যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি আলোচনা নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন যে, ইরানের পক্ষ থেকে এবার ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাবে। এদিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবরোধ এখন আঞ্চলিক শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতির বর্ধিত মেয়াদ আসলে কতদিন স্থায়ী হবে তা একমাত্র ট্রাম্পই নির্ধারণ করবেন। ইরানের পেতে রাখা মাইন থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি মুক্ত করতে ৬ মাস লাগতে পারে। এছাড়া মাইন স্থাপনকারী কোনো নৌযান দেখলেই গুলী চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বিবিসি, গালফ নিউজ, রয়টার্স, এপি, টাইমস অব ইসরাইল।
ইরান ইস্যুতে মার্কিন দূতের সঙ্গে বৈঠক
ইতিবাচক অগ্রগতির’ আশায় পাকিস্তান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি আলোচনা নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স নাটালি বেকারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি। বৈঠক শেষে এক বিবৃতিতে নাকভি আশা প্রকাশ করেছেন যে, ইরানের পক্ষ থেকে এবার ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’ দেখা যাবে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনার দ্বিতীয় দফার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। উল্লেখ্য, তেহরান তাদের প্রতিনিধি দল পাঠানোর বিষয়ে নিশ্চিত না করায় এই আলোচনা পিছিয়ে গিয়েছিল।
বিবৃতিতে নাকভি জানিয়েছেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা আশা করছেন, সব পক্ষ কূটনীতিকে একটি সুযোগ দেবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোয় তার প্রশংসা করেছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এটিকে উত্তেজনা প্রশমনের পথে একটি স্বাগত পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন তিনি। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ‘গঠনমূলক ভূমিকার’ প্রশংসা করেছেন মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স নাটালি বেকার।
যুদ্ধবিরতি কত দিন থাকবে তা
কেবল ট্রাম্প জানেন: হোয়াইট হাউস
ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতির বর্ধিত মেয়াদ আসলে কতদিন স্থায়ী হবে, সে বিষয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নেই বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। বুধবার প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সাংবাদিকদের জানান, এই সময়সীমা একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই নির্ধারণ করবেন। লেভিট বলেন, প্রেসিডেন্ট ইরানের প্রস্তাব পাওয়ার জন্য কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেননি। শেষ পর্যন্ত এই সময়রেখা কী হবে, তা কমান্ডার-ইন-চিফ নিজেই ঠিক করবেন। যুদ্ধবিরতি তিন থেকে পাঁচ দিন স্থায়ী হতে পারে বলে সংবাদমাধ্যমে যে খবর এসেছে, তা সঠিক নয় বলেও জানান তিনি। এদিকে ইরান কর্তৃক দুটি কন্টেইনার জাহাজ জব্দের ঘটনাকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বলে মনে করছেন না ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লেভিট বলেন, এগুলো যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের জাহাজ ছিল না।
অবরোধ খেলায় পিছু হটার লক্ষণ নেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ব্লকেড বা অবরোধ এখন আঞ্চলিক শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান-কেউই নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে না।ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত দেশটির ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে, প্রায় দুই মাস ধরে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের অবরোধ বজায় রেখেছে ইরান, যার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস, নৌ অবরোধের ফলে সৃষ্ট চরম অর্থনৈতিক ক্ষতি তেহরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে এবং তাদের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করবে। ইরান নিশ্চিতভাবেই এর জন্য চড়া মূল্য দিচ্ছে। এই শহরেই আমরা তার প্রমাণ পাচ্ছি; মানুষ আমাদের কাছে তাদের চাকরি হারানো এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কথা বলছেন-ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে তারা তাদের উদ্বেগের কথা জানাচ্ছেন।
কিন্তু ইরানের নেতারা আত্মসমর্পণ করবেন না। এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা ‘ডিএনএ’-তে আত্মসমর্পণ নেই। তারা বিশ্বাস করেন, তারা এই কষ্ট সয়ে নিতে পারবেন এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই পিছু হটবে। এই অচলাবস্থা নিরসনে প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানসহ বিভিন্ন পক্ষ থেকে নিবিড় প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
গত বুধবার ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে জানান, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার বোমা হামলার হুমকি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। তিনি এই ঘটনাগুলোকে ‘প্রকৃত আলোচনার’ ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী এই সামুদ্রিক করিডোর ‘সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত’ করার বিষয়ে ইরানেরও কিছু প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে এটি স্পষ্ট, ইরান কেবল তাদের নিজস্ব শর্তপূরণ হলেই তা করতে রাজি হবে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনা শুক্রবারের মধ্যেই শুরু হওয়ার ‘সম্ভাবনা আছে’ বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল বুধবার ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় সন্ধ্যায়। তার আগেই ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর থেকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান।
হরমুজ মাইনমুক্ত করতে লাগতে পারে ৬ মাস
তেল নিয়ে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা
ইরানের পেতে রাখা মাইন থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি মুক্ত করতে অন্তত ৬ মাস লাগতে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনের বরাতে গত বুধবার ওয়াশিংটন পোস্ট এ তথ্য জানিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ দীর্ঘ সময়ের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও অনেকটা সময় চড়া থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি প্রায় বন্ধ করে রেখেছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম যেমন হু হু করে বাড়ছে, তেমনি বিশ্ব অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) পাঁচ ভাগের এক ভাগ এ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। বর্তমানে যুদ্ধবিরতি চললেও যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে এই পথটি কার্যত বন্ধই রয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও সমুদ্রপথটি মাইনমুক্ত করতে কয়েক মাস লেগে যাবে। পেন্টাগন মনে করছে, যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের উদ্ধার অভিযান শুরু করা সম্ভব নয়। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির এক গোপন ব্রিফিংয়ে এই ৬ মাসের কথা জানানো হয়েছে।
আইনপ্রণেতাদের জানানো হয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে ২০টি বা এরও বেশি মাইন পেতে রেখেছে। এর মধ্যে কিছু জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ফলে এগুলো শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য এএফপি যোগাযোগ করলে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল ওয়াশিংটন পোস্টের এ তথ্যকে ‘ভুল’ বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সতর্ক করে বলেছে, সমুদ্রের প্রায় ১ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে তারা ‘বিপজ্জনক অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করেছে, যা ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের তুলনায় ১৪ গুণ। এই বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে মাইন থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।