জাফর আহমাদ

“আল কিবর” মানে অহংকার ও “আল হাসাদ” মানে হিংসা। মু’মিন জীবনের অত্যন্ত ঘৃণিত ও ধ্বংসকর দু’টি চরিত্র। যা মানুষকে অনিবার্য ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

আল কিবর বা অহংকার : অহংকার পৃথিবীর প্রথম গুনাহ্। আর এটি প্রথম সংঘটিত হয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট কীট ইবলিশ কর্তৃক। অহংকারের মাধ্যমেই শয়তান সর্বপ্রথম গুনাহর খাতায় নাম লিখিয়েছিল এবং এটিই সর্বপ্রথম আল্লাহর হুকুমকে মানতে অবাধ্য করেছিল। সুরা বাকারায় আল্লাহ তা’আলা বলেন: “আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছিলাম: আদমকে সেজদা কর। সকলেই সেজদা করলো। কেবল ইবলিশ করলো না। সে অস্বীকার ও অহংকার করলো। সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।” সুরা আরাফে বলা হয়েছে: ইবলিশ বললো “আমি তার চেয়ে উত্তম, আপনি আমাকে আগুন থেকে এবং তাকে (আদমকে) মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” অর্থাৎ তার মধ্যে বর্ণবাদের অহংকার ও বিদ্বেষ দাঁনা বেঁধে উঠেছিল। ফলে সে-ই পৃথিবীর প্রথম নিকৃষ্ট কীট, যে আল্লাহর আদেশকে অমান্য করলো এবং তাঁর লানত নিয়ে কিয়ামত তক্ তাকে বেঁচে থাকতে হবে। যুগে যুগে এ তাগুতের অনুসারীরাই অহংকারী ছিল। এদের কেউ কেউ ক্ষমতার দাপটে, কেউ বা আবার ধন-দৌলতের আধিক্যে অহংকারী ছিল। এদের মধ্যে ফিরাউন ও কারুন অন্যতম। আল্লাহ তা’আলা এ সব অহংকারীদের ধ্বংস করে দেন। এ ছাড়াও আল কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী ধ্বংসের কারণসমূহের মধ্যে অহংকার একটি অন্যতম কারণ ছিল। আল্লাহ তা’আলা বলেন: “কত জনপদ আমি ধ্বংস করে দিয়েছি। তাদের ওপর আমার আযাব অকস্মাত ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রাতের বেলায় অথবা দিনের বেলা যখন তারা বিশ্রামরত ছিল। আর যখন আমার আযাব তাদের ওপর আপতিত হয়েছিল তখন তাদের মুখে এ ছাড়া আর কোন কথাই ছিল না যে, ‘সত্যিই আমরা জালেম ছিলাম’।’ (সুরা আল আরাফ ৪-৫) এখানে জালেম মানে অহংকারী ছিল।

কুরআন ও হাদীসের অসংখ্য জায়গায় গর্ব-অহংকারের ভয়াবহ পরিণাম ও পরিণতির কথা বিবৃত হয়েছে এবং অত্যন্ত কঠিন ভাষায় হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। ইমাম আয্যাহাবী (র:) তাঁর ‘কিতাবুল কাবায়িরতে এটিকে কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অহংকার শুধুমাত্র একটি কবীরা গুনাহই নয় বরং এটি আরো অনেক কবীরা গুনাহের জন্মদাতা। কারণ এটি মানুষকে সত্য উপলব্ধিতে বাধা দেয় এবং তাদেরকে অন্ধকারের যাত্রী বানায়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: “এক ইলাহই তোমাদের আল্লাহ। কিন্তু যারা আখেরাত মানে না তাদের অন্তর সত্য বিমুখ এবং তারা অহংকারে ডুবে গেছে।” (সুরা নাহল : ২২) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন: “কোন প্রকার অধিকার ছাড়াই যারা পৃথিবীতে অহংকার করে বেড়ায়, শীঘ্রই আমার নিদর্শনসমূহ থেকে আমি তাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেবো। তারা আমার কোন নিদর্শন দেখলেও তার প্রতি ঈমান আনবে না। তাদের সামনে যদি সোজা পথ এসে যায় তাহলেও তারা তা গ্রহণ করবে না। আর যদি বাঁকা পথ দেখতে পায় তাহলে তার ওপর চলতে আরম্ভ করবে।” (সুরা আ’রাফ : ১৪৬)

অহংকার মানে নিজেকে আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শ্রেষ্ট জ্ঞান করা, অন্যদেরকে নিজের তুলনা ক্ষুুদ্র ও অধম জ্ঞান করত: তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধে ঔদ্যত প্রকাশ করে তাঁর অবাধ্য হওয়া ও আদেশ অমান্য করা-এ সবই অহংকারের লক্ষণ ও তার আওতাভুক্ত। (কবীরা গুনাহ-ইমাম আয্যাহাবী র:) অহংকার গোপন ও প্রকাশ্য দুই ধরনের হয়ে থাকে। গোপণ অহংকার মনে সৃষ্টি হয় আর প্রকাশ্য অহংকার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা প্রকাশ পায়। গোপন অহংকারী নিজেকে অন্য সব অহংকারীর চেয়েও নিজেকে বড় মনে করে। এটা তার ধারণায় বদ্বমুল হয়, অবশেষে এটি তার বিশ্বাসে পরিণত হয়। ফলে নিজেকে খুব সম্মানিত মনে করে এবং এক সময় তা তার বাস্তব চরিত্রে প্রকাশ পেতে শুরু করে। গোপণ অহংকার সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন: “প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, তাদের কাছে আসা যুক্তি প্রমাণ ছাড়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের ব্যাপারে ঝগড়া করছে তাদের অন্তর অহংকারে ভরা। কিন্তু তারা যে বড়ত্বের অহংকার করে তারা তার ধারেও ঘেঁষতে পারবে না।” (সুরা মুমিন : ৫৬) এদের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন: “এভাবে আল্লাহ প্রত্যেক অহংকারী ও স্বেচ্ছাচারীর অন্তরে মোহর লাগিয়ে দেন।” (সুরা মুমিন : ৩৫) প্রকাশ্য অহংকারের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা বলেন: “অহংকার বশত: তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং যমীনে গর্বসহকারে পদচারণা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন অহংকারীকে পছন্দ করেন না। চাল-চলনে মধ্যম পন্থা অবলম্বন কর এবং কণ্ঠস্বর নীচু কর।” (সুরা লোকমান : ১৮-১৯) “পৃথিবীতে দাম্ভিকতা সহকারে চলো না। নিশ্চয়ই তুমি পদঘাতে ভূপৃষ্ঠ বিদির্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় পর্বত প্রমাণ হতে পারবে না। এ সবের মধ্যে যেগুলো মন্দ কাজ, সেগুলো তোমার রবের কাছে অপছন্দনীয়।” (বণী ইসরাঈল : ৩৭-৩৮)

অহংকারীর শাস্তি সম্পর্কে উল্লেখিত আয়াত ছাড়াও আরো একাধিক আয়াতে কঠিন বর্ণনা রয়েছে। অহংকারী সম্পর্কে রাসুলের (স:) অসংখ্য হাদীসও রয়েছে। রাসুল (স:) বলেছেন: “অহংকারী স্বৈরাচারীদেরকে কিয়ামতের দিন ক্ষুদ্র কণার আকৃতিতে ওঠানো হবে। লোকেরা তাদেরকে পায়ের তলায় পিষ্ট করবে এবং চারদিক থেকে তাদের ওপর কেবল লাঞ্ছনা ও অপমানই আসতে থাকবে। তাদেরকে জাহান্নামের বোলাস নামক কারাগারে নিয়ে যাওয়া হবে। তাদের মাথার ওপর আগুন জ্বলতে থাকবে এবং তাদেরকে জাহান্নামবাসীর মলমুত্র, ঘাম, কাশি ইত্যাদি খেতে দেয়া হবে।” (সুনানে নাসায়ী, জামে আত তিরমিযি) রাসুল (স:) আরো বলেন : “যার অন্তরে কণা পরিমাণও অহংকার আছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সহীহ মুসলিম)

আল হাসাদ বা হিংসা : রাগ-ক্রোধ, হিংসা-বিদ্বেষ মন-মননকে কুলষিত করে, চরিত্রকে করে কালিমাযুক্ত, শরীর অসুস্থ হয়। মানুষ যদি নিজেদেরকে এগুলো থেকে মুক্ত করতে পারে তাহলে সে নিজেই বেশী উপকৃত হবে। অন্তর হিংসার কঠিন ভার থেকে মুক্ত হবে। দেহ-মন সুস্থ থাকবে। সার্বিক প্রশান্তি লাভ করবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে বিশেষ তাগিদ প্রদান করেছেন এবং একটি দু’আও শিক্ষা দিয়েছেন। কারো প্রতি রাগ সৃষ্টি হলে বা কারো প্রতি বিদ্বেষ দানা বেধে উঠলে এই দু’আ পড়তে হবে, “আল্লাহুম্মা ইন্নি ক্বাদ তাসাদ্দাকতু বি’ইরদী আ’লা ইবাদিকা।” অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আমার মর্যাদা-সম্মান আপনার বান্দাগণের জন্য দান করলাম।”

আনাস (রা:) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা কি আবু দামদামের মতো হতে পারো না? সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, আবু দামদাম কে? তিনি বলেন, তোমাদের পূর্বের যুগের একজন মানুষ। তিনি প্রতিদিন সকালে (উপরের দু’আটি) বাক্যটি বলতেন। অন্য বর্ণনায়, “তিনি বলতেন, আমাকে যে গালি দেয় আমি আমার সম্মান তাকে দান করলাম।” হাদীসটির সনদ সহীহ। (আবু দাউদ, কিতাবুল আদাব, বাব মা জাআ ফির রাজুলি)

চলুন, আমরা সকলেই আবু দামদামের মতো হওয়ার চেষ্টা করি। যারা আমাদের গীবত করেছেন, নিন্দা করছেন, গালি দিচ্ছেন অথবা মারাত্মক কষ্ট দিয়েছে, তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিবো এবং তাদের প্রতি কোন হিংসা লালন করবো না। কি লাভ এগুলো হৃদয়ে লালন করে? বরং লাভের পরিবর্তে এগুলো আপনার আমার দেহ-মনকে ভারাক্রান্ত করে তুলে। বাংলা সাহিত্যের একজন পরিশীলিত সাহিত্যিক ও কবি বলেছেন, “ভুলে যাওয়াটাও আল্লাহর এক বিশেষ রহমত।” তিনি বলেছেন, প্রতিদিন আমরা নানা প্রকৃতির লোকের সাথে যোগাযোগ করে থাকি। এদের অনেকে মনে কষ্ট দেয়, গালি দেয়, কটু কথা বলে, দূর্ব্যবহার করে এগুলো যদি মানুষ নিজের মধ্যে জমা করে রাখতো তাহলে আমাদের প্রাত্যহিক জীবন ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়তো। সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কিন্তু এগুলো আমরা ভুলে যাই বলে সমাজ ও সভ্যতা এখনোও টিকে আছে। অন্যথায় সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতো। আমরা হিংসা-বিদ্বেষ করবো না এবং হিংসুকের হিংসার ক্ষতি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে যেতে থাকবো। সুরা ফালাকের শেষ আয়াতে হাসিদের হাসাদের ক্ষতি থেকে আল্লাহর আশ্রয়ের কথা বলা হয়েছে।

লেখক : ব্যাংকার এবং প্রাবন্ধিক।