আ.জ.ম রুহুল আমিন
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ ও খ্যাতিমান সিনিয়র আইনজীবী এবং ‘ইসলামাইজেশন অব ল’ বা আইনের ইসলামীকরণের স্বপ্নদ্রষ্টা এডভোকেট মাওলানা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম (রহ:) এর ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী আগামী ১৫ জুলাই, ২০২৬। ২০২১ সালের এই দিনে আইনি অঙ্গনের এ উজ্জ্বল নক্ষত্র ৮১ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। তার ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আইনি মহল ও তাঁর শুভাকাক্সক্ষীদের পক্ষ থেকে মরহুমের বিদেহী রুহের মাগফিরাত কামনায় এবং এ দেশের বিচার ব্যবস্থায় তাঁর ঐতিহাসিক অবদানসমূহ স্মরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
আইনি দর্শনের রূপকার ও প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য: এডভোকেট মাওলানা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম (রহ:) কেবল একজন সফল আইনজীবীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এ দেশে আইনের ইসলামীকরণের অন্যতম প্রধান কারিগর। তাঁর মূল দর্শন ছিল এ দেশের বিদ্যমান আইনগুলোকে ইসলামের চিরকল্যাণকর নীতির সাথে সংগতিপূর্ণ করা। এ লক্ষ্যে আইনবিদদের মধ্যে ঐক্য প্রচেষ্টার তার ভূমিকা ছিল অনন্য। ইসলামী মনোভাবসম্পন্ন ও অন্যান্য আইন বিশেষজ্ঞদেরকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইসলামিক ল’ ইয়ার্স কাউন্সিল এবং বাংলাদেশ ইসলামিক ল’ রিসার্চ এন্ড লিগ্যাল এইড সেন্টার। তিনি ‘ইসলামিক ল’ ইয়ার্স কাউন্সিল’-এর সভাপতি ছিলেন এবং “বাংলাদেশ ইসলামিক ল’ রিসার্চ এন্ড লিগ্যাল এইড সেন্টার” এর আমৃত্যু প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন।
বিচার বিভাগে ঐতিহাসিক অবদান ও যুগান্তকারী মামলাসমূহ: আদালত প্রাঙ্গণে তাঁর মেধা ও সাহসিকতা ছিল ঈর্ষণীয়। তিনি মজলুমের কণ্ঠস্বর হিসেবে এবং ইসলামের সৌন্দর্য রক্ষার লড়াইয়ে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তাঁর আইনি জীবনের উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:
ফাতওয়া সংক্রান্ত মামলা: ফাতওয়া নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে তাঁর বলিষ্ঠ আইনি লড়াইয়ের ফলে আদালত ফাতওয়া সম্পর্কে একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ রায় প্রদান করে।
তালাকপ্রাপ্তা নারীর অধিকার: ‘হেফজুর রহমান কেস’-এ তালাকপ্রাপ্তা নারীর খোরপোষের অধিকার আদায়ে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা আইনি ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে।
ইউনিফাইড ম্যারেজ অ্যাক্ট: এ দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোর পরিপন্থী ‘ইউনিফাইড ম্যারেজ অ্যাক্ট-এর বিরুদ্ধে তিনি জোরালো আইনি অবস্থান গ্রহণ করেন।
পেশাদারিত্ব ও আইনি নেতৃত্ব: সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে বিচারিক মহলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত। তিনি বিচারপতি আব্দুর রউফ, বিচারপতি মোস্তফা কামাল এবং বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছেরের মতো বরেণ্য আইনবিদদের সাথে বিভিন্ন সময়ে ইসলামী আইন ও বিচার ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেছেন। এছাড়াও তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নির্যাতিত নেতাদের পক্ষে অন্যতম প্রধান আইনজীবী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন।
ইসলামী ব্যাংকিং ও বিশ্ব বরেণ্য স্কলারদের সাথে সম্পর্ক: বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রবর্তনে তিনি অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর সূচনালগ্নে আইনি কাঠামো তৈরিতে তিনি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন। তিনি আমৃত্যু এ ব্যাংকের লিগ্যাল এডভাইজারের ভুমিকা পালন করেন এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন, ইসলামী ব্যাংকিং ও শরিয়াহ আইন-সংক্রান্ত বিধি-বিধান প্রণয়নে অনন্য অবদান রাখেন।
পেশাগত জীবনে তিনি আল্লামা তাকী উসমানী (পাকিস্তান), সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (ভারত), ড. ইউসুফ আল-কারযাভী (কাতার), ড. হাশিম কামালী (মালয়েশিয়া) এবং বাংলাদেশে সৌদী দূতাবাসের প্রথম রাষ্ট্রদুত শেখ ফুয়াদ আব্দুল হামিদ আল খতিব এর মতো বিশ্ববরেণ্য ইসলামী স্কলারদের সাথে মতবিনিময় করেছেন।
সংক্ষিপ্ত জীবনচিত্র: জনাব নজরুল ইসলাম (রহ:) ১৯৪০ সালে সিরাজগঞ্জের চৌহালীতে জন্ম গ্রহণ করেন । মাদরাসা শিক্ষার পাশাপাশি তিনি ইরেজি কারিকুলামেও লেখাপড়া করেন। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক ডিগ্রি নেন। ১৯৬০এর দশকে এডওয়ার্ড কলেজে নির্বাচিত ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ও আইন শাস্ত্রে (LLB) উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৬ সালে পাবনায় আইন পেশা শুরু করেন। এরপর স্বাধীনতার পর নারায়ণগঞ্জে চলে আসেন। অত:পর হাইকোর্টে আইন চর্চা শুরু করেন। ছাত্রজীবনে ইসলাম এবং আজীবন সত্য ও ন্যায়ের পথে লড়াই করতে গিয়ে একাধিকবার জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
আইনি পেশার পাশাপাশি তিনি ইবনে সিনা ট্রাস্ট, তামীরুল মিল্লাত ট্রাস্ট, ইসলামিক সোসাইটি অব নারায়ণগঞ্জের অধীনে নারায়ণগঞ্জে আদর্শ স্কুল ও আদর্শ বালিকা মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন এবং বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড (BPL) এর চেয়ারম্যান ছিলেন, দারুল ইহসান ট্রাস্ট, পাবনা এর ট্রাষ্টি ও দারুল ইসলাম ট্রাষ্ট-এর সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের অন্যতম সফল উদ্যোক্তা ছিলেন।
ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠার অনন্য মূর্তপ্রতিক: এডভোকেট মাওলানা নজরুল ইসলাম (রহ.) আজীবন একজন নিবেদিত দাঈ ইলাল্লাহর দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে ইসলামপন্থীদের মধ্যে ঐক্য প্রয়াসে আজীবন সদা সচেষ্ট ছিলেন। বৃহত্তর ঐক্যের দাওয়াত নিয়ে তিনি হাজির হয়েছেন দেশের স্বনামধন্য কওমি ও আলিয়া মাদরাসায়, পীর-মাশায়েখগণের দরবারে; বিশেষ করে ছারছীনা, চরমোনাই, ফুরফুরা দরবারসহ হাটহাজারী মাদরাসার ওলামায়ে কেরামদের সাথে মতবিনিময় করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি দেশবিখ্যাত আলেম জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা ওবায়দুল হক (রহ.), শায়খুল হাদীস আল্লামা এ.কে.এম. ইউসুফ (রহ.), মুফতি আহমদ শফী (রহ.), শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক (রহ.), মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস (রহ.), মাওলানা মোহাম্মদ আলী (রহ.), মুফতি ফজলুল হক আমিনী (রহ.), মাসিক মদিনার সম্পাদক মাওলানা মুহীউদ্দীন খান (রহ.), মাওলানা কামাল উদ্দিন জাফরী, বায়তুশ শরফের পীর মাওলানা আব্দুল জব্বার (রহ:), সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা আবদুস সুবহান (রহ.) ও সাবেক সংসদ সদস্য বিশিষ্ট মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রহ:) প্রমুখের সাথে ইত্তেহাদুল উম্মাহর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি ও সভা সমাবেশে অংশ নিয়েছেন।
মরহুম এডভোকেট মাওলানা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম রাজনৈতিক জীবনে দীর্ঘদিন নারায়ণগঞ্জ জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও মজলিসে শূরার সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৭০, ১৯৮৬, ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও রাজনৈতিক কারণে তিনি ১৯৮৫, ১৯৮৮ এবং ২০১৩ সালে কারাবরণ করেন। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নির্যাতিত নেতাদের পক্ষে অন্যতম আইনজীবী হিসেবে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন।
পরিশেষে দ্বীনের এই নিবেদিত খাদেমের জন্য সকলের নিকট দোয়ার আরজি পেশ করছি মহান আল্লাহ তায়ালা যেন তাঁর সকল কর্ম ও উদ্যোগকে কবুল করে তাঁকে মাগফিরাত নসিব করেন এবং জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করেন (আমিন)।
লেখক : জয়েন্ট সেক্রেটারি, ইসলামিক সোসাইটি অব নারায়নগঞ্জ ।