জসিম উদ্দিন মনছুরি

মজলুমের আশ্রয়ের শেষ ঠিকানা বিচার বিভাগ। মানুষ যখন সব হারিয়ে বসে তখন তার আস্থার শেষ ঠিকানা হয়ে দাঁড়ায় বিচার বিভাগ। স্বাধীন বিচার বিভাগ ছাড়া একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এটাই স্বাভাবিক। আইনের রক্ষণাবেক্ষণ করবে দেশের বিচারবিভাগ। অপরাধী যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন স্বাধীনভাবে বিচার বিভাগ তার যথাযথ শাস্তি প্রয়োগ করবেন। আইনের দৃষ্টিতে ছোট-বড় সবাই সমান। যে দেশে আইনের শাসন থাকবে না সে দেশ কখনো নিয়ম শৃঙ্খলা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যেতে পারবে না। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ অবশ্যম্ভাবী। বাংলাদেশ সরকার মূলত ৩টি প্রধান বিভাগ নিয়ে গঠিত। বিভাগগুলো হলো: ১.আইন বিভাগ : আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করার দায়িত্ব এই বিভাগের। বাংলাদেশে ৩০০টি সাধারণ ও ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে গঠিত এককক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ এই বিভাগের দায়িত্ব পালন করে। ২. শাসন বা নির্বাহী বিভাগ : আইন বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিপরিষদ এর অন্তর্ভুক্ত। ৩. বিচার বিভাগ : আইন ভঙ্গকারীদের বিচার করা এবং দেশের সংবিধান ও আইনের সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান করা এই বিভাগের কাজ। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট ও এর অধীনস্থ আদালতগুলো নিয়ে এটি গঠিত।

দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করণের উদ্যোগ গ্রহণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তারই ধারাবাহিকতায় সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য গত ৩০ নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বিচার বিভাগের সব প্রশাসনিক ও সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার সবকিছুর দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের। এ দায়িত্ব এতদিন নির্বাহী বিভাগ তথা আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হাতে ছিল। বিগত ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর অধ্যাদেশের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছিল। সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় ছিল বাংলাদেশের বিচার বিভাগের জন্য গঠিত নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বতন্ত্র একটি সচিবালয়। বাংলাদেশের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করার নিমিত্তে এবং বিচার বিভাগের তত্ত্বাবধান ও অন্যান্য কার্যবলি ছাড়াও নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়াদি থেকে শুরু করে সকল প্রশাসনিক কার্যক্রম এ সচিবালয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে এটি যাত্রা শুরু করে। বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে “সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল” পাশের মাধ্যমে সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময় বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ বা সরকারের প্রভাবমুক্ত রাখার দাবি ওঠে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে প্রভাবমুক্ত এবং নিরপেক্ষ কার্যক্রম পরিচালনার কথা উল্লেখ রয়েছে। ১৯৯৫ সালে তৎকালীন জেলা জজ ও বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসদার হোসেন অন্য ৪৪১ জন দেওয়ানী আদালতের বিচারকদের পক্ষে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর মাসদার হোসেনের করা মামলায় সব প্রক্রিয়া শেষে আপিল বিভাগ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার জন্য ১২ দফা নির্দেশনাসহ চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন। এর ফলশ্রুতিতে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশন গঠিত হয়।

২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ অনুমোদন করে এবং ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নিম্ন আদালতের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান সংক্রান্ত বিষয়াদি যথাযথরূপে পালনের জন্য এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োজনীয় বিধান প্রণয়ন করতে ‘সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেন। ১ ডিসেম্বর সচিবালয়টির প্রথম সচিব হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্বে নিয়োগ পান সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর সুপ্রীম কোর্টের ‘প্রশাসনিক ভবন-৪’-এ প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ এ সচিবালয়টি উদ্বোধন করেন। ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ সরকার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল পাস করে। পরবর্তীতে ২০ এপ্রিল, ৮ জন আইনজীবী এর বিরুদ্ধে রিট দায়ের করে। ১৯ মে বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের ১৫ জন কর্মকর্তা ও বিচারককে আইন ও বিচার বিভাগে ফেরত নেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক দেশের আলোচিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিচার পাঁচ দিনে সম্পন্ন হওয়ায় সরকার প্রশংসিত হয়েছে। তবে নির্বাহী বিভাগের অধীনে বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যেহেতু সরকারের আশ্বাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে এই বিচার প্রক্রিয়ার সম্পন্ন হয়। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যদি সরকারের আদেশেই এত দ্রুত বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হয় তাহলে সরকার যদি ইচ্ছা করে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করতে পারেন। স্বাধীন বিচার বিভাগ হলে বিচার চলতো নিজস্ব গতিতে। তাহলে তার উপর হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার সরকারের কিংবা কোন মহলের থাকত না। জনগণের চাপে পড়ে কিনা সরকার যদি এত দ্রুতই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে তাহলে যুগ যুগ ধরে সাধারণ বিচার প্রার্থীরা দীর্ঘসুত্রিতার কবলে পড়বেন কেন এমন প্রশ্ন জনমনে দেখা দিয়েছে। একটি দেশের আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কোন বিকল্প নেই। যেই দেশে সরকারের আদেশেই বিচার বিভাগ পরিচালিত হয় সেই দেশের ন্যায়বিচার ভূলুণ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর থেকে স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল গণদাবি। সেই দাবিকে প্রাধান্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদিও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য স্বাধীন বিচার বিভাগ সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করে কিঞ্চিত দাবি পূরণে সমর্থ হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচিত সরকার এসেই নিজেদের স্বার্থেই স্বাধীন বিচার বিভাগ সচিবালয় রহিত করে বিচার ব্যবস্থার উপর অহেতুক হস্তক্ষেপ জাতির কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।

যদিও এর বিরুদ্ধে রিট করা হয়েছে। রিটের নিষ্পত্তির ওপর নির্ভর করছে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা থাকবে কিনা। যদি রিটের নিষ্পত্তিতে সরকার জয়লাভ করে তাহলে বিচারব্যবস্থার কবর রচিত হবে। এখনো সময় আছে আইনের সংশোধন করে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যদি নিজেদের ভুল সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসে তাহলে বিচার ব্যবস্থার উপর মারাত্মক জুলুম হবে। আশা করি সরকার এই বিষয়টি উপলব্ধি করে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য পুনরায় স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

তাহলে বিচার বিভাগ কারো হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবেই রায় প্রদান করে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারবে। অন্যথায় স্বাধীনতার পর থেকে যে দাবি উত্থাপিত হয়ে আসছিল সেই দাবি অধরাই থেকে যাবে। আশা করি এই বিষয়টি উপলব্ধি করে সরকার দ্রুত সময়ে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা ফিরিয়ে দিতে বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ থেকে দূরে সরে আসবে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।