মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রভাবে যুক্তরাজ্যে আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে জ্বালানি তেলের দাম। আর খুচরা বাজারে তেলের দাম বাড়ার সাথে সাথেই দেশটির পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি চুরির ঘটনা রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ কোটি ২২ লাখ টাকার তেল পাম্প থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করা যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ‘ফোরকোর্ট আই’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। দেশটির প্রায় সাড়ে আট হাজার পেট্রোল স্টেশনের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করে তৈরি করা এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুরুর পর থেকে পেট্রোল পাম্পে মূল্য পরিশোধ না করে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা আগের তুলোনায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ফোরকোর্ট আই-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ ৮ হাজার ৯০০ লিটার জ্বালানি চুরি হচ্ছে, যা যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি। আর্থিক মূল্যে এই ক্ষতির পরিমাণ দৈনিক প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার পাউন্ড, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ কোটি ২২ লাখ টাকা। সংঘাতের আগের সময়ের তুলনায় চুরি হওয়া তেলের আর্থিক মূল্য বেড়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ। উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যেখানে যুক্তরাজ্যে প্রতিদিন গড়ে ২,৪০০টি চুরির ঘটনা রেকর্ড করা হতো, বর্তমানে তা লাফিয়ে বেড়ে প্রায় ২,৮৭২টিতে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়, জ্বালানি চুরির ক্ষেত্রে দুষ্কৃতকারীরা মূলত দুটি পথ বেছে নিচ্ছে। প্রথমত, গাড়িতে তেল পূর্ণ করার পরপরই পেমেন্ট না করে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে পালিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, তেল নেওয়ার পর টাকা বা কার্ড নেই বলে অজুহাত দেওয়া এবং পরবর্তীতে ভুয়া তথ্য দিয়ে সটকে পড়া। শুধু অর্থ বা তেল চুরিই নয়, জ্বালানির অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের ক্ষোভের মুখোমুখি হতে হচ্ছে পাম্প কর্মীদের। অনেক ক্ষেত্রে পাম্পের কর্মীরা নিয়মিত গালিগালাজ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং এমনকি শারীরিক আক্রমণের শিকার হচ্ছেন বলেও ফোরকোর্ট আই তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাম্প মালিকরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির শরণাপন্ন হচ্ছেন। অপরাধ দমনে ফোরকোর্ট আই যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ফেসওয়াচ’-এর সাথে। এই উদ্যোগের আওতায় প্রায় ২ হাজারেরও বেশি খুচরা বিক্রেতাকে বিনামূল্যে বিশেষ প্রযুক্তি সরবরাহ করা হবে, যা চোর ও অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করতে এবং তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানাতে সাহায্য করবে।

আন্তর্জাতিক বাজারে গত জুনে কিছুটা বিরতির পর শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় তেলের দাম আবারও বৃদ্ধি পায়, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

যুক্তরাজ্য সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কোনো অসাধু চক্র বা ব্যবসায়ী যেন কৃত্রিমভাবে দাম না বাড়ায়। তবে দেশটির তদারকি সংস্থা 'কম্পিটিশন অ্যান্ড মার্কেটস অথরিটি' জানিয়েছে, বাজারে ব্যাপক কারসাজির তথ্য না পাওয়া গেলেও কয়েকটি সুপারমার্কেট ও খুচরা প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, ব্যবসায়ীদের সংগঠন 'ব্রিটিশ রিটেইল কনসোর্টিয়াম' জানিয়েছে, প্যাকেজিং ট্যাক্স, ব্যবসায়িক কর এবং জাতীয় বীমা অবদান বেড়ে যাওয়ার ফলেই খুচরা পর্যায়ে জ্বালানির দামে এই প্রভাব পড়েছে। সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক সংকটের কারণে যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব এখন দেশটির সড়ক ও পেট্রোল পাম্পগুলোতে সরাসরি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

সূত্র: বিবিসি