আসিফ আরসালান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর ১৫ দিন অতিক্রান্ত হয়েছে। এখনো তার এ সফর নিয়ে প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। অবশ্য আলোচনা হবারই কথা। কারণ তার সফরের অন্তত ২০/২৫ দিন আগে থেকেই শিক্ষিত ও সচেতন মহলে তুমুল জল্পনা কল্পনা চলছিলো, প্রধানমন্ত্রী কি প্রথমে ভারত যাবেন নাকি চীন যাবেন? জল্পনা কল্পনার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো, ক্ষমতা গ্রহণের আগে থেকেই ভারত সরকার এবং ভারতের গণমাধ্যম বিএনপির প্রতি দুর্বলতা দেখাচ্ছিলো। বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তিকালের পর নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানের কাছে তার কাছে শোক বার্তা প্রেরণ করেন।

শুধু তাই নয়, তার জানাযার দিনে তারেক রহমান এবং তার পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য নরেন্দ্র মোদি তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করকে ঢাকা পাঠিয়েছিলেন। তখনো কিন্তু বিএনপি সরকার গঠন করেনি। এরপর যেদিন তারেক রহমান এবং তার মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে সেদিন তাদেরকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য নরেন্দ্র মোদি ভারতীয় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে ঢাকা পাঠান। ওম বিড়লা তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে ভারত সরকারের শুভেচ্ছা জানান এবং তার হাতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি সরকারি চিঠি হস্তান্তর করেন। এ চিঠিতে সপরিবারে ভারত সফর করার জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানান।

এর কিছুদিন পর চীন সফর করার জন্য চীন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সরকারিভাবে আমন্ত্রণ জানায়। তারপর আমন্ত্রণ জানায় মালয়েশিয়া। এমন পটভূমিতে জল্পনা-কল্পনা চলছিলো, প্রধানমন্ত্রী সর্বপ্রথম কোন দেশটি সফর করবেন? সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে প্রধানমন্ত্রী সর্বপ্রথম চীন সফরেরই সিদ্ধান্ত নেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ৪দিনের চীন সফরকালে ১৭টি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩টি এমওইউ বাংলাদেশ তো বটেই, ভারতেও ব্যাপক গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রনধীর জয়সোয়াল তো বলেই ফেলেছেন যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর এবং পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের ওপর ভারত গভীর দৃষ্টি রেখেছে। আসলেই দৃষ্টি রাখার কথা। কারণ ঐ ১৭টি এমওইউ এর মধ্যে এমন ৩টি এমওইউ রয়েছে যেগুলো বাংলাদেশের জন্য অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো, (১) বাংলাদেশ মিয়ানমার ও চীন অর্থনৈতিক করিডোর (বিসিএমসি) (২) চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের আধুনিকায়ন এবং মোংলা সমুদ্র বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং (৩) তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের কারিগরি সাহায্য ও অর্থায়ন।

১৭টি এজেন্ডার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো চীন মিয়ানমার বাংলাদেশ ইকোনোমিক করিডোর। খেয়াল করুন, চারদিনের সফরের শেষ দিনে চীনের গ্রেট হলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ টিম এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিং পিংয়ের নেতৃত্বে চীনের টিম আলোচনায় বসে। এ আলোচনায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং স্বয়ং এ ইকোনোমিক করিডোরের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। দেশে ফেরার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন যে, করিডোরের প্রস্তাবটি বাংলাদেশ পরীক্ষা করছে। এব্যাপারে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত কোনো অবস্থান গ্রহণ করেনি। ইংরেজি ভাষায় তিনি বলেছেন, Bangladesh has not yet taken any position. এখন দেশে-বিদেশে তুমুল জল্পনা-কল্পনা চলছে যে, শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ কি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিং পিংয়ের করিডোর প্রস্তাব গ্রহণ করবে? নাকি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে সময় ক্ষেপণ করবে?

প্রস্তাবিত করিডোরটি শুরু হবে চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে। অতঃপর সেটি মিয়ানমারের মান্দালয় হয়ে দু’টি ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। এক ভাগ চলে যাবে ইয়াঙ্গুনের (সাবেক নাম রেঙ্গুন) দিকে এবং অন্যভাগ যাবে রাখাইন রাজ্যের গভীর সমুদ্রবন্দর কায়াউফিউ ((Kyaukphyu) অভিমুখে। এ করিডোরের যে শাখাটি আরাকান বা রাখাইন রাজ্যের দিকে যাবে সেটি অতঃপর বাংলাদেশ অভিমুখে প্রলম্বিত হবে। বাংলাদেশে এ করিডোরটি চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার পর্যন্ত যাবে। এর ফলে চীন তার প্রাদেশিক রাজধানী কুনমিং থেকে স্থল পথে একেবারে চট্টগ্রাম এবং মোংলা বন্দর তথা বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করতে পারবে।

এমন একটি করিডোরের প্রস্তাব নতুন কিছু নয়। পৃথিবীর বহু দেশে এ ধরনের করিডোর রয়েছে। ইরান থেকে চীন পর্যন্ত যে করিডোর, তা বেশ দীর্ঘ এবং বিপজ্জনক। তা সত্ত্বেও চীন সেখানে কাজ করেছে। এমনকি আমাদের দক্ষিণ এশিয়াতে নেপালের মতো দুর্গম পাহাড়বেষ্টিত দেশে সুদূর তিব্বতের লাসা থেকে কাঠমান্ডু পর্যন্ত রেলসংযোগ গড়ে দিয়েছে চীন। এ রেলসংযোগের শেষ বাধাটা ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ, সেখানে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয় এবং নানারকমের অত্যন্ত কঠিন ও দুর্গম পর্বতমালার ভেতর দিয়ে এই রেলসংযোগ নিয়ে যেতে হয়েছে, যা এখন প্রায় শেষ হওয়ার পথে।

ভূরাজনীতিতে চীনের এ দূরদর্শিতার আরেকটি বড় উদাহরণ হলো ‘ওয়াখান করিডোর’। পাকিস্তানের সাথে তাজিকিস্তান আর আফগানিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা এ সরু ভূখন্ডটি আফগানিস্তানের সাথে চীনের একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। চীন একসময় অনেক ভয় পেত যে, এই করিডোর গড়া হলে আফগানিস্তান থেকে ইসলামী চরমপন্থীরা (তাদের ভাষায়) ঢুকে পড়বে। কিন্তু সে ভয় দূরীভূত হয়ে এখন আফগানিস্তানেরই চাপে ও উদ্যোগে চীন সেই রাস্তার মাধ্যমে সরাসরি ইরানে প্রবেশ করতে পারে। এটি হবে অন্যতম সংক্ষিপ্ত রুট যা ইরান থেকে সরাসরি বন্দর আব্বাসে যাওয়ার পথ সুগম করবে। এ যে ভূরাজনৈতিক দূরদর্শী চিন্তা, এগুলো আগে কেউ ভাবতেও পারতো না।

সাম্প্রতিককালে এ ধরনের অন্যতম বৃহৎ করিডোর বা অবকাঠামো হলো, পাক চীন ইকোনোমিক করিডোর বা সিপিইসি । প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোরটি। এটি চীনের বিল্ট অ্যান্ড রোড ইনেশিয়েটিভেরই (বিআরআই) একটি অংশ। করিডোরটি নির্মাণ করতে ব্যয় হয়েছে ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রথমে হিসাব করা হয়েছিলো যে, এ করিডোরটি নির্মাণ করতে ৪৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে। কিন্তু যখন এই বৃহৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলো তখন দেখা গেলো যে, মোট খরচ পড়েছে ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

পাক চীন ইকোনোমিক করিডোর টি শুরু হয়েছে চীনের শিনজিয়াং এর উইঘুরের কাশগর থেকে। অতঃপর এ মেগা প্রকল্পটি চীন পাকিস্তান সীমান্তের খুঞ্জেরাব গিরিপথ হয়ে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত গিলগিটের মধ্য দিয়ে মানসেরা, ইসলামাবাদ, লাহোর, ফয়সালাবাদ, মুলতান, সুক্কুর ও কোয়েটা হয়ে অবশেষে আরব সাগরের গোয়াদর সমুদ্র বন্দরে গিয়ে শেষ হয়েছে। পাক-চীনের এ বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের তীব্র বিরোধিতা করেছে ভারত। তারা বলেছে যে, গিলগিট এবং বাল্টিস্তান বিরোধপূর্ণ কাশ্মীরের অংশ, যেটি পাকিস্তান জোর করে দখলে রেখেছে। পাকিস্তান ও চীন ভারতের কোনো ওজর আপত্তি শোনেনি। তারা এ বিশাল অবকাঠামোটি নির্মাণ করেই ছেড়েছে।

বাংলাদেশের প্রায় সকল শ্রেণির মানুষ মনে করেন যে, বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার কারণে পাক চীন মিয়ানমার ইকোনোমিক করিডোর প্রস্তাবটি বাংলাদেশের পক্ষে শুধুমাত্র গ্রহণ করাই উচিত নয়, বরং যত দ্রুত সম্ভব তার নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া উচিত। ১৭শত কিলোমিটার দীর্ঘ এ করিডোরটি নির্মিত হলে চীনের সাথে বাংলাদেশের সড়কপথে দূরত্ব হবে সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার ড্রাইভ। আমি পাকিস্তানের কারাকোরাম হাইওয়ে দেখেছি। ঐ রাস্তাটি এত মসৃণ যে, প্রায় সমস্ত গাড়িই সেখানে ১২০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার বেগে চলে। বাংলাদেশÑচীন করিডোরটিও ঐ রকমই মসৃণ হবে।

বাংলাদেশের একশ্রেণির গণমাধ্যম শঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, শেষ পর্যন্ত এ প্রকল্পটি কি বাস্তবে রূপ লাভ করবে? কারণটি হলো রাজনৈতিক ও স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত। তারেক রহমানের সরকার মুখে বলছে যে, তারা ভূরাজনীতিতে কোনো পক্ষ অবলম্বন করবে না। তারা সকলের সাথে বন্ধুত্ব এবং কারো সাথে শত্রুতা নয়- এ নীতি অনুসরণ করবে। এ উক্তিটি ইতিহাস বিশ্রুত মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের। ১৮৬৫ সালে একটি ভাষণে তিনি এ বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন। তারপর ১৬১ বছর পার হয়ে গেছে। ভূমন্ডলীয় রাজনীতির সমীকরণে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। আগে ছিলো দ্বিদলীয় পৃথিবী। অর্থাৎ দুই পরাশক্তি। একদিকে আমেরিকা। অন্যদিকে সোভিয়েট ইউনিয়ন। সোভিয়েট ইউনিয়ন ভেঙে ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। সেটাও ৩৫ বছর আগে। এখন সোভিয়েট ইউনিয়নের উত্তরসূরি রাশিয়া আর পরাশক্তি নয়। বিগত ৩০ বছরে প্রবল উত্থান ঘটেছে গণচীনের।

অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রযুক্তিগতভাবে চীন এখন রাশিয়াকেও পিছু ফেলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পরাশক্তি হিসাবে উত্থিত হয়েছে। তারপরেও অর্থনীতির ক্ষেত্রে তার স্থান দ্বিতীয় হলেও আমেরিকার সাথে ফারাক অনেক। আমেরিকার অর্থনীতির আয়তন হলো ৩১ ট্রিলিয়ন ডলার। পক্ষান্তরে চীনের অর্থনীতির আকার হলো ২২ ট্রিলিয়ন ডলার। তারপরেও ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলকর হলো চীন। কারণ আমেরিকা থেকে বাংলাদেশের দূরত্ব ১২ হাজার ৯২০ কিলোমিটার বা ৮০৩০ মাইল।

দ্বিতীয়ত স্থলপথে বাংলাদেশের তিনদিকে এবং পানিপথের একটি অংশে ভারতের অবস্থান হওয়ায় আপাতদৃষ্টে বাংলাদেশ ভারতের কব্জায়। ভারতের ৫৫ বছরের ইতিহাস বাংলাদেশের ওপর প্রভূত্ব স্থাপনের ইতিহাস। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে ভারতের গোলামীর জিঞ্জির ছিন্ন করা সম্ভব হলেও সেটিকে এখনো স্থায়ী ভিত্তি দেওয়া সম্ভব হয়নি। জুলাই বিপ্লবের মতো এতবড় পরিবর্তনের পরেও ভারতের মানসিকতায় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পরেও ভারত তাকে সেখানে রেখে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, তিনি সেখান থেকে এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমসসহ ভারতের সমস্ত গণমাধ্যমে বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর তাজ্জবের বিষয় হলো, ভারত সেটি অ্যালাও করছে। অথচ তারাই বলে যে, বাংলাদেশের মাটি যেন ভারতবিরোধী তৎপরতায় ব্যবহৃত না হয়। তাহলে কি আমরাও দাবি করতে পারি না যে, ভারতের মাটি যেন বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতায় ব্যবহৃত না হয়।

বাংলাÑচীন ইকোনোমিক করিডোর বাংলাদেশের শুধুমাত্র অর্থনীতির জন্যই বুস্টার হবে না, বরং নিরাপত্তার জন্যও একটি ঢাল হিসাবে কাজ করবে। তারেক রহমানের সরকারে ২ জন মার্কিনপন্থী আছেন। এরা হলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং সদ্য নিযুক্ত জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান। আমেরিকা যেন এ ইকোনোমিক করিডোরে প্রবল বাধা হয়ে না দাঁড়ায় সেটি নিশ্চিত করতে হবে এ সরকারকে। তবে বলতেই হবে, বাংলাÑচীন করিডোর প্রশ্নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিএনপি সরকারের সম্মুখে এক বিরাট অগ্নিপরীক্ষা বা লিটমাস টেস্ট (Litmus Test).

Email: [email protected]