ইরানে নতুন করে মার্কিন সামরিক হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে। মঙ্গলবার রাতে দেশজুড়ে চালানো মার্কিন হামলায় ১৮ জন নিহত ও ১০৮ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইরানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। নিহতদের মধ্যে বিয়ের একটি অনুষ্ঠানে থাকা চারজনও রয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট।

ইরানি রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির উপকূলের কাছে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে চারজন নিহত এবং ৬৭ জন আহত হয়েছেন।

নতুন করে বড় ধরনের হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হওয়ায় পুরো অঞ্চলেই উদ্বেগ বাড়ছে।

অন্যদিকে ইরান বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে।

কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোরেও দেশটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়া হয়। তবে বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেগুলো প্রতিহত করেছে।

জুলাইয়ে আগের দফার হামলা-পাল্টা হামলার পর কয়েক সপ্তাহ বড় ধরনের সামরিক তৎপরতা অনেকটাই কমে এসেছিল। ওই সময়ে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি দিয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধটি ব্যাপক জনপ্রিয় নয়। সংঘাতের প্রভাবে দেশটিতে পেট্রোল ও জ্বালানির দামও বেড়েছে।

নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে কাজ করছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শীর্ষ সহযোগী। সংশ্লিষ্ট চার ব্যক্তির বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, সম্ভাব্য নির্বাচনী ক্ষতি এড়াতে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। তবে আগামী ৩ নভেম্বরের ভোটের পর সামরিক অভিযান আরও জোরদারের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।

এদিকে ব্যাপক সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যেও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি ইরান। দেশটিতে বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। বিশেষ করে বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার খবর নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন বলে জানান তার মুখপাত্র স্টেফান দুজারিক।

জাতিসংঘ মহাসচিবের অবস্থান তুলে ধরে দুজারিক বলেন, বেসামরিক মানুষের ওপর সব ধরনের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন গুতেরেস। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী সংঘাতে জড়িত সব পক্ষকে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। এর মধ্যে সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা, আনুপাতিকতা ও সতর্কতার নীতিও অন্তর্ভুক্ত।

স্বাধীন ইরানি মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির (এইচআরএনএ) হিসাবে, ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ইরানে মোট ৩ হাজার ৬৩৬ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৭০১ জন বেসামরিক নাগরিক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধে দেশটির ১৮ জন সামরিক সদস্য নিহত এবং ৭৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স এক ই-মেইলে জানিয়েছেন, ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব প্রতিবেদন সম্পর্কে তারা অবগত। তবে তার দাবি, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে মার্কিন সামরিক বাহিনী কখনো বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।

ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে একটি ভবনের পাশে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ এবং ভবনের ছাদে বড় একটি গর্ত দেখা গেছে। স্থিরচিত্রে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের কাছে রেড ক্রিসেন্টের পোশাক পরা কয়েকজনকে দেখা যায়। সেখানে বিদ্যুৎ বা যোগাযোগের একটি টাওয়ারও মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে ঘটনাস্থলের অবস্থান যাচাই করেছে রয়টার্স। ওই চিত্র অনুযায়ী, পড়ে থাকা টাওয়ারটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে ১৩৬ মিটার বা ১৪৯ গজ দূরে অবস্থিত।

বিয়ের অনুষ্ঠানের ঘটনাটি ইরানের মিনাব শহরের একটি মেয়েদের স্কুলে যুদ্ধের প্রথম দিনের ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনাও সামনে এনেছে। ওই বিস্ফোরণে ১৬০ জন নিহত হন।

যুদ্ধের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করা, হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের মতো বিদেশে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন বন্ধ করা এবং ইরানিদের সরকার উৎখাতে উৎসাহিত করার কথা উল্লেখ করেছেন।

মার্কিন হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজগুলোকেও হুমকি দিয়েছে ইরান। দেশটি জানিয়েছে, ইরানের অনুমতি ছাড়া প্রণালি অতিক্রম করলে জাহাজগুলো হুমকির মুখে পড়বে। এর প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।

সূত্র: রয়টার্স