অধ্যাপক জামাল সাকিব

“বুকের ভেতর দারুণ ঝড়’ মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিনের প্রথম গল্পগ্রন্থ। এটি একটি সমকালীন জীবন-ভাষ্যের গল্পগ্রন্থ- যেখানে গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ, ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থান, সমাজ-বাস্তবতা, মানবতা, মূল্যবোধ, পারিবারিক সম্পর্ক, প্রেম, প্রকৃতি, সংগ্রাম ও জীবন-বোধের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। মনন-সৃজনের গভীর রাজ্যে নিবেদিত কবি, গল্পকার ও প্রাজ্ঞ সাহিত্য সমালোচক মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন ইতোমধ্যে সাহিত্যজগতে সাড়া জাগিয়েছেন। তাঁর শব্দচয়ন, সমাজ ও সময়কে বীক্ষণ, আকর্ষণীয় উপস্থাপনা, উপমার যুৎসই ব্যবহার যারপর নাই মনোমুগ্ধকর। বইটিতে মোট ১১টি গল্প রয়েছে। সেগুলোর শিরোনাম যথাক্রমে সোনাইছড়ির বাঁকে, কক্সবাজার এক্সপ্রেস, এন আইডি কার্ড, বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, আশ্রয়, কালের প্রহার, উত্থান, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ, নষ্ট সময়, অপারেশন লাল ব্রিজ ও সাক্ষাৎকার। প্রতিটি গল্পই পাঠকের চিন্তাকে নতুনভাবে নাড়া দেয়, ভাবিত করে।

গ্রন্থের গল্পগুলো শব্দে শব্দে স্বদেশ, সমাজবাস্তবতা, বোধ, বিশ্বাস, ভালোবাসা, প্রকৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংগ্রামের এক একটি খ-চিত্র। গ্রন্থের পাতায় পাতায় দেখা যায় মানুষের যাপিত জীবনের স্পষ্ট ছবি। লেখক সমাজের অসঙ্গতি, মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা এবং নৈতিক মূল্যবোধকে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। গল্পগুলোর সব চরিত্র বাস্তবধর্মী হওয়ায় পাঠক সহজেই তাদের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারেন। লেখকের ভাষা সহজ-সরল, সাবলীল ও হৃদয়গ্রাহী। অপ্রয়োজনীয় অলংকারের পরিবর্তে লেখকের সরল অথচ শক্তিশালী বর্ণনাভঙ্গি প্রশংসনীয়। গল্পের শান দেওয়া সংলাপগুলো ঝরঝরে ও প্রাণবন্ত এবং গল্পের গতিকে এগিয়ে নিতে সহায়ক।

গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘সোনাইছড়ির বাঁকে।’ এখানে প্রেমিক রাগিব ও প্রেমিকা শিউলি দুটি চরিত্র। রাগিব সমতলের বাসিন্দা এবং শিউলি সমুদ্র উপকূলের ললনা। গল্পে চরিত্রদ্বয়ে প্রকৃতি ও প্রেম মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় লেখকের কবিতাম-িত উপমায় রচিত প্রেমিক রাগিব ও সংগ্রামী শিউলির মধ্যকার সংলাপে। প্রেমের প্রথম রাগের কথোপকথন উঠে এসেছে এভাবেÑ “তবে তুমি সমুদ্রের চেয়ে আরও বেশি কিছু। তোমার চোখগুলো যেন সাগর-দুটি পাশাপাশি। এ সাগরে ডুবে মরতে আমার চিরসাধ।” প্রত্যুত্তরে শিউলি বলে: “ডুব তো দিয়েছো সে-ই কবে। এখন সাঁতার কাটার পালা।” [সোনাইছড়ির বাঁকে ]

বিত্ত বৈভব মুখ্য হয়ে উঠলে মানুষে মানুষে সম্পর্ক, ভালোবাসা ও প্রেম কীভাবে উপেক্ষিত হয় তা ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ গল্পের নায়িকা বৃষ্টির মায়ের কথায় প্রকাশ পায় এভাবেÑ “রুবেল সাহেবরা খুবই বড়ো লোক। তাদের কোনো ধরনের অভাব নেই। তাদের একমাত্র ছেলে ইঞ্জিনিয়ার রবিউল থাকে আমেরিকা। তোর সাথে তার বেশ মানাবে। ডায়মন্ডের এ চেইনটা তোর জন্য তার দেওয়া উপহার। বায়োডাটা দেখে তুই তোর পজিটিভ মতামত জানাবি। আমরা কিন্তু তার বাবা-মা রুবেল-দম্পতিকে আমাদের সম্মতি জানিয়ে দিয়েছি।” অন্যদিকে গল্পের নায়ক রনির কৃষক পারিবারের দুরবস্থার কথা জেনে ক্ষিপ্ত বৃষ্টির বাবার ভাষ্য আরও ভয়ানকÑ“কোথাকার নারকাটা (গালি বিশেষ) রোহিঙ্গা বামন হাত বাড়ায় চাঁদের পানে? সাধারণ একজন কৃষকের ছেলের ঘরনি হবে আমার মেয়ে? এ অসম্ভব।” [ কক্সবাজার এক্সপ্রেস ]

মধ্যবিত্ত মাস্টার বাবা তালুকদার রমিজ আহমদের আত্মমর্যাদাবোধ ও ইগো, গৃহিনী-মা জুলির হৃদয়-ভাঙ্গা আহাজারি, মাস্টার সাহেবের সহজ সরল বেকার ছেলে জামশেদুর রহমান জুয়েলের পরোপকার করতে গিয়ে পুলিশি হয়রানি, জেল খাটা, এনআইডি কার্ডের সূত্রে নির্যাতিত নারী ফারহানা ইয়াসমিন সুমির চেষ্টায় জুয়েলের কারামুক্তি ইত্যাদি গল্পকার দারুন মুন্সিয়ানার সাথে উপস্থাপন করেছেন ‘এন আইডি কার্ড’ গল্পেÑ যা পাঠককে আবেগপ্রবণ ও ব্যথিত করে। শেষে পাঠকের বুক হালকা হয় অন্য সংলাপেÑ“ঠিক এ সময় মাস্টার রমিজ সাহেব বরাবর পরপর দু’টি চিঠি নিয়ে হাজির হয় স্থানীয় ডাক পিওন। একটি হলো আদালত থেকে জুয়েলের মুক্তির আদেশপত্র; অন্যটি ‘গ্লোবাল এআই ডেভেলপার্স’ নামক বহুজাতিক একটি কোম্পানী থেকে জুয়েলের চাকরির নিয়োগপত্র। কোম্পানির প্যাড-এ সিল করা ফারহানা ইয়াসমিন সুমির নামাঙ্কিত নিয়োগপত্র” [ এন আইডি কার্ড ]

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের চরম সময়ের ভয়াবহতা প্রকাশ পায় সময়ের সাহসী নেত্রী শেলির উক্তিতেÑ“আমরা যদি না দাঁড়াই কেউই আমাদের জন্য কিছু করবে না। এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতেই হবে।” গুলিবিদ্ধ আরিফের জ্ঞান ফিরতেই উচ্চারণ করে, “বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর” স্লোগান। [বুকের ভেতর দারুণ ঝড় ]

“মা আমরা এখন আন্দোলনে আছি। যতক্ষণ না দেশ হতে স্বৈরাচার দূর হবে ততক্ষণ আমাদের আন্দোলন চলবে। আমাদের জন্য দোয়া করোÑযাতে আমরা বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারি। মা, তোমাকে আমাদের কয়েকটি সুন্দর সুন্দর স্লোগান শোনাই: ‘স্বৈরাচারের আস্তানা, বাংলাদেশে হবে না।’ ‘চেয়ে দেখ্ চোখের আগুন, এই ফাগুনে হবে দ্বিগুণ।’ ‘লাশের ভেতর জীবন দে, নইলে গদি ছাইড়া দে।’ [ হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ]

চাকুরে মধ্যবিত্তের টানাপোড়ন ও অসহায়ত্ব ফুটে উঠে চাকরি হারিয়ে ভিটেবাড়ি বিক্রি করতে উদগ্রীব আসিফের ভাষ্যেÑ “আমার টাকার ভীষণ দরকার। একদিকে চাকুরি নেই, অন্যদিকে সংসারের বিরাট বোঝা। আর সইতে পারছি না ব্যাপারী সাহেব। এ যাত্রায় আমাকে উদ্ধার করুন। আপনি যত দাম দেবেন তত দামেই আমি বসত ভিটে বিক্রি করবো।” [ কালের প্রহার ]

‘বুকের ভেতর দারুণ ঝড়’-এর সবগুলো গল্পকে একসাথ করলে মনে হবে, লেখক যেনো একজন আদর্শবাদী নাগরিকের যাপিত জীবনের চিত্রাঙ্কন করেছেন। গল্পগ্রন্থটির অন্যতম শক্তি হলো: এর বাস্তবতা ও মানবিক আবেদন। গল্পগুলো শুধু সাহিত্য রসই সৃষ্টি করে না; বরং পাঠককে চিন্তা করতেও উদ্বুদ্ধ করে। সামগ্রিকভাবে গ্রন্থটি পাঠককে সন্তুষ্ট করবে বলে আশা করা যায়।

‘বুকের ভেতর দারুণ ঝড়’ একটি পাঠযোগ্য ও উপভোগ্য গল্পগ্রন্থ। যারা জীবনঘনিষ্ঠ গল্প পড়তে ভালোবাসেন, তাদের জন্য বইটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। এ গ্রন্থের প্রকাশক কাজী সাইফুল হক, গলুই প্রকাশন, চট্টগ্রাম। প্রচ্ছদ করেছেন কাজী হক। প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি, ২০২৫। গল্পকার গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন মা-বাবাকে। চমৎকার মলাটের দৃষ্টি কাড়া ৬৪ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ২৫০ টাকা।