মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
আশির দমকের অন্যতম প্রধান কবি বিশেষ করে বাংলা কবিতার কাব্যাকাশে বিশ্বাসী ও ঐতিহ্যবাদীদের জাগরণের অন্যতম নকীব কবি মুকুল চৌধুরী। বয়সে আমার এক বছরের বড়। ২৩ এপ্রিল ২০২৫ তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন অন্তহীন গন্তব্যে আল্লাহর জিম্মায়। দেখতে দেথতে তাঁর মৃত্যুর একটি বছর পার হয়ে গেলো। সামনে এলো কবি মুকুল চৌধুরীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ‘ভাষা আন্দোলন শহীদ দিবস থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ শিরোনামের একটি লেখা লিখছিলাম। ঢাকা সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্রের উদ্যোগে আমার সম্পাদনায় ২০০২ সালে প্রকাশিত ‘ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি স্মারক’টিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আদি অন্ত ইতিহাস অংশটি একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। এরপর হাত দিলাম ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অগ্রপথিক ঈদুল আযহা ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ফেব্রুয়ারি ২০০৪ সংখ্যায়। সেখানে মুকুল চৌধুরী সাহেবের একটি লেখা রয়েছে যার শিরোনাম ‘শহীদ দিবস থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। আমি মনে মনে ভাবলাম এ বিষয়ে কাছাকাছি শিরোনামে আর লিখে লাভ কী। কিন্তু লেখাটাতে ঢুকে দেখলাম তিনি এতদ্বিষয়ে ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি স্মারকে যেসব তথ্য উপাত্ত সংযোগ করে সে বিষয়টির উপর আামি প্রথম কাজ করি যেটি এ রকম বয়ানকেই ধারণ করে সেখান থেকে তথ্য উপাত্ত টেনেই তিনি তাঁর লেখাটিও দাঁড় করিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে একাধিকবার আমার নাম ও প্রসঙ্গ রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করে আমার প্রতি তাঁর ভদ্রজনোচিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তখন আর সেখান থেকে আমার নতুন কিছু নেয়ার প্রয়োজন পড়েনি।
ব্যক্তিগত পরিচয়ের আগেই মুকুল চৌধুরীর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। আমি তখন ২২ বছরের তাগড়া যুবক। জাতীয় তরুণ সংঘ করি ১৯৭৭ সাল থেকে। কিশোরগঞ্জ থানা শাখার আমি তখন সেক্রেটরি। একুশ বছর বয়সে ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘একুশের উত্তরসূরী’ নামক লিটল ম্যাগ। সে বছর থেকেই জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিকে আমার লেখা প্রকাশের পথ ধরে বলতে গেলে আশির দশকেই স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সাহিত্যের মাঠে আবির্ভূত হই। কিশোরগঞ্জ টেক্সটাইল মিলের মহাব্যবস্থাপকের একান্ত সহকারী হিসেবে আমার কর্মজীবন শুরু। অফিস টাইম শেষ হলেই চলে যাই শহরের পাবলিক লাইব্রেরিতে। সব কটা পত্রিকায় চোখ বুলাই তবে সপ্তাহান্তের সাহিত্য পাতাই আমার মূল টার্গেট।
১২ সেপ্টেম্বর, ১৯৮২ দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার সাহিত্য পাতায় বেশ বড় একটা আর্টিকেল চোখে পড়লো। আর্টিকেলটির শিরোনাম ‘সিলেট একাডেমী পত্রিকা এবং একটি গবেষণা প্রবন্ধ’ (অসমাপ্ত)। ফাঁকে বলে নেই সিলেট সুনামগঞ্জের মেরুয়াখলা আলিয়া মাদরাসায় আমার পিতা মাওলানা হাফিজ উদ্দিন শিক্ষকতা করার এবং বড় ভাই সেখানকার মাছিমপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকুরীর সুবাদে সেখানে আমাদের বাড়ি ছিলো। পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে সেখানে মায়ের সাথে বেড়াতে গিয়েছি। মা মোসাম্মাৎ জামিলা খাতুন পূর্ব থেকেই সিলেটী নাগরীর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। সেখানে আমার ভাবি মোসাম্মাৎ হাজেরা খাতুনও নাগরি চর্চা করতেন। ফলে আমার পরিবারটি সিলেটী নাগরী চর্চার একটি কেন্দ্র ছিলো। আমি ১৯৭৪ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার পর মায়ের কাছে নাগরি তালিম নেই। যদিও স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর আগেই আমাদের সুনামগঞ্জের বাড়ি বিক্রি করে ফেলা হয় এবং যুদ্ধ চলাকালীন আমার পিতা ও ভাই যে দেশে এসেছিলেন আর সুনামগঞ্জে পিতাকে যেতে দেইনি। ভাই তার চাকুরি ডিস্ট্রিক্ট ট্রান্সফার করে কিশোরগঞ্জ নিয়ে আসেন। কিন্তু সিলেট-সুনামগঞ্জের এক সময়ের নাগরির চর্চাকারী হিসেবে মনের একটা টান সে এলাকার প্রতি সবসময় ছিলো এবং এখনো আছে।
দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত তাঁর সে লেখাটি পরবর্তী কয়েক সংখ্যা শুক্রবার সংগ্রাম সাহিত্য পাতায় ছাপা হয়। ১৫ অক্টোবর, ১৯৮২ সংখ্যায় ছাপানো অংশ সহ পুরো লেখাটি মনোযোাগের সাথে আমি পাঠ করি। এ লেখার সূত্র ধরেই ‘মুকুল চৌধুরী’ নামটির সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে। তবে কবি মুকুল চৌধুরী নয় গদ্য লেখক, গবেষক হিসেবেই তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয়। লেখাটিতে তিনি সিলেটের লোকসাহিত্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে এক পর্যায়ে উল্লেখ করেন-“সুদূর অতীত থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কাল পর্যন্ত অসংখ্য বাস্তব ঘটনা ভিত্তিক সিলেটের বুকে যতো গীতিকা রচিত হয়েছিলো সেগুলো শুধু সংখ্যাতেই যে বেশি তা নয় গুণের দিক থেকেও বাংলাদেশের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়ের সম্পাদিত ময়মনসিংহ গীতিকার হয়ত সবগুলোই আসলে সিলেট গীতিকা।” আমি তাঁর এ বক্তব্যের সাথে একমত হতে না পেরে দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক জনাব সাজজাদ হোসাইন খানের বরাবরে একটি পর্যালোচনামূলক প্রতিবাদী লেখা পাঠাই এবং তাঁর এ যুক্তি খণ্ডন করি। দৈনিক সংগ্রাম আমার এ প্রতিবাদী লেখাটি নতুন একটি কলাম সৃষ্টি করে ‘ধ্বনি প্রতিধ্বনি” নামে অক্টোবর. ১৯৮২ এর পরবর্তী সংখ্যায় ছেপে দেন। আমি তাঁকে আমার লেখায় লোকসাহিত্যের ঘটনার বিবরণে স্থানীয় কেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সাযুজ্য পাওয়ার এবং একই সাথে লোকসাহিত্যের ভাষার ক্ষেত্রে সিলেট ও ময়মনসিংহের ভিন্নতার প্রসঙ্গ টেনে তাঁর সে দাবি ও যুক্তি খণ্ডন করি। আমি তাঁকে সিলেটী নাগরী নিয়ে গবেষণার পরামর্শ দেই।
১৫ আগস্ট, ১৯৯১ এ আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত কিশোরগঞ্জ সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদের মূখপত্র ‘কিশোরগঞ্জ সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ পত্রিকায় ‘কিশোরগঞ্জের লোকসাহিত্যঃ সংশয় নিরসন” শিরোনামের লেখায় তাঁর এ প্রসঙ্গটিকে আরো বিশদভাবে খোলাসা করি। ১৯৯৩ সালে এনবিআর এর অধীনে চাকুরীর সুবাদে ঢাকায় চলে আসার পর ইসলামিক ফাউন্ডেশন হেড অফিস, বায়তুল মোকাররমে তাঁর সাথে ব্যক্তিগত পরিচয় হয়। সেই থেকে তাঁর সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তাঁর সাথে পরবর্তীতে বেশি দেখা হতো মগবাজরে কবি আসাদ-বিন-হাফিজ এর ‘প্রীতি প্রকাশণ’ এ। একদিন পুরানা পল্টনের ফুটপাতে আমার কাঙ্খিত একটি দুষ্প্রাপ্য বই কেদারনাথ মুজমদার এর ১৯০৪ ও ১৯০৭ সালে প্রকাশিত ‘ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ’ গ্রন্থটির একটি কপি পেয়ে যাই। বিক্রেতা অত্যন্ত চালাক। আমার কাছে বইটির দাম হাঁকলো ৩০০ টাকা। আমি বললাম এত দাম। বিক্রেতা বললো স্যার এটা নিতে চাইলে ৩০০ টাকাই দিতে হবে। আমি বললাম বইটি আপাতত পেছনে রাখ। ২ ঘন্টার মধ্যে আমি না আসলে বিক্রি করবে। আমি দ্রুতলয়ে চলে গেলাম ইসলামিক ফাউন্ডেশন অফিসে। দেখলাম মুকুল চৌধুরী সাহেব নোট লিখছেন। তাঁর হাতের লেখা এত সুন্দর ঝরঝরে কেউ না দেখলে আন্দাজ করতে পারবেন না। তাঁর নোটিং, নিশান লাগিয়ে ফাইল সাজানো অনুসরণ করার মতো (আমি নিজে পলিটেকনিক থেকে সেক্রেটরিয়েল সাইন্সে প্রথম শ্রেণী পাওয়া লোক) এরপরও উনাকে আমার কাছে অফিস নোটিং এর ব্যাপারে অনুকরণীয় আদর্শ মনে হলো। যাক আমি গিয়ে সালাম দিয়ে বললাম মুকুল ভাই আপনার হাতে কি কিছু টাকা হবে। তিনি বল্লেন কি বই পেয়েছেন। আমি আশ্চর্য হলাম। তিনি কেমন করে বুঝতে পারলেন যে আমি কোন বই কেনার জন্য তাঁর কাছে টাকা আছে কীনা জানতে চাইছি। সম্ভবত একেই বলে ‘জহর চিনে জওহরি’। আমি বল্লাম কেদারনাথ মজুমদারের ‘ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ’। তিনি বললেন বইটির নাম শুনেছি কিন্তু আজ পর্যন্ত দেখার সুযোগ হয়নি। তিনি আমাকে জিজ্ঞ্যাস করলেন কত লাগবে ? আমি বল্লাম ৩০০ টাকা। তিনি বল্লেন এত টাকা চাইছে। আমি বল্লাম জি। বিক্রেতা এ দামে অনড়। তিনি তখন পকেট থেকে ৩০০ টাকা বের করে আমার হাতে দিয়ে বল্লেন দ্রুত যান কিনে ফেলুন। আমি তৎক্ষণাৎ গিয়ে বইটি কিনে নিলাম। তাঁকে দুইদিন পরেই টাকাটা ফেরৎ দেই। তাঁকে নিয়ে অনেক স্মৃতির মধ্যে এটিও একটি।
১৯৯৬ সালে আসাদ বিন হাফিজ এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় তিনি প্রকাশ করেন ‘রসুলের শানে কবিতা’। এ সময়টায় মগবাজারে তাঁর সাথে ঘন ঘন দেখা হতো। রাসুলের শানে কবিতা বাংলা সাহিত্যে একটি মৌলিক সিরাত সাহিত্য সংকলন। তিনি পরবর্তীতে এ বিষয়ে আরো কাজ করেন এবং সিরাত বিষয়ে মোট ৫টি বই লিখেন। যে কাজের মূল্যায়নে ২০২০ সালে কিশোরগঞ্জ সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে পরিষদের পক্ষ থেকে তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে ‘সিরাতুন্নবি সা. রৌপ্য পদকে’ সম্মানিত করি। এর মাধ্যমেই মুকুল চৌধুরী সাহেবকে আমার সীমানায় জীবদ্দশায় সম্মানিত করার একটি সুযোগ গ্রহণ করি।
কবি মুকুল চৌধুরী ১৯৫৮ সালের ২২ আগস্ট সিলেট জেলার সদর উপজেলার খালপার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর প্রকৃত নাম মন্জরুল করীম চৌধুরী। পিতার নাম মরহুম বদরুল রাজ্জাক চৌধুরী, মাতার নাম মরহুমা সালেহা চৌধুরী। ১৯৬২ সালে বিশ্বনাথ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করে ১৯৭৩ সালে লালা বাজার হাইস্কুল থেকে এস. এস. সি এবং ১৯৭৫ সালে সরকারি এম. সি. ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৮০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এম.সি. বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে অনার্স এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সরকারী জগন্নাথ কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এস.এস ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মজীবনে তিনি ১৯৮২ থেকে ২০১৭ সালে অবসরে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এ অনুষ্ঠান সংগঠক থেকে শুরু করে উপ-পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মাসিক অগ্রপথিক, ত্রৈমাসিক ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকার সম্পাদনায় এবং দৈনিক দিনকাল এর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে সাপ্তাহিক যুগভেরিতে কবিতা প্রকাশের পথ ধরে তাঁর লেখালেখির জগতে প্রবেশ। সারাজীবনের সাহিত্যসাধনায় তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো; কবিতা: অস্পষ্ট বন্দর (১৯৯১), ফেলে আসা সুগন্ধি রুমাল (১৯৯৪), চা বারান্দার মুখ (১৯৯৭), সোয়াশ’ কোটি কবর (২০০৩), নির্বাচিত প্রেমের কবিতা (২০১০), অপার্থিব সফরনামা (২০১১), মাটির ঘটনা (২০১২) এবং কবিতা সমগ্র মুকুল চৌধুরী (২০১৮)। প্রবন্ধ/গবেষণা গ্রন্থ: ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ আফগানিস্তান (১৯৮৩), কবি ও কবিতার প্রতি রসূল (সা.) এর অনুরাগ ও উৎসাহ (২০০৩), পথিকৃৎ দশ মণীষী (২০০৪), বাংলাদেশের স্বতন্ত্র সাহিত্য ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০০৬), আফজাল চৌধুরী: কবি ও কবিতা (২০০৮), কথাশিল্পী শাহেদ আলী: জীবন ও সাহিত্য (২০১৬), তিন কবি: কবিতার অনুধ্যান ও ঐতিহ্য চেতনা (২০১৭) আরও তিন কবি ঃ ঐতিহ্যের মেধাবী উত্তরাধিকার ( ২০২০), গ্রন্থমুক্ত কথামালা (২০২১)। কিশোরগ্রন্থ: চাঁদের কথা (১৯৯৪), মানুষের চন্দ্র বিজয় (২০০৩), সেই দীপ্ত শপথ (২০০৩), সোনালী বিশ্বাস (২০০৪), ইসলামের প্রথম মিছিল (২০০৪)। সম্পাদিত গ্রন্থঃ আমাদের মিলিত সংগ্রাম মওলানা ভাসানীর নাম- (যৌথ) (১৯৮৬), অগ্রপথিক সংকলন: ভাষা আন্দোলন (১৯৯৩), রাসুলের শানে কবিতা (যৌথ) (১৯৯৬), সাহিত্য সংস্কৃতি ও মহানবী (সা.)(২০০৫), মহানবী সা. কে নিবেদিত কবিতা (২০০৫), বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরীকে নিবেদিত কবিতা (২০১০) ফররুখ আহমদ সংকলন (১৯৮৭), আফগানিস্তান আমার ভালোবাসা (১৯৮৩), ঐতিহ্য চিন্তা ও রসূল প্রশস্তি, কিশোর সাহিত্যে চাঁদের কথা (১৯৯৪), মানুষের চন্দ্রবিজয় (২০০৩), সেই দীপ্ত শপথ(২০০৩) এবং নাত যুগে যুগে। এছাড়াও সম্পাদনা করেছেন রাসূল (সা.)-কে নিবেদিত সাহাবী কবিসহ ৪০৫ জন কবির কবিতা সংকলন,ভাষা আন্দোলন (১৯৯৩)।
তিনি বি এন এস এ ইংল্যান্ড, বুক অব দি ইয়ার এচিভম্যান্ট এওয়ার্ড পান ১৯৯১ সালে; বাংলাদেশ সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ পুরস্কার ১৯৯৭ সালে; বানিয়াচঙ্গ সাহিত্য পরিষদ সম্বর্ধনায় ভূষিত হন ১৯৯৮ সালে; রাগিব রাবেয়া সাহিত্য পুরষ্কার, সিলেট ২০০৬ সালে; শিশুকবি রকি সাহিত্যপুরষ্কার, ঢাকা ২০১০ সালে; জালালাবাদ সাহিত্যপুরষ্কার ২০১২ সালে; জালালাবাদ কবি ফোরাম সম্মাননা, সিলেট ২০১৬; ডা. এ. রসুল সাহিত্যপুরষ্কার ২০১৭ কবি ফররুখ জন্মশতবর্ষ সাহিত্যপদক ২০১৮, ইত্যাদি পুরষ্কারে তিনি সম্মানিত হন। তিনি বাংলা একাডেমির সদস্য এবং সিলেট কেন্দ্রিয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের আজীবন সদস্য। ২০০৮ সালে হজ উপলক্ষে তিনি সৌদি আরব সফর করেন। সিরাত বিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা ও সংকলন প্রকাশে এবং সিরাত সাহিত্যে মৌলিক অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ কিশোরগঞ্জ সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ তাঁকে ‘সিরাতুন্নবী রৌপ্য পদক-১৪৪২ হিজরি ( ২০২০ ঈসায়ী) তে সম্মানিত করে। ২০২৪ সালে সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ প্রবর্তিত কেমুসাস সাহিত্য পুরস্খারে তিনি ভূষিত হন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে অবসর গ্রহণের পর তাঁর ঢাকায় যাতায়াত একদম কমে যায়। তিনি সিলেটে তাঁর নিজের বাসায় অবস্থান করতেন। চিকিৎসাও তিনি সিলেটেই করতেন। ফলে ঢাকায় তাঁকে আর দেখার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। মুকুল চৌধুরীর সাথে আমার শেষ দেখা সিলেটের একটি সাহিত্য সম্মেলনে। ১২ এপ্রিল, ২০১৯ তারিখ সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ চত্ত্বরে জালালাবাদ সাহিত্য ফোরাম আয়োজিত সাহিত্য সম্মেলনে যাই বিশেষ অতিথি হয়ে। প্রধান অতিথি বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ উপস্থিত না হওয়ায় উদ্যোক্তাগণ আমাকে সে সম্মেলনের প্রধান অতিথি ঘোষণা দেয়। এভাবেই শাহজালাল (রহ.) এর দরগাহ সংলগ্ন এ সািিহত্য সম্মেলনে আমি জালালি বরকত লাভ করি। সে অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য সিলেট যাওয়ার সময় প্রথমে হোটেল স্যুটে ও পরে সম্মেলনস্থলে তাঁর সাথে দেখা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য কবি মুকুল চৌধুরী নিজ জেলা সিলেটকে সব সময় ‘সিলেট শরীফ’ লিখে নিজের জন্মস্থানকে পুণ্যস্থানের মর্যাদা দিতেন। পরের বছর তাঁকে কিশোরগঞ্জ নিয়ে এসে সাহিত্য পুরস্কার দেয়ার কথা থাকলেও তিনি স্বাস্থ্যগত কারণে কিশোরগঞ্জ যেতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পারবর্তীতে ঢাকায় কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সেক্রেটারি বন্ধু লেখক, সাংবাদিক সেলিম আউয়ালকে একুশের বই মেলায় নজরুল মঞ্চে কবি মুকুল চৌধুরীকে ইতিপূর্বে ঘোষিত সিরাতুন্নবি সা. রৌপ্য পদক ও সনদ হস্তান্তর করি। তিনি ফোন করে এর প্রাপ্তি স্বীকার করেন এবং আমাদের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কবি বন্ধু মুকুল চৌধুরীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি নিবেদন করছি অতল শ্রদ্ধা। তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন আবহমানকাল।