আল-জাজিরা, রয়টার্স : লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে কথিত ইয়েলো লাইন দিয়ে বাফার জোন বানিয়েছিল ইসরাইলি সেনাবাহিনী (আইডিএফ)। এখন দখল করা এলাকা আরও বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। গত রোববার এক বিজ্ঞপ্তিতে বাফার জোনের বাইরে আরও সাত শহরের বাসিন্দাদের অবিলম্বে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয় আইডিএফ।
বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আইডিএফের এক মুখপাত্র অভিযোগ করেছেন, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করছে। তাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হচ্ছে ইসরাইল। এ জন্য বিজ্ঞপ্তিতে থাকা এলাকা থেকে উত্তর ও পশ্চিম দিকে সরে যেতে আদেশ দেওয়া হচ্ছে সবাইকে।
এদিকে, বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ওই সব এলাকায় ইসরাইল হামলা শুরু করে বলে অভিযোগ উঠেছে। লেবাননি বার্তা সংস্থা এনএনএর বরাতে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়, সাত শহরের একটি কেফার তিবনিতে বিমান হামলা হয়েছে। এতে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ হামলা শুরু করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। একপর্যায়ে ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইসরাইলে হামলা করে বসে ইরানের মদদপুষ্ট হিজবুল্লাহ। প্রতিক্রিয়ায় লেবাননে হিজবুল্লাহকে দমনের কথা বলে সামরিক অভিযান শুরু করে আইডিএফ। ৮ এপ্রিল থেকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চললেও লেবাননে হামলা থামেনি। ১৭ এপ্রিল ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। এর দুদিন পরই ইসরাইল-লেবানন সীমান্ত থেকে লেবাননের প্রায় ১০ কিলোমিটার ভেতরের এলাকায় বাফার জোন প্রতিষ্ঠা করে ইসরাইল। এর সীমানা নির্ধারণে ঘোষণা করা হয় কথিত এক ইয়েলো লাইন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজায় যেভাবে ইয়েলো লাইনের কথা বলে কার্যত সেনাবাহিনী দিয়ে দখল করা হচ্ছে, সেই একই প্রক্রিয়ায় লেবাননেও এলাকা দখলের ছক কষছে ইসরাইল।
প্রসঙ্গত, বাফার জোন বলতে সেই এলাকা বোঝায়, যা সুনির্দিষ্ট কোনো দেশের অধীনে নয় এবং যা দুই বিবদমান পক্ষের মধ্যে অবস্থান করবে।
নতুন হামলার যুক্তি হিসেবে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে ইসরাইল। সিএনএনের খবরে বলা হয়, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়তাহু গতকাল দাবি করেছেন, হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। তাই লেবাননে ‘বলপ্রয়োগ করে অভিযান চালাচ্ছে’ আইডিএফ। আগের দিন তিনি দাবি করেছিলেন, ইসরাইলের দিকে রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছিল হিজবুল্লাহ। এর প্রতিক্রিয়ায় আইডিএফকে শক্তি প্রয়োগের আদেশ দিয়েছেন। আইডিএফ দাবি করেছিল, তাদের গভীর রাতের অভিযানে হিজবুল্লাহর একাধিক অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে।
এদিকে, গতকাল হিজবুল্লাহ দাবি করে, লেবাননে মোতায়েন একাধিক ইসরাইলি সেনার ওপর তারা হামলা করেছে। এমনকি ওই সেনাদের উদ্ধারে আসা দলও তাদের হামলার শিকার হয়েছে।
মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে শত্রুতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে, যদিও উভয় পক্ষ একে অপরের ওপর গুলি চালানো অব্যাহত রেখেছে এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করছে। ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের মধ্যে সর্বশেষ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ জন নিহত হয়েছে।
লেবাননের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে রয়েছে। কারণ, মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি আরও তিন সপ্তাহের জন্য বর্ধিত হওয়া সত্ত্বেও ইসরাইল ও হিজবুল্লাহ একে অপরের ওপর হামলা বাড়িয়েছে।
এর আগে গতকাল রোববার হিজবুল্লাহ জানায়, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য ইসরাইলকে অভিযুক্ত করার পর তারা দক্ষিণ লেবাননের তাইবেহতে একটি উড়ন্ত গ্লাইডার দিয়ে ইসরাইলি বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়েছে। হিজবুল্লাহ বলেছে, এই হামলায় ‘নিশ্চিতভাবে আঘাত হানা হয়েছে’। পরে ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননের বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ জারি করে।
ইসরাইলি বিমান হামলায় ১৪ জন নিহত
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি বাহিনীর ভয়াবহ বিমান হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত রোববার চালানো এই হামলায় আরও অন্তত ৩৭ জন আহত হয়েছেন। হতাহতদের মধ্যে দুই শিশু এবং দুই নারী রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে মন্ত্রণালয়।
একই দিনে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে যুদ্ধ চলাকালীন এক ইসরাইলি সেনা নিহতের খবর নিশ্চিত করেছে তেল আবিব। চলমান যুদ্ধবিরতির মাঝেও গত কয়েকদিন ধরে চলা পাল্টাপাল্টি হামলায় দুই দেশের পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই হামলার পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, যেকোনো ‘পরিকল্পিত বা আসন্ন’ হামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের এই অভিযানের অর্থ শুধু হামলার জবাব দেওয়া নয়, বরং যেকোনো তাৎক্ষণিক বা উদীয়মান হুমকি নস্যাৎ করার ক্ষেত্রেও আমরা পূর্ণ স্বাধীনতা বজায় রাখব।
এদিকে, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের সাতটি শহরের বাসিন্দাদের দ্রুত এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। যেহেতু ইসরাইল দাবি করেছে, তারা যে কোনো পরিকল্পিত বা আসন্ন হামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রাখে।
হিজবুল্লাহর সাথে চলমান উত্তেজনার জেরে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি তেল আবিবের। তবে বেসামরিক এলাকায় এই প্রাণহানি এবং বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ পুরো যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়াকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।