॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
গত প্রায় দু’দশকে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থব্যবস্থা স্বল্প আয়ের মানুষদের আয়-নির্ভর হয়ে পড়েছে। বিপুল অর্থের মালিকদের বড় অংশই হয় ঋণখেলাপি নয়তো টাকা পাচারকারী। এদের ভূমিকা প্রবল নেতিবাচক অবস্থা সৃষ্টি করে রেখেছে। অন্যদিকে দেশের আর্থিক ব্যবস্থা চাঙা রেখেছেন মূলত প্রবাসী কর্মী, গার্মেন্টস কর্মী এবং কৃষক-চাষিরা। তাদের এই অবদান জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবস্থান হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
হিসাব নিয়ে দেখা যায়, বিগত সময়ে বিদেশে পাচারকৃত টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এই পরিমাণ টাকা পাচারকারী ব্যক্তির সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ কোটি টাকা। ক্ষুদ্র-বৃহৎ মিলিয়ে এই ঋণখেলাপি মানুষের সংখ্যা পৌনে ৭ লাখের বেশি। অপরপক্ষে ৫০ লাখের বেশি গার্মেন্টস কর্মীর মাধ্যমে উৎপাদিত ৪ লাখ ছিয়াত্তর হাজার কোটি টাকা মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করা হয়। ১ কোটি ২০ লাখ প্রবাসী কর্মীর মাধ্যমে দেশে প্রেরিত অর্থের পরিমাণ ৪ লাখ ৭৬ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এই সঙ্গে ১ কোটি ৬৮ লাখ কৃষক-চাষীর মাধ্যমে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪২ লাখ টন।
বিদেশে টাকা পাচার : গত দেড় দশকজুড়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে বিদেশে লক্ষ-কোটি টাকা পাচারের ঘটনা ছিল অন্যতম আলোচিত বিষয়। বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে গত ১০ বছরে ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। টাকার হিসাবে এর পরিমাণ ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটির বেশি। প্রতিবছর গড়ে ৬৮৩ কোটি ডলারের বেশি পাচার হয়। গত ২৬ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) বাণিজ্যের আড়ালে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে অর্থ পাচারসংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের এই চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদন অনুসারে, এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে অর্থ পাচার হওয়া ১০টি দেশের একটি হলো বাংলাদেশ। মূলত আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে অর্থ পাচারের কৌশলকে এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে। গত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অর্থনীতি নিয়ে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রতিবেদন দিয়েছিল। তাতে বলা হয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে।
ওই সময়ের বাজারদর অনুযায়ী এর পরিমাণ ২৮ লাখ কোটি টাকা। এই হিসাবে প্রতিবছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের রাঘববোয়াল (ক্রীড়নক), আমলা ও মধ্যস্বত্বভোগীরা এই পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। কতো সংখ্যক ব্যক্তি এই পাচারের সঙ্গে জড়িত তার নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), ব্যাংক এবং অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারে জড়িত এমন ৫২৮ জন ব্যক্তির একটি নতুন তালিকা তৈরি করে- যা নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ব্যাংক খাত থেকে বড় অংকের টাকা লুটপাট ও পাচারের সাথে জড়িত সুনির্দিষ্ট ১২ জন শীর্ষ প্রভাবশালী ‘অলিগার্ক’ বা অর্থ পাচারকারীকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিক সহায়তায় তদন্ত চালানো হচ্ছে।
খেলাপি ঋণ ও ঋণ খেলাপি : বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করে নানা কৌশলে আত্মসাৎ করা একটি প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতেও খেলাপি ঋণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ শেষে তফসিলি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাস আগে, ডিসেম্বর শেষে এই অঙ্ক ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এদিকে জাতীয় সংসদে অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক দেশের শীর্ষ ২০ জন ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকাও দেয়া হয়েছে। এই তালিকায় থাকা লোকদের কাছেই পাওনা অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৯ হাজার ২৮৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণ ১৬ হাজার ৫৮৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট ঋণখেলাপির সংখ্যা ৭ লাখ ৮৬ হাজার ৬৫ জন। ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ ফেরত দেন। কিন্তু বড় উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়ার সংস্কৃতি তৈরি করেছেন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের দেড় দশকে দেশের অর্ধেকের বেশি ব্যাংক থেকে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে ঋণের নামে অর্থ লোপাট করা হয়েছে।
প্রবাসীদের অবদান : বিপরীতে দেখা যায়, দেশের অর্থনীতি যেটুকু চাঙা বা চলমান রয়েছে তাতে বাংলাদেশ থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া প্রবাসীদের অবদানের ফল। তথ্যে দেখা যায়, প্রবাসী বাংলাদেশীরা ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১৬ জুন পর্যন্ত মোট ৩৪ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থাৎ ৪ লাখ ৭৬ হাজার ১৯০ কোটি টাকা দেশে পাঠিয়েছেন। যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৯ দশমিক ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই আয় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বৈধ উপায়ে রেমিট্যান্স বাড়াতে বর্তমানে সরকার ২.৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা দিচ্ছে। রেমিট্যান্স আসার ক্ষেত্রে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কুয়েত, কাতার, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য। বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ বিলিয়ন মানুষ রেমিট্যান্স প্রেরণের সাথে যুক্ত, যেখানে প্রতি ৭ জনে ১ জন অভিবাসী নিজ দেশে অর্থ পাঠান। অন্যদিকে, বাংলাদেশে বর্তমানে বিদেশ থেকে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণকারী প্রবাসী কর্মীর সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখের বেশি।
গার্মেন্টস খাতের অবদান : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্টস খাতের অবদান অনস্বীকার্য। তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানিতে বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষস্থানে রয়েছে চীন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ৩৮ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারের (৪ লাখ ৭৬ হাজার ১৯০ কোটি টাকা) তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। বৈশ্বিক বাজারে এই হিস্যা ছিল ৬ দশমিক ৯০ ভাগ। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৮ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালের করোনাকালে বাংলাদেশকে টপকে দ্বিতীয় স্থানটি দখল করে নিয়েছিল ভিয়েতনাম। পরের বছর ২০২১ সালে ভিয়েতনামকে পেছনে ফেলে হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধার করে বাংলাদেশ। তৃতীয় অবস্থানে চলে যায় ভিয়েতনাম। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে বর্তমানে ৫০ লাখ ১৭ হাজার ৬৫২ জন শ্রমিক কাজ করছেন বলে জানা যায়। এর মধ্যে ২৭ লাখ ৮৮ হাজার ৬১৬ জন নারী শ্রমিক রয়েছেন।
কৃষক-চাষীর অবদান : বাংলাদেশের গ্রামে-পল্লীতে নিরন্তর চাষাবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত কৃষক-চাষীর অবদান দেশের অর্থনীতির জন্য উল্লেখযোগ্য একটি দিক। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ১ কোটি ৬৮ লাখ কৃষক-চাষীর মাধ্যমে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪২ লাখ টন। প্রাথমিক কৃষিপণ্য (শস্য) উৎপাদনে সামগ্রিকভাবে বিশ্বের ১৪তম শীর্ষ দেশ বাংলাদেশ। তবে বিশ্বের নির্দিষ্ট কিছু প্রধান কৃষিপণ্য ও খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং সরকারি তথ্যানুযায়ী, বিভিন্ন কৃষিপণ্যের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হলো চাল উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম, সবজি তৃতীয় বৃহত্তম, পাট উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম, মিঠা পানির চাষকৃত মাছ উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়, কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম এবং আম উৎপাদনে সপ্তম। এছাড়া আলু উৎপাদনে বিশ্বে অষ্টম বৃহত্তম দেশ বাংলাদেশ। এই বিপুল পণ্য যেমন দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য চাহিদা পুরন করে তেমনি বেশ পরিমাণ বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। এর ফলে এই খাতের মাধ্যমেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জিত হয়। যা দেশের রিজার্ভকে সমৃদ্ধ করতে সহায়ক হয়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বিগত দেড় দশকে কিছু সংখ্যক রাজনৈতিক ধান্দাবাজ, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি দেশের আর্থিক পরিস্থিতিকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে সক্রিয় ছিল। এখনো তাদের অপতৎপরতা সীমিত আকারে হলেও চলমান রয়েছে। বিপরীতে দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে এবং মেরুদ- সোজা রাখতে অবিরাম শ্রম দিয়ে যাচ্ছে নি¤œ আয়ের অগণিত মানুষ। এদের মধ্যে আছে মাঠের কৃষক চাষি, গার্মেন্টসের দরিদ্র শ্রমিক- কর্মচারী এবং সংসার ও পরিবার থেকে বছরের পর বছর বিচ্ছিন্ন থাকা রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। গত আওয়ামী শাসনের দেড় দশকে টাকা লুটের প্রবণতা ছিল আকাশচুম্বী। সেই প্রবণতায় ছেদ পড়লেও তার কিছু অবশিষ্ট থেকেই গেছে। যে কারণে আন্তর্জাতিক নেতিবাচক রেটিংগুলো থেকে বাংলাদেশ সহজে বের হতে পারছে না।