সংগ্রাম ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে ইরান। এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক ফোনালাপ করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে। এপি, রয়টার্স, ফার্স
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আরাঘচি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলেন। এসব আলোচনায় আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়ার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হয়। ফোনালাপগুলোতে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রকে যেকোনও সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে ইরান পুনর্ব্যক্ত করে, দেশটির সার্বভৌমত্ব বা জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যেকোনও হামলার জবাবে তারা ‘দৃঢ়ভাবে’ প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত। এদিকে, এসব কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় বিবৃতি দিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলসংক্রান্ত নিয়ম উপেক্ষা করে এবং তেহরানের দৃষ্টিতে অননুমোদিত রুট দিয়ে জাহাজ চলাচলের নির্দেশ দিয়ে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে ওয়াশিংটন। এ ছাড়া, বাণিজ্যিক জাহাজ ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক চলাচল গোপন করা, নতুন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধ আরোপ এবং ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে বিমান হামলা চালানোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির ভিত্তি দুর্বল করছে বলেও অভিযোগ করেছে তেহরান।
অন্যান্য দেশের জ্বালানিক্ষেত্র ভস্ম করে দেওয়ার হুমকি ইরানের
ইরান সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রকে যেকোনো ‘বেপরোয়া পদক্ষেপ’ নেওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি অনুযায়ী যদি মার্কিন বাহিনী ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে আবার হামলা চালায়, তবে কঠোরভাবে তার জবাব দেওয়া হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত শনিবার তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক টেলিফোন আলাপে এ হুঁশিয়ারি দেন।
আব্বাস আরাগচির এ হুঁশিয়ারির কয়েক ঘণ্টা আগে কুয়েতের সেনাবাহিনী দাবি করে, তারা ইরানের ছোড়া ড্রোন ভূপাতিত করেছে। কুয়েতের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরান ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলেও জানায় তারা। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে কথা বলার সময় আরাগচি বলেন, যেকোনো আগ্রাসনের জবাবে ইরান দৃঢ় ও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে। নিজের টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অস্থিতিশীল কর্মকা-ের’ সম্ভাব্য পরিণতি এবং এর ফলে এ অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা নিয়েও আলোচনা করেছেন তিনি। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গতকাল শনিবার ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন। যুবরাজ ইরান-সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা নিয়ে ‘উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চান’ বলে একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস।
পরে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে আলাপকালে আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যেকোনো হামলা বা এ ধরনের পদক্ষেপে আঞ্চলিক কোনো দেশের অংশগ্রহণের জবাবে ইরান ‘সমান প্রতিক্রিয়া’ জানাবে। এদিকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গতকাল ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন। যুবরাজ ইরান-সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা নিয়ে ‘উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চান’ বলে একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম নূরনিউজ গতকাল জানায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা চালায়, তবে ইরান সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেলক্ষেত্র, পাশাপাশি কাতার ও ইসরাইলের গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালাবে। নূরনিউজের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘সবকিছু পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হবে।’
আগের দিন শুক্রবার ক্যাম্প ডেভিডে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, তার বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকেরা এখনো ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হবেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই আলোচক দলে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও রয়েছেন। তবে ট্রাম্প এও বলেছেন, ইরানের প্রতি তার আস্থা ক্রমশ কমছে। তার অভিযোগ, ইরান বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। প্রয়োজন হলে তিনি তাদের ওপর আবার আঘাত হানবেন। ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে একই অভিযোগ করে আসছে।
হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে ইরানের সম্মতি
হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষে কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারীদের তৈরি একটি সমঝোতা প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে ইরান। ইসরাইলী সম্প্রচারমাধ্যম এন ১২-কে আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুজন কূটনীতিক এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির এই সম্মতিতে রাজি হয়েছে। যার কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানে বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সামরিক হামলা বাতিল করতে সম্মত হন। প্রস্তাব অনুযায়ী ইরান ও ওমানের জলসীমার মধ্যে জাহাজ চলাচল ভাগ করা হবে। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায়, হরমুজ প্রণালী হয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলো ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা দিয়ে চলাচল করবে। অন্যদিকে প্রণালীটি দিয়ে উপসাগর থেকে বেরিয়ে যাওয়া জাহাজগুলো ওমানের আঞ্চলিক জলসীমা ব্যবহার করবে। কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, ওমানও এই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে। তবে ওমান ইরানের কাছে এ বিষয়ে স্পষ্টতা চেয়েছেন। এন১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্জিত সমঝোতার প্রতি আইআরজিসি গার্ডের সমর্থন নিশ্চিত করতে কাতারি মধ্যস্থতাকারীরা ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
হরমুজ চুক্তি নিয়ে ইসরাইলের প্রতিবেদন উড়িয়ে দিল ইরান
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনও চুক্তি হয়নি বলে দাবি করেছে ইরান। দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, এ ধরনের খবর ভিত্তিহীন। ইসরাইলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইল এ খবর জানিয়েছে। ফার্সের প্রতিবেদনে ইরানের আলোচক দলের এক সদস্যের বরাতে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে কোনও সমঝোতা হয়নি। এর আগে ইসরাইলি একটি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া একটি চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছেন। ওই চুক্তি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরান ও ওমানের মধ্যে ভাগাভাগি হওয়ার কথা ছিল। এদিকে, ইরানের এক সামরিক সূত্রের বরাতে ফার্স জানিয়েছে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে সমন্বয় না করা কোনও জাহাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ এখনও বন্ধ রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আইআরজিসিকে সম্ভাব্য যেকোনও সমঝোতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির চেষ্টা চালানো ইরানি কূটনীতিকদের অবস্থানের সঙ্গে বাহিনীটির কতা সমন্বয় রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।