যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক নৌ অবরোধে ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়লেও তেহরান তার অবস্থান থেকে সরে আসবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অর্থনৈতিক দুর্ভোগ বাড়লেও জাতীয় নিরাপত্তা ও টিকে থাকার প্রশ্নে ইরানি জনগণ এখনও সরকারের পাশে রয়েছে। আল জাজিরা, এএফপি, রয়টার্স ।

তেহরানের সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক আবাস আসলানি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক নৌ অবরোধ সাধারণ মানুষের জীবনে উল্লেখযোগ্য কষ্ট সৃষ্টি করেছে। তবে একই সময়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যুদ্ধঝুঁকির বাস্তবতা ইরানিদের এই কঠিন পরিস্থিতি সহ্য করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছে। তিনি বলেন, “সাধারণ মানুষের জন্য অর্থনৈতিক দুর্ভোগ অনেকটাই বেড়েছে, কিন্তু নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে মানুষ এটিকে কোনওভাবে সহনীয় হিসেবে দেখছে।”

আসলানি জানান, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য ইরানের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব ফেলছে। তারপরও দেশটি এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে। তার মতে, ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে ইরানের জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তোলা, যাতে জনগণের চাপের মুখে তেহরান আলোচনার টেবিলে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র চায় জনগণ কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করুক, যাতে ইরান আলোচনায় নতি স্বীকার করে বা অবস্থান বদলায়। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটছে না।” আসলানির ব্যাখ্যায়, যুদ্ধ বা নিরাপত্তা সংকটের সময় সাধারণ মানুষ সাধারণত অর্থনৈতিক ইস্যুর চেয়ে নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও ইরানিরা আপাতত জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, “এর অর্থ এই নয় যে, অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে ইরানিদের কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো টিকে থাকা।” বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল উত্তেজনা, আঞ্চলিক সংঘাত এবং ইরানকে ঘিরে সামরিক চাপের কারণে দেশটির অভ্যন্তরে জাতীয়তাবাদী মনোভাব আরও জোরালো হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কেবল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তেহরানের কৌশলগত অবস্থান বদলানো কঠিন হতে পারে। তারা মনে করছেন, ইরান আপাতত অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করে হলেও কূটনৈতিক ও সামরিক অবস্থানে দৃঢ় থাকার নীতি অনুসরণ করছে। যদিও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সংকট দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে, তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে তেহরান।

ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা স্থগিত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, গতকাল মঙ্গলবার তিনি ইরানে নতুন করে বড় হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তির সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় তিনি হামলা থেকে সরে এসেছেন। ট্রাম্প আরও বলেন, উপসাগরীয় মিত্রদেশগুলোর অনুরোধেও তিনি হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যুদ্ধবিরতি ভেঙে দিলে ইরান উপসাগরীয় দেশে পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইল ও ইরান ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে। ট্রাম্প এর আগেও যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চান বলে জানিয়েছেন। তবে যুদ্ধ বন্ধে তাঁর চুক্তির রূপরেখা ইরান প্রত্যাখ্যান করায় তিনি মঙ্গলবার হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে জানান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প দাবি করেন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত গতকাল মঙ্গলবারে ইরানের সামরিক হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করতে অনুরোধ জানায়। সমঝোতায় পৌঁছাতে এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে বলেও ট্রাম্প জানান। তবে ট্রাম্প আরও বলেন, মার্কিন সেনাবাহিনীকে তিনি ইরানে বড় ধরনের হামলার জন্য প্রস্তুতি রাখতে বলেছেন। যদি চুক্তি না হয়, তাহলে এক মুহূর্তের নির্দেশে হামলার জন্য প্রস্তুতি রাখছেন মার্কিন সেনারা।

সিএনএনের খবরে জানানো হয়, গত শনিবার ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের শীর্ষ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকের এক দিন পরই ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরানকে ‘দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, নইলে তাদের কোনো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না’। গত রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরানের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাদের খুব দ্রুত এগোতে হবে। না হলে তাদের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’

ইরানের পক্ষ থেকে এখনো এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি যে দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা পিছু হটতে প্রস্তুত। ইরানি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি গতকাল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ দেশটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, গ্রহণযোগ্য চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র ‘যে কোনো মুহূর্তে’ ইরানের বিরুদ্ধে বড় পরিসরের হামলা চালাতে প্রস্তুত থাকবে। এর জবাবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘কৌশলগত ভুল ও ভুল হিসাব’ না করার আহ্বান জানান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে বড় ধরনের বিমান হামলা শুরু করে। পালটা জবাবে তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।

এ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা হলে ইরান আবারও প্রতিবেশী দেশগুলোর বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাতে পারে। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা দেখতে হবে।’

তিনি বলেন, অতীতেও কয়েকবার সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেও আলোচনা ভেঙে গেছে। তবে এবার পরিস্থিতি ‘কিছুটা ভিন্ন’ বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্প আরও বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে সমঝোতার খুব ভালো সম্ভাবনা আছে। যদি বোমাবর্ষণ ছাড়াই সেটা করা যায়, তাহলে আমি খুবই খুশি হব।’ এপ্রিল মাসে আলোচনার সুবিধার্থে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্ন হামলা হলেও সেটি মোটামুটি বহাল রয়েছে। এদিকে ইরান এখনো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে যায়। ইরানের এ অবস্থানের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে।