সরদার ফরিদ আহমদ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট এখন আস্থার। এই আস্থাহীনতা শুধু সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে নয়। জনগণের সঙ্গেও। কারণ মানুষ দেখছে, নির্বাচনের আগে এক কথা বলা হচ্ছে। ক্ষমতায় গিয়ে আরেক কাজ করা হচ্ছে। বিএনপির বর্তমান অবস্থান সেই প্রশ্নকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। দলটি নির্বাচনের আগে ৩১ দফা দিয়েছিল। সেখানে প্রথম দফাতেই ছিল সংবিধান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি। শুধু সংশোধন নয়। স্পষ্ট ভাষায় ‘সংবিধান সংস্কার কমিশন’ গঠনের কথা বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ আমলে আনা ‘অগণতান্ত্রিক’ সংশোধনীগুলো পর্যালোচনা করে বাতিল বা সংশোধন করা হবে। গণভোট ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার কথাও ছিল।

নির্বাচনি ইশতেহারেও একই প্রতিশ্রুতি। সেখানে বলা হয়েছিল, রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে ৩১ দফার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার করা হবে।

কিন্তু এখন কী হচ্ছে? সরকার সংবিধান সংস্কার কমিশন বা পরিষদ গঠনের পথে হাঁটছে না। বরং সংসদে ‘সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এখানেই তৈরি হয়েছে মূল বিতর্ক। কারণ ‘সংস্কার’ আর ‘সংশোধন’ এক জিনিস নয়। সংশোধন মানে বিদ্যমান কাঠামোর কিছু ধারা পাল্টানো।

সংস্কার মানে কাঠামোগত পুনর্বিবেচনা। সংশোধন সীমিত। সংস্কার মৌলিক। সংশোধন সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতায় হয়। সংস্কার জনগণের অংশগ্রহণে হয়।

এই মৌলিক পার্থক্যটিই এখন বিরোধী শিবির সামনে আনছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী। তারা বলছে, সরকার যে কমিটি করতে চায়, সেটি মূলত একটি ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতার কমিটি’। যেখানে বিএনপি তাদের দুই-তৃতীয়াংশ শক্তি ব্যবহার করে নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নেবে। বিরোধী দল সেখানে কেবল অলংকার হবে। এই আশঙ্কা পুরোপুরি অমূলক নয়। কারণ সংসদে ইতোমধ্যে দেখা গেছে, সরকার একের পর এক সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নিচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা কিছু অধ্যাদেশের অনুমোদনের উদ্যোগ দেখা গেছে। অথচ ৩১ দফায় যে ‘অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র’র প্রতিশ্রুতি ছিল, তার প্রতিফলন খুব কম।

এখন প্রশ্ন হলো-বিএনপি কেন পিছিয়ে যাচ্ছে? কারণ সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন মানে একটি বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করা। সেখানে নাগরিক সমাজ থাকবে। বিশেষজ্ঞ থাকবে। বিচারপতি থাকবে। রাজনৈতিক দল থাকবে। জনমত থাকবে। গণভোটের প্রশ্নও সামনে আসবে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন দলের একক নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে। অন্যদিকে সংসদীয় বিশেষ কমিটি অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই শেষ কথা বলবে।

এখানেই বিরোধীদের আপত্তি। জামায়াতের নেতারা প্রকাশ্যেই বলছেন, সরকার ‘সংস্কার’ নয়, ‘সংশোধন’ চায়। কারণ সংশোধনের মাধ্যমে সরকার নিজের সুবিধামতো পরিবর্তন করতে পারবে। কিন্তু সংস্কার পরিষদ গঠন করলে পুরো সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্ব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচনব্যবস্থা-সবই আলোচনায় আসবে।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা.শফিকুর রহমান সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, এ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তাদের ধারণাগত পার্থক্য আছে। বিষয়টি নিয়ে তাদের আগে থেকেই মতপার্থক্য ছিল, এখনো আছে। তারা সংবিধানের সংস্কার চাইলেও সরকার সংশোধনের কথা বলছে। এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি কেবল রাজনৈতিক আপত্তি নয়। এটি পদ্ধতিগত আপত্তি। বিরোধী দলের ভেতরে এখন দুটি প্রশ্ন কাজ করছে। প্রথম প্রশ্ন-সরকার কি সত্যিই সংস্কার চায়? দ্বিতীয় প্রশ্ন-বিরোধীরা কমিটিতে গেলে সেটি কি সরকারের জন্য বৈধতা তৈরি করবে? এই দ্বিধা থেকেই এখনো তারা নাম দেয়নি।

আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংবিধান বারবার ক্ষমতার হাতিয়ার হয়েছে। একদলীয় শাসন এসেছে। পরে বহুদলীয় গণতন্ত্র এসেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছে, আবার বাতিলও হয়েছে। অর্থাৎ সংবিধানকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যের ভিত্তিতে ব্যবহার করা হয়েছে। এই কারণেই এখন ‘সংস্কার’ শব্দটির গুরুত্ব এত বেশি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট কেবল ধারার সংকট নয়; এটি আস্থার সংকট। সংবিধান তখনই কার্যকর হয়, যখন সব পক্ষ মনে করে এটি তাদেরও দলিল। কিন্তু যদি বিরোধী দল মনে করে সংবিধান কেবল সরকারের ইচ্ছাপত্র, তাহলে সেই সংবিধান দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে পারে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক অতীতে বলেছেন, বাংলাদেশে সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নটি এখন ‘ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ’ ও ‘প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য’র প্রশ্নে এসে দাঁড়িয়েছে। সংসদ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য না ফিরলে শুধু কিছু ধারা বদলিয়ে লাভ হবে না। সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞরাও বহুবার বলেছেন, গণভোট ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়ার ফলে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের পথ সংকুচিত হয়েছে। বিএনপি নিজেই যখন গণভোট পুনর্বহালের কথা বলেছিল, তখন সেটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। বিএনপি এখন গণভোটের ফলাফল মানতে চাচ্ছে না। বিএনপির নিজের অবস্থান থেকে সরে আসা জনগণের কাছে প্রশ্ন তৈরি করবেই।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বিএনপি এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তাদের অতীত বক্তব্যই তাদের বিপদে ফেলছে। কারণ ৩১ দফা ছিল শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়। সেটি ছিল একটি নৈতিক অঙ্গীকার। জনগণ সেই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই তাদের ভোট দিয়েছে। এখন যদি দলটি বলে-সংস্কার কমিশনের প্রয়োজন নেই, অথবা বিষয়টি এড়িয়ে যায়-তাহলে জনগণ সেটিকে প্রতারণা হিসেবেই দেখবে।

এখানে আরও একটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। সরকার গণভোটের ফল আদালতে নিয়ে গেছে। এর মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক প্রশ্নকে বিচারিক প্রশ্নে রূপান্তর করা হয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্রে সব প্রশ্ন আদালত দিয়ে সমাধান হয় না। কিছু প্রশ্ন রাজনৈতিকভাবেও মোকাবিলা করতে হয়। বিশেষ করে যখন দাবি ওঠে যে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ একটি নির্দিষ্ট মত দিয়েছে, তখন সেটিকে কেবল আইনি কারিগরিতে আটকে রাখা বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ এতে মানুষের মনে এই ধারণা জন্মায়-জনমত নয়, ক্ষমতাই শেষ কথা।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই প্রবণতা নতুন নয়। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগও অতীতে একই অভিযোগের মুখে পড়েছে। এখন বিএনপি সেই একই পথে হাঁটলে পার্থক্য কোথায় থাকবে? এই জায়গাতেই বিরোধী শিবির রাজনৈতিক সুযোগ দেখছে। জামায়াত খুব সচেতনভাবেই ‘সংস্কার বনাম সংশোধন’ বিতর্ক সামনে আনছে। তারা বুঝতে পারছে, এটি শুধু সাংবিধানিক বিতর্ক নয়; এটি নৈতিকতার বিতর্ক। এখানে সরকারকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগে চাপে ফেলা সম্ভব।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সমাধান কোথায়? প্রথমত, সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে-তারা কি সত্যিই ৩১ দফার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চায়? যদি চায়, তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ বা কমিশন গঠনের রোডম্যাপ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, এই প্রক্রিয়াকে সংসদের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। নাগরিক সমাজ, আইনজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন-সব পক্ষকে যুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, গণভোট প্রশ্নে দ্বৈত অবস্থান বন্ধ করতে হবে। জনগণের মতামতকে সম্মান না করলে গণতন্ত্রের ভাষণ অর্থহীন হয়ে যায়। চতুর্থত, সাংবিধানিক সংস্কারকে দলীয় স্বার্থের বাইরে নিতে হবে। কারণ সংবিধান কোনো দলের নয়। রাষ্ট্রের।

বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এখানে ভুল সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের সংকট আরও গভীর করতে পারে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধান পাল্টানো সহজ, কিন্তু জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন।

বিএনপি যদি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বলে থাকে, তাহলে তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিজেদের প্রতিশ্রুতির প্রতি সৎ থাকা। কারণ মানুষ এখন শুধু পরিবর্তনের ভাষণ শুনতে চায় না। মানুষ পরিবর্তনের প্রমাণ দেখতে চায়।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।