাফিজ বলেন,লোডশেডিংয়ের কারণে আমরা ঠিক মতো জুতা তৈরি করতে পারছি না। এতে সময় নষ্ট হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আমাদের ক্রেতারা তাদের অর্ডার কমিয়ে দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে উৎপাদন বিলম্বিত হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যয় আরও বাড়ছে, বলেন রেজবিন।

জানা গেছে, বাংলাদেশে কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ১ কোটি ২০ লাখ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৩০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে। এসব প্রতিষ্ঠানে ৩ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে ওয়েল্ডিংয়ের দোকান, চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুতকারী ও পাড়ার লন্ড্রি এসব ব্যবসা অর্থনীতির মেরুদন্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। একই পরিমাণ পণ্য উৎপাদনে বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে, আবার কেউ কেউ পণ্য সরবরাহে সময়সীমা পূরণ করতে অনেক বেশি সময় নিচ্ছেন। শ্রমিকদের মজুরি দিতে কিছু উদ্যোক্তাকে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে।

যা বলছেন মন্ত্রী :

সংকট নিয়ে গতকাল কথা বলেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ । তিনি জানান, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার কারণেই চলমান সংকট শুরু হয়েছিল। যদিও বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে সরাসরি কিছু করার সুযোগ সীমাবদ্ধ। কারণ, নতুন করে হঠাৎ গ্যাস উত্তোলন করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি এফএসআরইউ সচল না থাকা পর্যন্ত বিদ্যমান গ্যাস খালাস করে জাতীয় গ্রিডে দেওয়াও সম্ভব নয়। এ ছাড়া বর্তমান ব্যবস্থাপনা কৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী জানান, বিদেশী প্রকৌশলীরা যতক্ষণ পর্যন্ত এফএসআরইউ মেরামত শেষ না করছেন, ততক্ষণ অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো গতি নেই।

মন্ত্রী বলেন, ‘এখন শুধু আমাকে দিন গোনা ছাড়া আর ওই যে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছে এফএসআরইউতে, এটা করা ছাড়া আমার কিছু নাই। আর কিছু ম্যানেজমেন্ট করা, যাতে কম লোডশেডিং হয়। যাতে আমি ইন্ডাস্ট্রিকে গ্যাসটা দিতে পারি, এই ম্যানেজমেন্টটা করা। এ ছাড়া আপনিই বলেন আমার হাতে আর কী থাকতে পারে।’

মন্ত্রী বলেন, এলএনজি টার্মিনাল মেরামতে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। তবে মেরামত শেষে নতুন দুটি বয়লার একসঙ্গে চালু করতে হবে। কারিগরি সমন্বয়ের জন্য তখন পুরো সিস্টেমটি টানা ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন বন্ধ রাখা লাগবে বলেও সতর্ক করেন মন্ত্রী। মন্ত্রী বলেন, যার প্রভাবে সাময়িকভাবে দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেবে।

মন্ত্রী ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ‘গরিবের টেসলা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এগুলোর বেশির ভাগই রাত ১২টার পর অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চার্জ দেওয়া হয়। এর ফলে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহারের সময় (পিক আওয়ার) বদলে রাত ১২টায় গিয়ে ঠেকছে এবং মোট চাহিদা বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাচ্ছে। তবে এসব অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে অনেক জায়গায় সরকারি কর্মচারীরা হামলার শিকার হচ্ছেন।

রাজশাহী ব্যুরো

তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে রাজশাহীর ১৪টি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা চেয়েছে রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। গত বুধবার প্রশাসনের কাছে এ বিষয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সূত্রে জানা গেছে, জেলার পাঁচ উপজেলায় দিনে-রাতে বিদ্যুতের চাহিদা ১১০ থেকে ১১৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় লোডশেডিং হচ্ছে।

রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একজন কর্মকর্তা বলেন, লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা না ঘটে, সে জন্য জেলার ১৪টি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা চেয়ে প্রশাসনের কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। এদিকে রাজশাহী নগরীতেও বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। নেসকোর একজন কর্মকর্তা জানান, বুধবার নগরীতে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৩৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ১১০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ এ সময়ে ২৮ মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, ২৪ ঘণ্টায় প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের পরিমাণ পরিবর্তিত হচ্ছে। কখনো চাহিদার পুরো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, আবার কখনো ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। তবে নগরীতে গড়ে ২০ থেকে ৩০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

এর আগে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে নগরীতে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৩৯ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ১১৩ মেগাওয়াট। বর্তমানে নগরীতে দিনে-রাতে গড়ে ১৩৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ১১১ মেগাওয়াট। এতে গড়ে ২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুতের এই ঘাটতিতে নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভোগান্তি বাড়ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষোভও তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

রংপুর অঞ্চলে ভয়াবহ লোডশেডিং বিপর্যস্ত জনজীবন

রংপুর অফিস: রংপুর অঞ্চলে ভয়াবহ লোডশেডিং এবং বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে জনজীবন অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। সারাদিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন কাটে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। বিনিদ্র রজনী কাটছে অনেকের।

একদিকে গরম, অন্যদিকে লোডশেডিংয়ে নগনবাসীর জীবনে যেন যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। দিন-রাত সমানতালে আসা যাওয়ায় থাকছে না বিদ্যুৎ। আধা ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে এক ঘণ্টাই নেই। এতে যেমন ব্যবসায়ীদের ব্যবসা পরিচালনায় বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে, তেমনি রাতের বেলায় গরমে ঘুমাতে না পেরে সময়মতো অফিস করতে পারছেন না চাকরিজীবীরা। বিশেষ করে পরিবারের বৃদ্ধ ও শিশুদের নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন মানুষজন। রান্নায় ব্যবহার করা ইলেকট্রিক চুলা ও রাইস কুকার ব্যবহারকারী গৃহিণীদেরও বেশ ভোগাচ্ছে এই লোডশেডিং। হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যাহত হচ্ছে স্বা¯’্যসেবা। রোগীদের উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে চরম বিপাকে পড়ছেন চিকিৎসক-নার্স ও রোগীর স্বজনেরা। এছাড়াও ¯’বির হয়ে পড়েছে রংপুরের ছোট ছোট কারখানাগুলো। নগরীর কামাল কাছনা এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী সেলিনা বেগম বলেন, ‘বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ নেই। সকালে সময়মতো খাবার রান্না করতে পারছি না। ছেলে স্কুলে যাচ্ছে না খেয়ে। ব্যবসায়ী স্বামীও না খেয়েই কাজে চলে যাচ্ছে।’গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, ‘এই গরমে শাশুড়িকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছি। বিদ্যুৎ থাকছে না, তাই সবসময় হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে হচ্ছে। এই লোডশেডিং আমাদের অনেক ভোগাচ্ছে।’কামারপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী রাসেক আলী বলেন, ‘আমার ব্যবসাই হচ্ছে বিদ্যুৎ নিভর্র। দিনের বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে আয়-রোজগার একেবারেই কমে গেছে। কর্মচারীদের বেতন দেব কী, আর দোকান ভাড়া কোথা থেকে দেব ? নিজের কথা তো নাই বললাম।’চাকুরিজীবী মাসুদুর রহমান বলেন, ‘সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে যেতে হয়। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। যার কারণে অফিসের কাজও করতে অনেক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এই লোডশেডিং সমস্যার দ্রুত সমাধানের দাবি জানাচ্ছি। নাগরিকরা বলছেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে রংপুরের প্রতিটি স্তরের মানুষ এখন নাজেহাল অবস্থায় রয়েছে। লোডশেডিং সমস্যা দ্রুত সমাধান না করা গেলে রংপুর নগরীর অবস্থা আরও অবনতি হবে।’ নেসকো রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম মন্ডল বলেন, ‘লোডশেডিং শুধু রংপুরেই নয়, এ সমস্যা সারা দেশব্যাপী। চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন কম হওয়ায় এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে খুব দ্রুত লোডশেডিং সমস্যা সমাধানে আমরা কাজ করছি।

পাইকগাছায় তীব্র লোডশেডিং

পাইকগাছা সংবাদদাতা : খুলনার পাইকগাছায় বিদ্যুতের চরম সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দফায় দফায় মিলিয়ে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ায় মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েছেন উপজেলার লক্ষাধিক গ্রাহকসহ প্রায় চার লাখ মানুষ। বিদ্যুৎনির্ভর মিল-কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধের উপক্রম হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছে।

‎খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, পাইকগাছা উপজেলায় আবাসিক, বাণিজ্যিক, সেচ ও শিল্পশ্রেণিসহ মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় এক লাখ, যার মধ্যে সচল গ্রাহক প্রায় ৮৫ হাজার। তবে গত কয়েকদিন ধরে চাহিদার বিপরীতে নগণ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় এই অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

বিপর্যস্ত ব্যবসা ও মাছের বরফকল

‎টানা লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক খাত—মৎস্য ব্যবসায়ের ওপর। বরফকলগুলোতে পর্যাপ্ত বরফ উৎপাদন না হওয়ায় স্থানীয় মাছ সংরক্ষণ ও দূর-দূরান্তে পরিবহনে তৈরি হয়েছে বড় বাধা। বরফের অভাবে মাছ পচে গিয়ে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া পোল্ট্রি খামার এবং ধান, চাল ও তেল মাড়াইয়ের মিলগুলোর উৎপাদন কার্যক্রমও থমকে গেছে।

‎উপজেলার গোপালপুর এলাকার ‘নাহিদ হাসান রাইস মিল’-এর মালিক আমিনুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,

‎”বিদ্যুতের সমস্যার কারণে মিল ঠিকমতো চালাতে পারছি না। একদিকে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে খরচ সামলাতে না পেরে বাজারে চালের দামও বেড়ে যাচ্ছে।”

‎মিলের দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল শ্রমিকরাও পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়। মিল শ্রমিক শফিকুল ইসলাম বলেন, ”বিদ্যুৎ না থাকলে মিল চলে না। মিল বন্ধ থাকলে মালিকও আমাদের ঠিকমতো বেতন দিতে পারেন না। আমরা পরিবার নিয়ে খুব অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি।”

‎সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্য ও সমাধান দাবি

‎বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পাইকগাছা জোনের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) অঞ্জন কুমার সরকার জানান, পাইকগাছা উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় ১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। অথচ গত দুই দিন ধরে মিলছে মাত্র ৩ থেকে ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

তিনি বলেন,

‎”চাহিদার পাঁচ ভাগের এক ভাগ বিদ্যুৎ পাওয়ায় আমরা বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিচ্ছি। এর ফলে গ্রাহকদের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের এবং সংশ্লিষ্ট মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”

‎এদিকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় এই অসহ্য গরমে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও রোগীদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। উপজেলার অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আগেই দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন পাইকগাছাবাসী।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ-সমাবেশ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সংবাদদাতা: চাঁপাইনবাবগঞ্জে অতিরিক্ত লোডশেডিংসহ ৮দফা দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান করেছে শিক্ষার্থীরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্র্থীদের ব্যানারে বুধবার শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অব¯’ান নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে সমাবেশ করে। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতা আব্দুর রাহিম, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী মাসুম বিল্লাহ ও রিপন আলী। বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে অতিরিক্ত লোডশেডিং চলছে। এতে স্বাভাবিক কারণে পড়ালেখা ও ক্লাস করতে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে বর্তমানে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সমাপনী পরীক্ষা চলায় শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। দিন- রাতে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা ৮ দফা দাবি জানিয়েছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, বারঘরিয়া সংলগ্ন পলিটেকনিক ও আশপাশের এলাকায় লোডশেডিং বন্ধ, পরীক্ষা চলাকালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া পলিটেকনিক সংলগ্ন এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের বিদ্যুৎ সংযোগ পিডিবি বা নেসকোর আওতাভুক্ত করা এবং শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নিরসনে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেন বক্তারা। শেষে শিক্ষার্থীরা তাদের ৮ দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষে জেলা প্রশাসকের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেন।

চলমান গ্যাস সংকট নিরসনের দাবিতে জামালপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ

জামালপুর সংবাদদাতা

নতুন গ্যাস পাম্প স্থাপন ও চলমান গ্যাস সংকট নিরসনের দাবিতে জামালপুর -টাঙ্গাইল মহা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালকরা। এতে মহাসড়কের দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রী ও অন্যান্য যানবাহনের চালকরা। ৪ ঘণ্টা অবরোধের পর স্থানীয় প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেন তারা।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৬টার দিকে মহা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে সিএনজি চালকরা।

জানা যায়, গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় দুই মাস যাবত সিএনজি চালকরা তাদের চাহিদা মতো গ্যাস পাচ্ছেনা। এতে ভাড়ায় চালিত সিএনজি চালকরা চরম দুর্ভোগে পড়েছে। অনেকে বলছেন, তাদের চাহিদা প্রতিদিন ৪শ’ থেকে ৫শ’ টাকার গ্যাস থাকলেও তারা ১০ থেকে ৮০টাকার গ্যাস পাচ্ছে। সেটাও আবার ১১থেকে ১২ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরে। জামালপুর জেলায় একটিমাত্র সিএনজি ফিলিং স্টেশন থাকায় বিভিন্ন উপজেলার চালকদের ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে জামালপুর সদরে গ্যাস নিতে আসতে হয়।

জামালপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল সাকিব বলেন, গ্যাস পাম্প গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজি চালকরা মহা সড়ক অবরোধ করেছেন। যান চলাচল স্বাভাবিক করতে তাদের বুঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

জাবেদ ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতিকুর রহমান বাবর বলেন, এখনো আমাদের কোনো গাফিলতি নেই। আমাদের এখানে গ্যাস সরবরাহ নেই। চালকদের দেব কেমনে? যতক্ষন গ্যাস সরবরাহ থাকে ততক্ষণ দিচ্ছি।

গ্যাস সরবরাহ বন্ধে দাউদকান্দিতে চরম ভোগান্তি

দাউদকান্দি (কুমিল্লা) সংবাদদাতা

কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলায় আবাসিক গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজার হাজার পরিবার। হঠাৎ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সকাল থেকেই অনেক বাসাবাড়ির চুলায় আগুন জ্বলেনি। রান্নাবান্না নিয়ে বিপাকে পড়েছেন গৃহিণীরা। বাধ্য হয়ে কেউ ইলেকট্রিক স্টোভ, কেউ ইন্ডাকশন চুলা, আবার কেউ মাটির চুলা ও লাকড়ির ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাখরাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই লো প্রেসার বা স্বল্পচাপের বিষয়ে সতর্ক করেছিল। কিন্তু সরবরাহ একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে—এমন কোনো পূর্ববার্তা দেওয়া হয়নি। ফলে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ না থাকায় আকস্মিক এই পরিস্থিতিতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। উপজেলার একাধিক এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকাল থেকেই আবাসিক সংযোগে গ্যাসের চাপ একেবারেই ছিল না। অনেক পরিবার রান্না করতে না পেরে তড়িঘড়ি করে বাজার থেকে ইলেকট্রিক রাইস কুকার, ইন্ডাকশন চুলা ও অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থা সংগ্রহ করেছেন। যেসব পরিবারের ঘরে এসব ব্যবস্থা নেই, তাদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। স্থানীয় গৃহিণী মারিয়া সুলতানা জুথি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গ্যাসের স্বল্পচাপের কথা জানানো হলেও পুরোপুরি সরবরাহ বন্ধের বিষয়টি আগে জানানো হয়নি। আগাম খবর পেলে প্রয়োজনীয় বিকল্প ব্যবস্থা করে রাখা সম্ভব হতো। হঠাৎ করে গ্যাস বন্ধ হওয়ায় একদিকে রান্নাবান্না ব্যাহত হয়েছে, অন্যদিকে বাড়তি খরচও গুনতে হচ্ছে। ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মিসেস আবু সাঈদ বলেন, “সকালে রান্না করতে গিয়ে দেখি চুলায় কোনো গ্যাস নেই। আগে থেকে জানানো হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে রাখা যেত। কিন্তু হঠাৎ গ্যাস বন্ধ হওয়ায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে।” এদিকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজার ও পরিবহন খাতেও। স্থানীয় ব্যবসায়ী রাজিব বিন সিরাজ বলেন, “সকালে বাসায় নাস্তার ব্যবস্থা না থাকায় বাজারের নাস্তার দোকানে গিয়ে দেখি, ১০ টাকার রুটি ১৫ টাকা, ১০ টাকার ভাজি ১৫ টাকা। দাউদকান্দি বিশ্বরোড থেকে গৌরীপুর মোড়ের লেগুনা ভাড়াও ২০ টাকা থেকে বেড়ে ৩০ টাকা হয়েছে এবং পাপিয়া বাসে ১০ টাকার ভাড়া ২০ টাকা হয়েছে।। এভাবে আর কতদিন চলবে? এভাবে চলতে থাকলে দেশই থমকে যাবে।” তিনি দাউদকান্দি বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে বাখরাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্টরা জানান, সমস্যা দ্রুত সমাধান করে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। তবে ঠিক কখন গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময় জানাতে পারেননি তারা। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় শুধু রান্নাবান্নাই নয়, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিভিন্ন কাজেও ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও কর্মজীবী সদস্যদের সময়মতো খাবার প্রস্তুত করতে না পারায় সমস্যায় পড়েছেন অনেক পরিবার। দ্রুত সমস্যার সমাধান করে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে গ্রাহকদের আগাম অবহিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। এতে সাধারণ মানুষ অন্তত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ পাবেন এবং আকস্মিক জনভোগান্তি অনেকটাই কমবে।