পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’কে ইহুদিপন্থী বিশ্লেষক ও গণমাধ্যমগুলো একটি সম্ভাব্য ‘ইসলামিক ন্যাটো’র সূচনা হিসেবে দেখছে। গত ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যে এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
রোববার ইসরাইলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইলের এক প্রতিবেদনে ইতালীয় রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক সার্জিও রেস্তেল্লি মক্কা চুক্তি নিয়ে এমন অভিমত দেন।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আসিফ এই জোটের এমন একটি বিষয় তুলে ধরেছেন যা এর আনুষ্ঠানিক দলিলে সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল আর তা হলো—একটি শত্রু ইসরাইল (এবং ভারত)।
রেস্তেল্লি জানান, আসিফ মুসলিম দেশগুলোকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি সম্মিলিত সামরিক ফ্রন্টের পক্ষে কথা বলেছেন কেননা ইসরাইলের হুমকি ফিলিস্তিন ছাড়িয়ে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব পর্যন্ত বিস্তৃত। পাকিস্তান কখনোই ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং দেশটির রাজনীতিবিদরা প্রায়ই তীব্র ইসরাইলবিরোধী ও তীব্র ইহুদিবিদ্বেষী অবস্থান গ্রহণ করেছেন। আসিফের এই সাম্প্রতিক হস্তক্ষেপকে সময়ে ঘটল যখন ইসলামাবাদ সৌদি আরব এবং তুরস্কের সাথে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি বিশ্বের তিনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রকে একত্রিত করেছে, যাদের সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ৩৮ কোটি। চুক্তির অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা তিনটি দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে।
রেস্তেল্লির মতে, কাগজে-কলমে, এটি নির্দিষ্ট কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি আত্মরক্ষামূলক চুক্তি। কিন্তু পাকিস্তান ইতোমধ্যেই এটিকে একটি বৃহত্তর উদ্দেশ্য দিতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। দেশটি সৌদি আরবে ইরানের আক্রমণের বিরুদ্ধে একটি আত্মরক্ষামূলক চুক্তিকে ইসরাইল ও ভারতের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ মুসলিম উদ্যোগে পরিণত করেছে।
তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি, ব্যাপক যুদ্ধ অভিজ্ঞতা এবং একটি ক্রমবর্ধমান অত্যাধুনিক দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প নিয়ে আসে। সৌদি আরব নিয়ে আসে আর্থিক শক্তি, বিপুল প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং আরব ও ইসলামী বিশ্বে অতুলনীয় রাজনৈতিক প্রভাব।
পাকিস্তান এমন কিছু নিয়ে এসেছে, যা উভয়েরই নেই: পারমাণবিক অস্ত্র। এর পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম পেশাদার সামরিক বাহিনী এবং সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে কয়েক দশকের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও রয়েছে।
তবে পাকিস্তান তাদের নিজেরই সৃষ্ট তালেবানদের আক্রমণের মুখেও রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে স্বাধীনতাকামী বেলুচিস্তানের শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী। এই মুহূর্তে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও নির্বাচনি জালিয়াতির বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ চলছে।
রেস্তেল্লি বলেন, আসিফের এমন পদক্ষেপ, পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলের অন্তত একটি অংশ এই চুক্তিটিকে একটি ত্রিপক্ষীয় সুরক্ষা নীতির চেয়েও অনেক বেশি কিছু হিসেবে দেখছে। তাদের লক্ষ্য হলো একটি ইসলামি ন্যাটোর কাছাকাছি কিছু একটা তৈরি করা।
প্রত্যেকটি যৌথ নিরাপত্তা সংস্থাকেই শেষ পর্যন্ত একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়: কার বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরক্ষা? পাকিস্তান ইতোমধ্যেই সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, যা মক্কা চুক্তি উপেক্ষা করেছে।
ইসরাইলকে একটি সাধারণ হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা, কারণ এই তিনটি সদস্য রাষ্ট্রের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক মৌলিকভাবে ভিন্ন।
তুরস্কের অবস্থান ভিন্ন। আঙ্কারা ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয় এবং কয়েক দশক ধরে এর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে, যদিও প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের অধীনে সম্পর্কের নাটকীয় অবনতি ঘটেছে।
এদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরাইলের অবস্থান সবচেয়ে নাজুক বলে উঠে এসেছে টাইমস অব আসরাইলের প্রতিবেদনে। রিয়াদ ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয় না, কিন্তু সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথে কেননা আব্রাহাম চুক্তির পরবর্তী যৌক্তিক পর্যাযয়ে রয়েছে। এছাড়া ভারত, উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপকে সংযুক্তকারী উদীয়মান অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোরের মতো প্রকল্পগুলো এমন একটি অঞ্চলে অনেক বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে যেখানে সৌদি আরব ও ইসরাইল সহযোগিতা করতে পারে এবং ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের সন্ত্রাসী হামলার আগে সৌদি আরব প্রায়শই আব্রাহাম চুক্তিতে যোগদানের বিষয়টি বিবেচনা করেছে।
মক্কা চুক্তির একটি সুস্পষ্ট ইসরাইল-বিরোধী ব্যাখ্যা এই কাজটিকে যথেষ্ট কঠিন করে তুলবে। এটি নতুন জোটটি গঠনের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তার জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা তৈরি করে।
সৌদি আরব পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় স্বাচ্ছন্দ্যে অংশগ্রহণ করতে পারে, বিশেষ করে ইরান ও হুথিদের বিরুদ্ধে। রিয়াদের জন্য এমন একটি সামরিক জোটে অংশগ্রহণ করা যথেষ্ট কঠিন, যার উদ্দেশ্য ইসলামাবাদ কর্তৃক ইসরাইল অথবা তার চেয়েও খারাপ, ভারতের মতো একটি শক্তিশালী মিত্রের মোকাবেলা করা হিসেবে সংজ্ঞায়িত।
রাজতন্ত্রকে একই সাথে ইসলামী বিশ্বের নেতা হিসেবে তার অবস্থান, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রতি তার সমর্থন, ওয়াশিংটনের সাথে তার কৌশলগত সম্পর্ক এবং অবশেষে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনা—এই সবকিছুই সামলাতে হয়।
উল্লেখ্য, ন্যাটো সফল হয়েছিল কারণ এর সদস্যরা সাধারণ হুমকির বিষয়ে একমত ছিল, কিন্তু মুসলিম বিশ্ব বর্তমানে ইরান, ইসরায়েল এবং ভারত ইস্যুতে বিভক্ত । বছরের পর বছর ধরে, একটি ঐক্যবদ্ধ মুসলিম সামরিক ফ্রন্টের ধারণাটি মূলত বক্তৃতা, শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণা এবং রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। মক্কা চুক্তি তিনটি সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সুন্নি মুসলিম রাষ্ট্রকে সংযুক্ত করে একটি প্রকৃত সম্মিলিত প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরি করেছে। খাজা আসিফ এখন এর আদর্শিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা যোগ করেছেন। পাকিস্তান স্পষ্টতই চায় যে এই কাঠামোটি আরও বড় কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হোক। সৌদি আরব এবং তুরস্ক একই জিনিস চায় কিনা, সেই প্রশ্নই নির্ধারণ করবে যে মক্কা চুক্তিটি একটি বাস্তবসম্মত ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে থাকবে, নাকি ভূমধ্যসাগর থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সম্পূর্ণ নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে উঠবে।