সুমন রায়হান

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা শুধু কবিতা রচনা করেন না- তাঁরা তাঁদের সময়, সমাজ, মানুষের স্বপ্ন, বেদনা, সংগ্রাম ও ভালোবাসাকে শব্দের শরীরে ধারণ করেন। কবি আল মুজাহিদী তেমনই একজন সৃষ্টিশীল মানুষ, যাঁর সাহিত্যচর্চা বাংলা কবিতার ভুবনে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় নির্মাণ করেছে।

১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণকারী আল মুজাহিদী বেড়ে উঠেছেন এমন এক সময়ে, যখন বাংলা সমাজ ও সংস্কৃতি নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ভাষা আন্দোলনের চেতনা, স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা, মানুষের অধিকার ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন-এসব তাঁর প্রজন্মের চিন্তা ও সৃষ্টিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ফলে তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি একটি জাতির মনোজগতের প্রতিফলনও লক্ষ করা যায়।

কবিতা তাঁর প্রধান পরিচয় হলেও আল মুজাহিদী গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদান রেখেছেন। তাঁর সৃষ্টির কেন্দ্রে ছিল মানুষ। জীবনের সাধারণ মানুষ, প্রকৃতি, গ্রামবাংলার সৌন্দর্য, স্মৃতি, সম্পর্ক ও অস্তিত্বের প্রশ্ন তাঁর কবিতার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।

তাঁর কবিতায় শব্দের বাহ্যিক চাকচিক্যের চেয়ে অনুভূতির গভীরতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন- কবিতা মানুষের সেই অন্তর্গত কথাগুলো প্রকাশ করে, যা সাধারণ ভাষায় সবসময় বলা যায় না। তাই তাঁর কবিতায় মাটি, মানুষ, নদী, মাঠ, ঋতু, স্মৃতি ও সময়ের দীর্ঘশ্বাস এক অনিবার্য উপস্থিতি লাভ করেছে।

একজন সাহিত্যিক হিসেবে সম্পাদক হিসেবেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নতুন লেখকদের উৎসাহ দেওয়া, সাহিত্যচর্চার পরিবেশ তৈরি করা এবং পাঠকের সঙ্গে সাহিত্যের যোগসূত্র দৃঢ় করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান স্মরণীয়।

কবি আল মুজাহিদীর কাব্যভুবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো- তিনি জীবনকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। তাঁর কবিতায় প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, ইতিহাস, মৃত্যু, সমাজ ও মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন পরস্পরের সঙ্গে মিশে এক স্বতন্ত্র দর্শন তৈরি করেছে। তিনি শুধু সৌন্দর্যের কবি নন; তিনি মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের কবি।

তাঁর কাব্যভাষায় আধুনিকতার অনুসন্ধানের সঙ্গে রয়েছে বাংলার মাটি ও মানুষের প্রতি গভীর টান। শহরের জটিলতা যেমন তাঁর কবিতায় এসেছে, তেমনি এসেছে গ্রামীণ জীবনের সহজ অনুভব। ব্যক্তিগত আবেগকে তিনি বহুবার বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতায় রূপ দিয়েছেন।

সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। তবে একজন কবির সবচেয়ে বড় অর্জন মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন তৈরি করা। সেই অর্থে আল মুজাহিদীর কবিতা আজও পাঠকের অনুভূতিতে জীবন্ত।

তাঁর কবিতায় প্রেম নিছক ব্যক্তিগত আবেগ নয়; প্রেম এখানে মানুষের আত্মিক মুক্তির একটি পথ। “প্রেমবন্দি” কবিতায় কবি প্রেমের এমন এক দ্বৈত অনুভূতি প্রকাশ করেছেন, যেখানে আবদ্ধতার মধ্যেও রয়েছে এক ধরনের মুক্তি, আত্মসমর্পণের মধ্যেও রয়েছে গভীর আনন্দ।

“আমি জানি তোমাকে প্রেমের মধ্যে বন্দী করা যায়

এছাড়া আমার পৃথিবীতে আর কোন সেলের গরাদ নেই।”

- প্রেমবন্দি / দূত পারাবত

“যে নারী কবিকে কাদায় কিন্তু নিজে কাঁদতে জানে না তাকে কি বলে ডাকবো আমি? “

কবিকে কাঁদায় কে/ঈভের হ্যামলেট

আল মুজাহিদীর প্রেমের কবিতায় সৌন্দর্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। “তোমার সুন্দর” কবিতায় তিনি বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে অনুভূতির সৌন্দর্যকে বড় করে দেখেছেন। প্রিয় মানুষকে দেখার মধ্য দিয়ে সৌন্দর্য যেন নতুন অর্থ লাভ করে-এ যেন প্রেমের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে নতুন করে আবিষ্কার করা।

“তুমি সুন্দর হওয়ার আগে আমি তোমার সুন্দরকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।

আমি তোমাকে যতবার দেখি আরো বেশি করে তুমি মূর্তিমতী হয়ে ওঠো।”

- তোমার সুন্দর / দিদেলাস ও ল্যাবিরিন্থ

তাঁর কবিতায় মৃত্যুচিন্তা শুধু বিষাদ বা সমাপ্তির অনুভূতি নয়; বরং তা গভীর দার্শনিক উপলব্ধির জন্ম দেয়। “হেমলকের পেয়ালা” কাব্যগ্রন্থে মৃত্যু, বিষাদ, আত্মত্যাগ ও নিয়তির প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে। কবির কাছে মৃত্যু একটি অনিবার্য যাত্রা, যা মানুষকে নিজের অস্তিত্ব ও মহাবিশ্বের বিশালতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের প্রতিও তাঁর গভীর মমত্ববোধ প্রকাশ পেয়েছে-

“আহা সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষাগুলো

কত মহৎ, কত বর্ণাঢ্য, কত অসাধারণ।”

- পিতৃভূমির প্রতি / হেমলকের পেয়ালা

“দ্রাবিড় বাংলায়” কবিতায় কবির মাটির সঙ্গে সম্পর্ক, ইতিহাসচেতনা ও শেকড়ের অনুসন্ধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর কাছে দেশ কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নয়; দেশ মানুষের স্মৃতি, সংস্কৃতি, বেদনা ও ভালোবাসার সম্মিলিত রূপ।

“একদিন পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে

চলে যাবো নক্ষত্রের প্রাচীন নগরেৃ”

- দ্রাবিড় বাংলায় / হেমলকের পেয়ালা

মানবতার প্রশ্ন আল মুজাহিদীর কবিতার অন্যতম প্রধান শক্তি। “মৃত্তিকা মানব প্রজাতি” কবিতায় মানুষকে তিনি প্রকৃতি ও পৃথিবীর বৃহত্তর অস্তিত্বের অংশ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর কবিতার মানুষ কোনো বিভাজনের প্রতীক নয়; বরং সে এই পৃথিবীর অভিন্ন সন্তান।

“আমি মৃত্তিকা!

আমি ‘গ্রীন হাউজের’ আবাসিক মানব প্রজাতি!”

-মৃত্তিকা মানব প্রজাতি / মৃত্তিকা অতি মৃত্তিকা

এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে মানচিত্রের সীমারেখার ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়-

“আমি পৃথিবীর সীমান্ত রেখা অস্বীকার করি।

এ পৃথিবী এই গ্রহ মানুষের।”

- আমার সীমান্ত নেই / প্রিজন ভ্যান

সভ্যতার ধ্বংস, যুদ্ধ ও মানুষের নির্মমতার বিরুদ্ধেও তাঁর কণ্ঠ ছিল সোচ্চার। “হলোকাস্ট, কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি” কবিতায় তিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা ও মানবসভ্যতার আত্মবিধ্বংসী প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁর প্রতিবাদ কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি মানুষের বিবেকের প্রতি এক গভীর আহ্বান।

“এই আণবিক আলো এখন নিভিয়ে দাও।

এই কালো মেঘগঞ্জে আমি আর হাতড়াবো না

সভ্যতার করাল করোটি।”

- হলোকাস্ট / কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি

আল মুজাহিদীর কবিতার আরেকটি শক্তি হলো প্রতীকের সৃজনশীল ব্যবহার। অন্ধকার, নক্ষত্র, কারাগার, মৃত্তিকা, প্রেম-এসব তাঁর কবিতায় শুধু দৃশ্যমান বিষয় নয়; এগুলো মানুষের অন্তর্জগত, আকাক্সক্ষা ও অস্তিত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। তাঁর ভাষা কখনো স্বপ্নময়, কখনো বেদনাবিধুর, কখনো তীব্র প্রতিবাদী। সবশেষে বলা যায়, কবি আল মুজাহিদীর কাব্যদর্শনে প্রেম মানুষকে গভীর করে, মৃত্যু তাকে অস্তিত্বের প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় এবং মানবতা তাকে পৃথিবীর বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে যুক্ত করে। তাঁর কবিতার মূল সুর হলো- অন্ধকারের মধ্যেও মানুষের প্রতি বিশ্বাস, ভালোবাসা ও মুক্তির অনুসন্ধান।