নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৬০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। গত ২৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে হিমালয় অঞ্চলের এই দুই সীমান্তে বিশাল এক পাহাড়ধস ও হিমবাহ ধসের (Glacial Lake Outburst) কারণে এই বিপর্যয় ঘটে। ত্রিশালী ও ভোতেকোশি নদীর অববাহিকায় এক দানবীয় পানির দেয়াল ধেয়ে এসে পুরো উপত্যকা লণ্ডভণ্ড করে দেয়।
নেপাল পুলিশ ও তিব্বত কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে মোট মৃতের সংখ্যা ১৬২ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপাল অংশেই ১৫৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
নেপালের চিতওয়ানে সবচেয়ে বেশি ৬৪টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি ধাদিংয়ে ২৭, নাওয়ালপরাসি ইস্টে ২২, গোরখায় ১৯, নুওয়াকোটে ১৩, তানাহুনে ৯ এবং রাসুয়ায় ৩ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে। দুর্যোগে নেপাল পুলিশের ২৮ সদস্যও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
এছাড়া, নিখোঁজ পর্যটকের সংখ্যা এখন ৫৭৯-এ দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ৪৬৬ জন ২৮টি ভিন্ন দেশের বিদেশি নাগরিক। নেপালি পুলিশ বলছে, নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ১১৩ জন নেপালি, ৫৪ জন মার্কিন নাগরিক এবং নিখোঁজ ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা ৩৩ জন।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ভারতের ১৩৩ জন রয়েছেন।
বন্যায় অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অন্তত ১৯টি যান চলাচলযোগ্য সেতু ধ্বংস হয়েছে এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার পাকা মহাসড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে। নেপালের রসুয়া জেলা এবং চীনের তিব্বতের জিরং (Gyirong) বাণিজ্য বন্দর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রধান ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজসহ (Friendship Bridge) বেশ কিছু সেতু এবং পাসাং লামু হাইওয়ের বিশাল অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কাস্টমস পয়েন্টে অপেক্ষমাণ তিন শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক ভেসে গেছে।
এদিকে, দুর্যোগের ঘটনায় আহত ৪১ জন বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে মহারাজগঞ্জের টিইউ টিচিং হাসপাতালে ২০ জন, ত্রিশূলী হাসপাতালে ৯ জন, ট্রমা সেন্টারে ৪ জন, বীর হাসপাতাল ও নরভিক হাসপাতালে ৩ জন করে এবং ছাউনির বীরেন্দ্র মিলিটারি হাসপাতালে একজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, তিমুরে, স্যাফ্রুবেশি, বেত্রাবতী, ত্রিশূলী বাজার ও দেবীঘাট এলাকায় ‘চরম ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য প্রাথমিক। নুওয়াকোট, ধাদিং, গোরখা ও চিতওয়ান জেলার ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকায় উচ্চ ঝুঁকি থাকায় সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত রাসুয়ার গালছি-নুওয়াকোট ও স্যাফ্রুবেশি সড়ক এবং মুগলিং-নারায়ণগড় সড়ক এড়িয়ে চলার জন্য জনসাধারণকে অনুরোধ করেছে কর্তৃপক্ষ।
এর আগে, বুধবার সকালে দিকে আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের কারণে নেপালের ভোটেকোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। এতে সীমান্তবর্তী জনপদ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং কাঠমান্ডু-কেরুং বাণিজ্যপথের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে বন্যার পানি ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় গিয়ে মিশে যায়।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে রাসুয়া-রাসুওয়াগাধি সীমান্ত চৌকি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে একটি বরফ-পাথরের ধস থেকে বন্যার সূত্রপাত হয়। ধসের কারণে ভোটেকোশি নদীর শাখা লহেন্দে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরে ধ্বংসাবশেষের স্রোত তিমুরে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ে।
আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে তিন মাসের জন্য দুর্যোগকবলিত অঞ্চল ঘোষণা করেছে নেপাল সরকার। আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, বাস্তুচ্যুতদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর এবং সেনাবাহিনী ও বেসরকারি হেলিকপ্টার ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, নেপালি সেনাবাহিনী ও বেসরকারি হেলিকপ্টার পরিচালনাকারীরা আকাশপথে ১১৪ জনকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী ৮৫ জনকে উদ্ধার করেছে। তিমুরে থেকে ধুনছে ৬০ জন, তিমুরে থেকে ত্রিশূলী ১৩ জন, মাইলুং থেকে ৫ জন, বেত্রাবতী থেকে ৪ জন এবং ত্রিশূলী থেকে ৩ জনকে উদ্ধার করে কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি হেলিকপ্টার পরিচালনাকারীরা আরও ২৯ জনকে উদ্ধার করেছে। কৈলাশ হেলিকপ্টার, প্রভু হেলিকপ্টার ও ফিশটেইল এয়ার পাঁচজন করে আহতকে মহারাজগঞ্জের টিইউ টিচিং হাসপাতালে নিয়ে যায়। সিমরিক এয়ার দুই দফায় যথাক্রমে তিন ও দুইজনকে উদ্ধার করে। এ ছাড়া অন্নপূর্ণা হেলিকপ্টার চারজন, এভারেস্ট এয়ার দুজন এবং প্রভু হেলিকপ্টারের আরেকটি ফ্লাইট দুজনকে বীর হাসপাতালে নিয়ে যায়।
জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ হেলিকপ্টার ও ড্রোন পরিচালনাকারীদের জেলা প্রশাসন, নিরাপত্তা সংস্থা ও স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার অভিযান পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছে। আটকে পড়া বাসিন্দাদের নিজেদের অবস্থান জানানোর জন্য আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়ার সংকেত দেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
নেপালের বন্যা পরিস্থিতিতে ভারত, চীন ও বিশ্বব্যাংক দ্রুত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়।
অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলের সঙ্গে কথা বলে বিশ্বব্যাংকের নেপাল কান্ট্রি ডিরেক্টর ডেভিড সিসলেন জানিয়েছেন, বিভিন্ন উৎস থেকে জরুরি সহায়তা হিসেবে সর্বোচ্চ ২৫ বিলিয়ন নেপালি রুপি সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে।
এদিকে, জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রীর তালিকা চেয়েছে ভারত। কাঠমান্ডুতে ভারতীয় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানোর বিষয়টি সমন্বয় করছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খানাল।
অন্যদিকে, তাৎক্ষণিক নগদ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে নেপালে অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে বেইজিং।
সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে আন্তর্জাতিক সহায়তা গ্রহণ ও তা যথাযথভাবে ব্যবহারের প্রক্রিয়া পরিচালনা করছেন নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে।
প্রাথমিকভাবে ৪.৪ মাত্রার একটি মৃদু ভূমিকম্পকে এই বন্যার কারণ মনে করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) স্পষ্ট করেছে যে এটি কোনো ভূমিকম্প ছিল না। মূলত উজান থেকে হিমবাহ ধস, পাথর ও মাটির প্রবল স্রোত (Debris Flow) ভেঙে পড়ার কারণে নদীর পানির উচ্চতা ১০০ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং মুহূর্তের মধ্যে এই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।