নিউইয়র্ক টাইমস ,রয়টার্স, ফক্স নিউজ : তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রিকে চীনের সঙ্গে দর-কষাকষির ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর মাধ্যমে তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের হাতে যেন একটি বড় উপহারও তুলে দিয়েছেন। তাইওয়ান সরকারকে দুর্বল করতে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে যে চেষ্টা চালিয়ে আসছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ অবস্থান সেটিকে আরও সহজ করে দেবে। গত সোমবার থেকে চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম তাইওয়ান বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যকে কাজে লাগিয়ে প্রচার শুরু করেছে। বেইজিং ও তাইওয়ানের মানুষের কাছে তারা এমন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে যে তাইওয়ানকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র মোটেও নির্ভরযোগ্য কোনো ভরসার পাত্র নয়। উল্লেখ্য, স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে চীন। নিয়মিত বেইজিংয়ের আক্রমণের নিশানা তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে এবং তাঁর দল ‘ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি’ এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিঃশর্ত অনুগ্রহ’ পাবে না। চীনের পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস চীনা এক গবেষককে উদ্ধৃত করে এমন খবর প্রকাশ করেছে।

গতকাল চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কর্নেল জিয়াং বিন তাইওয়ানকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘অস্ত্র কিনে নিরাপত্তা পাওয়া যায় না। কেউ দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হলে নিংড়ে শেষ হওয়া ছাড়া তার জন্য আর কোনো পথ খোলা থাকে না।’ চীন চায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসুক এবং হরমুজ প্রণালি সচল থাকুক। তবে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদেশ ইরানের বিপক্ষে গিয়ে বেইজিং সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের পক্ষ নেবে না। গত শুক্রবার বেইজিংয়ে সি চিন পিংয়ের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক শেষে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ বিষয়ে মন্তব্য সামনে আসে। তিনি জানান, তাইওয়ানের জন্য বরাদ্দ প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে তিনি এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। বেইজিংয়ের সঙ্গে দর-কষাকষিতে তিনি একে ‘চমৎকার এক হাতিয়ার’ হিসেবে দেখছেন। এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এটি (অস্ত্র বিক্রি/সরবরাহ) স্থগিত রেখেছি। এখন সবকিছু চীনের ওপর নির্ভর করছে।’ তবে এর বিনিময়ে ট্রাম্প বেইজিংয়ের কাছে ঠিক কী চেয়েছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার হওয়া যায়নি।

ইরানকে কি চাপে ফেলা হচ্ছে: হরমুজ প্রণালি আবার সচল করতে ইরানকে রাজি করাবে চীন, এমন প্রত্যাশা নিয়েই শীর্ষ বৈঠকে গিয়েছিলেন ট্রাম্প। পরে ট্রাম্প জানান, তিনি সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ইরান যুদ্ধ নিয়ে কথা বলেছেন। তবে তাঁদের সেই আলোচনার বিস্তারিত এখনো আড়ালেই রয়ে গেছে। চীন চায়, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসুক এবং হরমুজ প্রণালি সচল থাকুক। তবে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদেশ ইরানের বিপক্ষে গিয়ে বেইজিং সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের পক্ষ নেবে না। এর পেছনে চীনের জোরালো কৌশলগত কারণ রয়েছে। বেইজিং বারবার বলেছে, এ যুদ্ধ হওয়া মোটেও উচিত হয়নি। সাংহাইয়ের ‘ক্রস-স্ট্রেইট রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন’-এর গবেষক বাও চেংকে বলেন, চীন হয়তো তেহরানের ওপর নিজের প্রভাব খাটাবে। তবে তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ছাড়ের বিনিময়ে এটিকে সরাসরি কোনো ‘লেনদেন’ হিসেবে দেখাতে চায় না বেইজিং। অস্ত্র বিক্রিকে বেইজিং কখনোই দর-কষাকষির মাধ্যম বানাতে চায়নি। তবে বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা বড় দেশগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ে যেকোনো ইস্যুই শেষ পর্যন্ত হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

সিন ছিয়াং, চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর তাইওয়ান স্টাডিজের পরিচালক ট্রাম্প প্রসঙ্গে বাও বলেন, ‘তিনি অনেকটা ব্যবসায়ীসুলভ আচরণ করেন। সবকিছু চুক্তির আলোকে দেখার প্রবণতা তাঁর আছে।’ তবে বাও এটাও মনে করেন, ইরান ও তাইওয়ানের মতো দুটি ভিন্ন ধরনের সংকট এক সুতোয় বাঁধা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়। চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর তাইওয়ান স্টাডিজের পরিচালক সিন ছিয়াং বলেন, ট্রাম্প যদি তাইওয়ানে ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত করেন কিংবা অস্ত্রের সংখ্যা ও মান কমিয়ে দেন, তবে চীন কয়েকভাবে এর জবাব দিতে পারে। উদাহরণ হিসেবে সিন ছিয়াং বলেন, এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি কৃষিপণ্য ও বোয়িং বিমান কিনতে পারে চীন। ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও বোয়িং জানিয়েছে, ২০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে চীন রাজি হয়েছে। এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর অন্তত ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য কিনবে বেইজিং। তবে চলতি বছরের হিসাব হবে সময়ের আনুপাতিক হিসাবে। বেইজিংয়ের আনুষ্ঠানিক অবস্থান পরিষ্কার। তাইওয়ান তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেখানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি অগ্রহণযোগ্য। তবে অধ্যাপক সিন ছিয়াং মনে করেন, বেইজিং এ ইস্যুতে যথেষ্ট বাস্তববাদীও হতে পারে। সিন বলেন, ‘তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রিকে বেইজিং কখনোই দর-কষাকষির মাধ্যম বানাতে চায়নি। তবে বাস্তবতা হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা বড় দেশগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ে যেকোনো ইস্যুই শেষ পর্যন্ত হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।’

বেইজিংয়ের কূটনৈতিক জয়: ট্রাম্পের এই দাবার চালে বেইজিং ইতিমধ্যে নানাভাবে লাভবান হয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে প্রেসিডেন্ট লাই–কে চীনের দেওয়া তকমায় তিনি আংশিক আশ্বস্ত হয়েছেন। বেইজিংয়ের চোখে লাই একজন ‘বিপজ্জনক বিচ্ছিন্নতাবাদী’, যিনি যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের পথে ঠেলে দিচ্ছেন। তবে লাই ও তাঁর সরকারের দাবি, তাইওয়ান আগে থেকেই স্বাধীন এবং এ অঞ্চলে চীনই মূলত আগ্রাসী পক্ষ। তাইওয়ানের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা রাখা উচিত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘কেউ হুট করে স্বাধীনতা চাইল আর আমরা ৯ হাজার ৫০০ মাইল দূরে গিয়ে যুদ্ধ করতে যাব, আমি এমনটা চাচ্ছি না।’ ক্লেয়ারমন্ট ম্যাককেনা কলেজের অধ্যাপক মিনশিন পেই মনে করেন, সি চিন পিং অন্তত একটি জায়গায় সফল হয়েছেন। তিনি ট্রাম্পকে তাইওয়ান নিয়ে ‘শিক্ষা’ দিতে পেরেছেন। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর আগের মতো আমাদের আগলে রাখতে পারবে না। বেইজিংয়ের রেনমিন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও সাবেক সাংবাদিক ওয়াং ওয়েন বলেন, ‘চীনাদের দৃষ্টিতে তাইওয়ান ইস্যুতে ট্রাম্পের এ মন্তব্য এক বিরাট সাফল্য।’ বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যদি তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন যথেষ্ট দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে দেন তাতেই বেইজিং বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা পেয়ে যাবে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস’-এর চায়না প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ক্রেগ সিঙ্গেলটন বলেন, আসল প্রশ্ন হলো ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের এ অস্ত্র সরবরাহ প্রক্রিয়া কয়েক সপ্তাহ, মাস নাকি আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য ঝুলে থাকবে। বেইজিংয়ের আপত্তির মুখে এই দীর্ঘসূত্রতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভরযোগ্যতায় বড় ধরনের আস্থার সংকট তৈরি করবে বলে সতর্ক করেন তিনি।