ভারতের নয়াদিল্লীতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বর্তমান সম্পর্কের টানাপোড়েন ও ভবিষ্যৎ কূটনীতি নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য রেখেছেন। রয়টার্স, আল-জাজিরা, সিএনএন।

একটি সংবাদ সম্মেলনে তিনি তেহরানের মূল অবস্থান ও উদ্বেগের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইরানের বিন্দুমাত্র আস্থা বা ‘বিশ্বাস নেই’। এই আস্থার সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক জটিলতা কাজ করছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

তিনি ওয়াশিংটনকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনায় বসতে তখনই রাজি হবে, যখন অপর পক্ষ বা মার্কিন প্রশাসন এই প্রক্রিয়ার প্রতি সম্পূর্ণ আন্তরিক ও ‘সিরিয়াস’ হবে। কেবল লোকদেখানো কোনো সংলাপে তেহরান অংশ নেবে না। বিদ্যমান সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রসঙ্গে এই ইরানি শীর্ষ কূটনীতিক উল্লেখ করেন যে, ইরান বর্তমানে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো যেকোনো উপায়ে কূটনীতিকে টিকিয়ে রাখা এবং আলোচনার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের সুযোগ দেওয়া। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে দেন যে, ওয়াশিংটনের প্রতি আস্থার চরম ঘাটতি এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে এবং যেকোনো ধরনের ইতিবাচক আলোচনার অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে।

ইরান নিয়ে ধৈর্য হারাচ্ছেন ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ইস্যুতে তিনি ধৈর্য হারাচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ইরান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা ও ইরানি বাহিনীর আরব আমিরাত উপকূলের কাছে একটি জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার খবর প্রকাশের পর তিনি এ মন্তব্য করেন। হোয়াইট হাউস বলেছে, বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকে ট্রাম্প ও সি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরান এই জলপথ কার্যত বন্ধ করে রেখেছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে নজিরবিহীন ব্যাঘাত ঘটছে। চীন ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও দেশটির জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হলেও তখন থেকে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ দিয়ে রেখেছে ওয়াশিংটন। যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা চললেও ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক শেষে ফক্স নিউজের হ্যানিটি শোতে একটি সাক্ষাৎকার দেন ট্রাম্প। গত বৃহস্পতিবার সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচার হয়। সেখানে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আর বেশি ধৈর্য ধরব না। তাদের একটি চুক্তিতে আসা উচিত।’

ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের গোপন মজুত হস্তান্তরের বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আসলে জনসংযোগ ছাড়া এটি খুব প্রয়োজনীয় বলে মনে করি না। তবে এটি আমাদের হাতে থাকলে স্বস্তি বোধ করব।’ এদিকে হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

চীনের কূটনৈতিক উদ্যোগকে স্বাগত জানাল তেহরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনা প্রশমনে চীনের যেকোনো ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগকে স্বাগত জানাবে বলে জানিয়েছে ইরান। ভারতের নয়াদিল্লীতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই আগ্রহ প্রকাশ করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে এবং কূটনীতিকে এগিয়ে নিতে চীনের যেকোনো প্রচেষ্টাকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবে।

কয়েক মাস ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সংঘাতের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি যখন টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এই যুদ্ধ বন্ধে বেইজিং পর্দার আড়ালে ঠিক কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল এই সংঘাত। চীনের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ইরানি তেলের প্রধান আমদানিকারক হিসেবে বেইজিংয়ের প্রভাব এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীন শুরু থেকেই এই যুদ্ধের বিপক্ষে শান্তির পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে আসছে।

সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আরাগচি বলেন, পাকিস্তানের উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হয়ে গেছে এমনটা বলা ঠিক হবে না। তবে আমেরিকার অনমনীয় আচরণের কারণে এই শান্তির পথটি এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতা সংঘাত নিরসনে নতুন কোনো পথ দেখাতে পারে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।