জাকির আবু জাফর
কবি আল মুজাহিদী, আমাদের মুজাহিদী ভাই। আমাদের আপনজন। আমাদের কাব্যভুবনের উজ্জ্বল সারথি। তিনি একজন কবি, একজন বিখ্যাত সাহিত্য সম্পাদক, একজন শিশু সাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক। তিনি দেশপ্রেমিক। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তিনি অদম্য সাহসী এবং সাহসীদের অনন্য উপমা।
তাঁর সাথে আমার পরিচয়ের সেতুটি রচিত হয়েছে তিন দশকের বেশি সময় ধরে। প্রথম সাক্ষাতের স্থানটি ছিলো দৈনিক ইত্তেফাক অফিসের একটি কক্ষ। যে কক্ষটি ছিলো পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের। হ্যাঁ, সাহিত্য সম্পাদক তিনি, অর্থাৎ আল মুজাহিদী।
ইত্তেফাক অফিস ছিলো টিকাটুলি, ১ আর কে মিশন রোড। যেখানে এখন দৈনিক নয়া দিগন্তের অফিস। ইত্তেফাক এখন কারওয়ান বাজারে। ইত্তেফাক ভবনটির বর্তমান নাম-’মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন।’ মানিক মিয়া ব্যরিস্টার মঈনুল হোসেন এবং আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর বাবা। এই মানিক মিয়াই ছিলেন ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তার পুরো নাম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া।
দৈনিক ইত্তেফাক প্রথমে সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালের ১৫ আগস্ট। চার বছর পর ১৯৫৩ সালে ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও ইয়ার মোহাম্মদ খান। এ পত্রিকারই সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি আল মুজাহিদী। ছিলেন চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে।
তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়ের সূত্রটি ছিলো কবিতা। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। লেখাপড়া আর কবিতা চলছিলো সমান তালে। কে না জানে একজন কবি তার কবিতার প্রয়োজনে একজন সাহিত্য সম্পাদকের সঙ্গে আড্ডা দেবেন! খাবেন দাবেন গল্প করবেন। আমিও তাই করেছি। দৈনিকগুলোর সাহিত্য সম্পাদকদের মধ্যে একসময় ডাকসাইটে সম্পাদক ছিলেন দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবীব। তার পরে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে ওজস্বী নামডাক কবি আল মুজাহিদীর। তিনি চারদশক অর্থাৎ চল্লিশ বছর ধরে একাধারে ছিলেন সাহিত্য সম্পাদক। তাঁর হাত ধরে তৈরি হয়েছে বাংলা ভাষার অনেক খ্যাতিমান কবি। তৈরি হয়েছে বহু প্রবন্ধকার, গল্পকার এবং ঔপন্যাসিক। অনেককেই তিনি এগিয়ে দিয়েছেন কবিতা ও সাহিত্যের পথে। এটি কেউ স্বীকার করেন। কেউ করেন না কিংবা অস্বীকারও করেন।
তো আমি লেখাপড়ার পাশাপাশি কবিতা লিখে বেড়াই। এখানে ওখানে সেখানে, সবখানে। অর্থাৎ যেখানে কবিতার ঘ্রাণ, আমি সেই ঘ্রাণ নিতে ছুটতাম। কবিতার জলসা, অনুষ্ঠান, আড্ডা এবং কবিতাকেন্দ্রিক যেকোনো আয়োজনে হাজির হয়ে যেতাম। টিএসসি, চারুকলা, শিল্পকলা, বাংলা একাডেমি, পাবলিক লাইব্রেরি, বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্র এবং পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের টেবিল ছিলো আমার এবং আমাদের কবিতাআড্ডার স্থান। এর মধ্যে সাহিত্য সম্পাদকের টেবিলের আড্ডাটি ছিলো সবচেয়ে জমজমাট। ইত্তেফাক, জনকণ্ঠ, যুগান্তর, বাংলার বাণী,সংগ্রাম, ইনকিলাব, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, সাপ্তাহিক পূর্ণিমা, সাপ্তাহিক রোববার, মাসিক ফুলকুঁড়ি, মানসিক কিশোর কণ্ঠ, মাসিক শিশু, মাসিক টইটম্বুর ইত্যাদি দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকায় আড্ডা হতো আমাদের।
এর মধ্যে দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদকের টেবিল ছিলো বিশেষ আকর্ষণীয়। এর কারণ ইত্তেফাক ছিলো জনপ্রিয় পত্রিকা। আবার ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদকের নামডাক ছিলো তুলনায় বেশি। ফলে আমাদের আকর্ষণটিও এখানে বেশি কাজ করতো।
আল মুজাহিদী একজন খ্যাতিমান কবির পাশাপাশি তখনকার সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিকের গর্বিত সাহিত্য সম্পাদক। তিনি কবিদের কবিতা ছাপিয়ে তাদের পরিচিত করে তুলতেন। পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতেন কবিদের কবিতা। যেহেতু তিনি কবিতা পৌঁছে দেবার একটি অন্যতম মাধ্যম তাই অগ্রগণ্য আড্ডার স্থান হিসেবে কবিরা তার দিকেই ছুটতেন। যেমন ছুটেছিলাম আমিও। সেসময় অর্থাৎ নব্বইয়ের দশকে এখনকার মতো দেশে এত দৈনিক কল্পনাও করা যায়নি। পত্রিকা সংখ্যা ছিলো নেহায়েতই করে গোণা। এদের মধ্যে ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতা ছিলো লেখকগোষ্ঠীর চোখে চোখে। ফলে যিনিই লিখতেন, তারই তৃষ্ণা ছিলো ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতায় ছাপা হোক তার একটি লেখা। পাতাটি ধারণ করবে তার লেখা, এমনই আশা উজিয়ে রাখতেন সবাই। অবশ্য এ ক্ষেত্রে কবিদের তৃষ্ণা ছিলো বেশি। যেহেতু আমার জগৎ কবিতারই জগৎ, পরিচয়ের এটিই ছিলো উপলক্ষ। কবিতার জন্যেই তার মুখোমুখি হয়েছিলাম আমি। সেই যে মুখোমুখি হওয়ার ক্ষণ তা ক্রমাগত ঘনিষ্ঠতায় রূপ নিয়েছে অতি অল্প দিনে।
প্রথম পরিচয়েই আপন করে নেবার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিলো তাঁর। তবে বাইরে থেকে তাঁকে মনে হতো তিনি ভীষণ কঠিন। প্রথম দেখায় অন্তত তাই মনে হয়েছিলো আমার। পরে আরও বেশি মনে হয়েছে। বাইরে কঠিন কিন্তু কঠিনের খোলসে আবৃত এক কোমল হৃদয়ের মানুষ তিনি। কথার স্বরে, শব্দের মমতা ও আন্তরিকতার ছোঁয়া আমার মনকে স্পর্শ করলো প্রথম দিনই। মনের সেই স্পর্শ ক্রমাগত বেড়েছেই। কবিতার নানান আড্ডা, আসর, জলসায়, অনুষ্ঠান ও উৎসবের নানা আয়োজনে এক সাথে কেটেছে আমাদের অজস্র মুহূর্ত। এভাবেই মুজাহিদী ভাইয়ের সাথে আমার দীর্ঘ সম্পর্কের সেতুটি তৈরি হয়েছে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের সম্পর্কের এই সেতুটি মজবুত ছিলো।
আমাদের আড্ডার কিছু বিশেষ স্থান ছিলো। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং আকর্ষণীয় স্থান ছিলো কবি ফজল শাহাবুদ্দীনের অফিস-”হারন ডায়েরি।” এটি ছিলো দৈনিক বাংলার ঠিক উল্টো দিকে। দৈনিক বাংলার মোড় থেকে ডানপাশ ধরে বায়তুল মোকাররমের দিকে এগুলে কয়েকটি বিল্ডিং পরেই ছিলো অফিসটি। এর মালিক ছিলো আশির দশকের চিত্রনায়ক হারুন সাহেব।
হারুন ডায়েরি’ বাংলাদেশে ডায়েরি, ক্যালেন্ডার এবং গ্রিটিং কার্ড তৈরি ও সরবরাহের জন্য একটি অন্যতম সেরা ও পরিচিত ব্র্যান্ড। এই চিত্রনায়ক হারুন ছিলেন কবি ফজল শাহাবুদ্দীনের বন্ধু। প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদেরও বন্ধু। অবশ্য এরশাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন কবি ফজল শাহাবুদ্দীন। কবি ফজল শাহাবুদ্দীনের অফিস কক্ষ ছিলো দোতলায়। এখানে বহুবার এসেছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তো এই ফজল শাহাবুদ্দীনের অফিস কক্ষটি ছিলো তখন কবিতা-আড্ডার জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত। এখানে আসেননি, আড্ডা দেননি কিংবা ফজল শাহাবুদ্দীনের আতিথ্য গ্রহণ করেননি এমন কোনো পরিচিত কবি ছিলেন না। ফজল ভাইয়ের অফিসে দুপুর বেলা কবিদের আনাগোনা বেশি ছিলো। কারণ দুপুরে যে কবিই আসতেন, তাকে লাঞ্চ করাতেন তিনি। উদারচিত্তে খাওয়াতেন তিনি। বিরিয়ানির প্যাকেট হাজির হয়ে যেতো প্রতিটি কবির সামনে। কোনো কবি এসেছেন অথচ কিছুই খাননি এমন ঘটনা ঘটেনি। ফজল শাহাবুদ্দীনের এ আড্ডায় আসতেন সৈয়দ আলী আহসান, আলা উদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান,
আবদুল মান্নান সৈয়দ, বেলাল চৌধুরী, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, সানাউল হক খান, আবিদ আজাদ, আবদুল হাই শিকদার, মাহবুব হাসান, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, অর্থাৎ খ্যাতিমান সকল কবিদের আড্ডা ছিলো এখানে। বিশ্বে পরিচিত নোবেলবিজয়ী কবি গুন্টার গ্রাসও এসেছিলেন ফজল শাহাবুদ্দীনের এই কক্ষটিতে। এছাড়া যুক্তরাজ্যের কবি টেড হিউজ, ইরানি কবি তাহেরা সাফারজাদেহ, ভারতের কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গাঙ্গুলি, সমরেশ মজুমদার, জাভেদ আখতারসহ আরও আরও অনেক কবির মজমা বসতো এখানে।
কবি আল মুজাহিদী ছিলেন এ আড্ডার নিয়মিত একজন। তাঁর ইত্তেফাক অফিসের বাইরে সবচেয়ে বেশি আড্ডা হয়েছে এখানে, এই ফজল শাহাবুদ্দীনের অফিসে। এমন অনেক বিকেল সন্ধ্যা কেটেছে, যখন ফজল ভাই, আল মাহমুদ ভাই, মুজাহিদী ভাই আর আমি। কখনও কখনও কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ, কবি শাহীন রেজা কিংবা আরও আরও কবিরা যোগ দিতেন। কিন্তু একটা সময় ফজল শাহাবুদ্দীন, আল মুজাহিদী, শাহীন রেজা এবং আমি, আমাদের এই চারজনের আড্ডাটি হয়ে উঠলো প্রায় নিত্যদিনের। বিকেল হলেই আমরা একে একে হাজির হয়ে যেতাম ফজল শাহাবুদ্দীনের অফিসে। তারপর ফজল ভাইয়ের গাড়িতে শুরু হতো আমাদের অভিযান। কখনও পুরান ঢাকায়, কখনও নারায়ণগঞ্জ, কখনও উত্তরা কিংবা গুলশান, কখনও ধানম-ি আবার কখনও অকারণ ঘুরে বেড়ানো। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ কোথাও থেমে চা কিংবা কোনো প্রসিদ্ধ খাবার গ্রহণ। না, আমরা তেমন করে বাজে কথায় মজতাম না, বরং কবিতা, বিশ্বসাহিত্য, ইতিহাস ঐতিহ্য, রাজনীতি শিল্পকলা এসব নিয়েই চলতো আমাদের কথপোকথন। চলতো আলোচনা। কোনো কোনো বিষয় নিয়ে বিতর্কও। এভাবে আমরা পরস্পরের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলাম। কে কোন বয়সের এ হিসাবটুকু করতেন না কেউ। বরং মনে হতো সবাই সবার বন্ধু।
এসব আলোচনা, তর্ক কিংবা পর্যালোচনায় কবি আল মুজাহিদী বরাবরই সরব ছিলেন। তিনি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ঐতিহ্য নিয়ে ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। আড্ডায় যেমন অনুষ্ঠানেও তেমনই। তিনি কোনো অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন, সেই বক্তব্যে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের কথা বলেননি, ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা বলেননি এমনটি বোধহয় কখনও ঘটেনি। একজন কবি দেশের ও মানুষের স্বাধীনতা এবং ঐতিহ্যের প্রতি এতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে পারেন, তাঁকে না দেখলে বিশ্বাস করা যেতো না। অনেকে এর সমালোচনাও করেছেন, যখন তিনি কবিতা কিংবা সাহিত্যের অনুষ্ঠানে কিংবা সাংস্কৃতিক জলসায় স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের কথা বলতেন। কিছুটা রাজনীতি-ঘেঁষা হয়ে উঠতেন, সাহিত্য বা কবিতা বিষয়ে কথা না বলে স্বাধীনতার কথা বলতেন বলে এ সমালোচনা। কিন্তু তিনি আমৃত্যু তাঁর এই চৈতন্য জাগ্রত রেখেছিলেন। কোনো দুঃশাসন, কোনো রক্তচক্ষু কোনো বিরূপতা তাঁর অবস্থান টলাতে পারেনি।
তিনি বিশ্বাসী কবি। না, শুধু বিশ্বাসী নন, দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। মাটি মানুষ ও মানচিত্রের প্রতি তিনি ছিলেন আমৃত্যু দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পৃথিবীর মানুষের প্রতি, বিশ্বমানবতার প্রতি তাঁর দরদ ছিলো সবসময়। তিনি মানবাধিকার এবং মানবিক মর্যাদার প্রতি ছিলেন সোচ্চার।
তাঁর জাতির প্রতি ছিলো তাঁর আফসোস। জাতি কেনো নিজেদের ঐতিহ্য হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে আছে এ নিয়ে তাঁর বেদনা ছিলো গভীর। যখনই কথা বলতেন, এ নিয়েই বলতেন। এ নিয়ে ভাবতেন। তাঁর কবিতা এবং সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গে এসবের ইংগিতই রয়েছে।
সত্যি হচ্ছে মুজাহিদী ভাইয়ের সাথে এত এত স্মৃতি, কোনটি রেখে কোনটি বলি! একটি একটি করে বলার স্থান এটি নয়। কি করেই বা হবে গ্রীষ্ম বর্ষা শরত হেমন্ত কিংবা শীত বসন্ত সকল ঋতুতেই অনুষ্ঠান আয়োজন চলে।
এসকল অনুষ্ঠানের বিভিন্ন আয়োজনে আমরা একসঙ্গে বসেছি। কি মঞ্চে, কি দর্শক সারিতে, বইমেলা, বাংলা একাডেমির নানা আয়োজনে আমরা এক হয়েছি। আর মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক আমাদের মতবিনিময় সহজ করে তুলেছে। সুতরাং একজন কবি আল মুজাহিদীর স্মৃতি দর্পণ খুব সহজে ভাষা পেয়ে যাবে এটি ভাবা যায় না। তাঁর বর্ণাঢ্য সাহিত্য জীবনে আমরা দীর্ঘ সময় তাঁকে পেয়েছি এটিই আমাদের আনন্দ!
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে ছাড়তে হবে পৃথিবীর বুক। এ ভুবন ছেড়ে যেতে হবে পরপারের চিরন্তন জগতে। আল মুজাহিদীও চলে গেছেন। রেখে গেছেন এক সুদীর্ঘ জীবনের আলেখ্য। যার কিছু অংশ হয়তো লেখা হবে। হয়তো হবে না। কিন্তু তাঁর লিখে যাওয়া শব্দগুলো কথা বলবে নিশ্চয়।
তিনি দীর্ঘ সময় ধরে অসুস্থ ছিলেন। শেষ এক বছর প্রায় হাসপাতাল বাসা, বাসা হাসপাতাল, এমনই কেটেছে।
সর্বশেষ যখন হাসপাতালে দেখতে গেলাম, কাঁপাকাঁপা হাতে আমার হাতটি ধরলেন তিনি। মুখে খুব একটা কথা ছিলো না। যেনো ভাষাহীন ভাষার ভেতর দিয়ে সবকিছু বললেন। হাতে হাত, মনে হলো এ এক মমতার বিনিময়। একে কোনো ভাষা ধারণ করার ক্ষমতা রাখে না। তাঁর শিয়রের পাশে ছিলাম দীর্ঘ চার ঘন্টারও বেশি সময়। এসময় একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। খুব ক্ষীণকণ্ঠে থেমে থেমে কথা বলেছিলেন তিনি।
জুলাই বিপ্লব থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, ইতিহাস ঐতিহ্য, সাহিত্য সংস্কৃতি এমন অনেক বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি। বলেছেন মুসলমানদের দুরবস্থা ও পড়ালেখা বিমুখতার কথা। বলেছেন এদেশের শত্রু মিত্রের কথা এবং বলেছেন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কথা।
সম্ভবত এটিই তাঁর সর্বশেষ সাক্ষাৎকার। এরপর তিনি আর কোনো সাক্ষাৎকার দেননি কিংবা দিতে পারেননি।
তিনি একজন উদারচিন্তার মানুষ ছিলেন। তাঁর ঔদার্য আমাকে এবং আমাদেরকে বরাবরই মুগ্ধ করেছে। এমন উদার হৃদয়ের মানুষ অন্তত কবিতা অঙ্গনে নেই আর। যারা ছিলেন তাদের কেউ নেই আজ পৃথিবীতে। কবিতাঙ্গনে জাতীয় পরিচয়ধারী সর্বশেষ প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। চলে গেলেন তিনিও। প্রায় খালি হয়ে গেলো বাংলাদেশ!