একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের মূল্যায়নে বলেছে, ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে বিশ্বঅর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতি করোনাকালীন অবস্থার কাছাকাছি চলে গেছে। আগামীতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। বৈশ্বিক অনিবার্য প্রভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও বর্তমানে বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। এমনকি এক পরিস্থিতিতে গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেছেন। নিকট অতীতে প্রত্যক্ষ করা গেছে, প্রতিবছরই বাজেটের আকার বৃদ্ধি পায়। এবারও তার কোন ব্যত্যয় ঘটেনি। বাজেটের আকার বৃদ্ধির প্রতি সরকার যতটা উৎসাহী বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ততটাই উদাসীন। ফলে অর্থবছর শেষে দেখা যায়, বাজেটে যে সব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল তার অধিকাংশই অনার্জিত থেকে গেছে। কিন্তু এ জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না। এমননি এক প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরের জন্য রেকর্ড পরিমাণ আয়-ব্যয় সম্বলিত জাতীয় বাজেট প্রস্তাবনা সংসদে উপস্থাপন করেছেন। অর্থমন্ত্রী যে বাজেট প্রণয়ন করেছেন তা স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের ৫৫তম বাজেট এবং এর আকার সর্ববৃহৎ। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার আয়-ব্যয় সম্বলিত প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেছেন। দু’দশক পর রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি জাতীয় বাজেট প্রণয়ন এবং সংসদে উপস্থাপন করলো। নতুন সরকারের বাজেট কেমন বাজেট প্রণয়ন করেন এবং কোন কোন খাতে গুরুত্ব দেয়া হয় এ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা চলছিল।

প্রস্তাবিত বাজেট এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকারের বাজেট হতে যাচ্ছে এটা অনুমান করা গিয়েছিল। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরান্তে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপি’র ৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। একটি দেশের বাজেট ঘাটতি জিডিপি’র ৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্রহণীয় বলে মনে করা হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২০২৬) বাজেটে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় বরাদ্দ রয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করবে। এছাড়া সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ঋণ নেয়া হবে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির বিদ্যমান হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে।

বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগামী অর্থবছওে (২০২৬-২০২৭) বিভিন্ন খাতের মধ্যে জন প্রশাসন খাতে সর্বোচ্চ ১৫ দশমিক ১ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা হবে। অন্যান্য খাতের মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, প্রতিরক্ষা খাতে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, কৃষি খাতে ৩ দশমিক ২ শতাংশ, স্বাস্থ্য খাতে ৬ দশমি ক ৭ শতাংশ, যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ, সুদ খাতে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা হবে। এছাড়া শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের ১৩ দশমিক ১ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা হবে। তবে শিক্ষামন্ত্রী কিছু দিন আগে বলেছিলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দের পরিমাণ মোট জিডিপি’র ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে তার কোন প্রতিফলন প্রত্যক্ষ করা যায়নি। শিক্ষাখাতে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু তা মোট জিডিপি’র ২ শতাংশ মাত্র।

ইউনেস্কোর মতে, একটি দেশের শিক্ষা খাতে মোট জিডিপি’র অন্তত ৬ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দ করা আবশ্যক। নিকট অতীতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছে যারা আন্তর্জাতিকভাবে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার টিকে থাকতে সক্ষম নয়। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা আত্মঅহমিকাপূর্ণ বেকার তৈরি করছে মাত্র। তারা কর্মক্ষেত্রে সুবিধা করতে পারছে না। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যার মাধ্যমে একটি প্রজন্ম গড়ে উঠেছে যারা উচ্চশিক্ষিত, ভালো ফলাফল অর্জনকারী কিন্তু কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় অক্ষম। দেশের একজন খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ এধরনের শিক্ষার্থীদের ‘অর্ধশিক্ষিত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ মুহূর্তে শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে যেন চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মতো একটি প্রজন্ম গড়ে উঠতে পারে।

বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে মিশ্র অবস্থা বিরাজ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক সম্পর্কে তাদের সর্বশেষ মূল্যায়নে জানিয়েছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি’র আকার প্রথমবারের মতো ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৫০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করে ৫০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। নতুন সরকার আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপি’র আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আগামী ৮ বছর প্রতিবছর ৮ থেকে ৯ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এটা আগের অর্থবছরের তুলনায় দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২০২৬) প্রাইভেট সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট কমে দাঁড়িয়ে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশে, যা ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরের পর সবচেয়ে কম।

নতুন সরকার এক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব প্রণয়ন করেছে। এ মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচকই নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে প্রাইভেট সেক্টরে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি। সরকার আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপি’র আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে চায়। কর্মসংস্থানের নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে বেকার সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখতে চান। এসব প্রতিটি অর্জনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে প্রাইভেট সেক্টরে ইনভেস্টমেন্ট বাড়ানো। কিন্তু নানাভাবে চেষ্টা করা সত্ত্বেও প্রাইভেট সেক্টরে প্রত্যাশিত মাত্রায় বিনিয়োগ বাড়ছে না। অনেক দিন ধরেই প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের কোন লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। আমাদের দেশের বিনিয়োগকারীগণ অর্থায়নের জন্য প্রধানত ব্যাংকিং সেক্টরের উপর নির্ভর করে থাকেন। কিন্তু অধিকাংশ ব্যাংক এখন বিনিয়োগ করার মতো অবস্থায় নেই। খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ব্যাংকিং সেক্টরের সমস্যা সমাধান, বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আরো কঠোর এবং কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে ব্যাংকিং সেক্টরকে দুর্বল এবং সমস্যাগ্রস্ত রেখে প্রাইভেট সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট বাড়ানোর কথা চিন্তা করা যায় না।

এ অবস্থায় গত ২৩ মে চলমান দেশীয়ও বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মধ্যে বন্ধ ও সংকটগ্রস্ত শিল্পগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা, বেসরকারি খাতের কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা ও সার্বিকভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ৭ শতাংশ সরল সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এই প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো থেকে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার মাধ্যমে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা সরকারি গ্যারান্টির অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে প্রদান করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত বিশেষ বিনিয়োগ তহবিল প্রাইভেট সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে। কিন্তু এ তহবিল থেকে কিভাবে ঋণ বিতরণ করা হবে, কারা সেই ঋণ পাবেন এসব প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন। যারা ইচ্ছাকৃত এবং পরীক্ষিত ঋণ খেলাপি এবং না আইনি সুবিধার মাধ্যমে নিজেদের ক্লিন (ঋণ খেলাপিমুক্ত) দেখাচ্ছেন তারা যদি এই বিশেষ তহবিল থেকে ঋণ পাবার যোগ্য বলে বিবেচিত হন তাহলে বিশেষ ঋণদান তহবিল শুধু ব্যর্থ হবে তাই নয় ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ানো না গেলে আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হবে। আগামী অর্থবছরে দেশের জিডিপি’র আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় পাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ কতটা বাড়ানো সম্ভব হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ দেশে অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশের অভাব রয়েছে। বন্দর ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতাসহ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব বিনিয়োগ পরিবেশকে বিঘ্নিত করছে। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কোন প্রবাসী বাংলাদেশি অথবা বিদেশি নাগরিক যদি বিনিয়োগ আহরণের ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারেন তাহলে তাদেরকে ১ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে আর্থিক প্রণোদনা দেয়া হবে। বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সামাজিক এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকা একান্ত প্রয়োজন। উৎপাদনশীল প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং দারিদ্র্য বিমোচন কোনো কার্যক্রমই আলোর মুখ দেখবে না।

আগামী অর্থবছরে (২০২৬-২০২৭) মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জন করা কঠিন হবে। বিগত প্রায় ৪ বছর ধরে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা বিরাজ করছে। ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে,এ বছর জুন মাসের মধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশ অতিক্রম করে যেতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য মোতাবেক, গত মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, আগামী অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার ডাবল ডিজিট অতিক্রম করে যেতে পারে। বিশেষ করে ইরান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ¦ালানি তেলের মূল্য বেড়ে গেছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে সব ধরনের জ¦ালানির মূল্য বাড়ানো হয়েছে। অর্থনীতিতে নিশ্চিতভাবেই এর প্রভাব পড়বে।

রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান মোটেও ভালো নয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়ানো যাচ্ছে না বলে দেশ ক্রমাগত বিদেশি ঋণ নির্ভর হয়ে পড়ছে। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যেতে পারে। আগামী অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জিত হবার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ করের হার বাড়াতে হবে। আর উচ্চ হারে করারোপের পরিবর্তী কর জাল বিস্তৃত করা প্রয়োজন। সাধারণ করদাতাগণ যাতে কর প্রদানে আগ্রহী হন তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৬ দশমিক ৮ শতাংশের কম। আগামী অর্থবছরের মধ্যে তা ৯দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল একটি দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও অন্তত ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হওয়া উচিৎ। বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি-রেশিও বাড়ানোর জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড প্রদানসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে নতুনত্ব আনা হয়েছে। কিন্তু এগুলো কতটা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সামগ্রিকভাবে আগামী অর্থবছরের (২০২৬-২০২৭) জন্য যে বাজেট প্রস্তাবনা করা হয়েছে তা বেশ চ্যালেঞ্জিং। বাজেট বড় কী ছোট সেটা যতটা না বিবেচ্য বিষয় তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সঠিকভাবে বাজেট বাস্তবায়ন করা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়ন দ্রুততর করতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে যেসব প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেইসব প্রকল্পই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কয়েক বছর আগে এক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছিল সাধারণত কয়েকটি বিশেষ কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। এগুলো হচ্ছে, প্রকল্প অনুমোদনকারে দীর্ঘ সূত্রিতা, বরাদ্দকৃত প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড়করণে বিলম্ব, প্রকল্প পরিচালন নিয়োগে বিলম্ব এবং অনুমোদিত প্রকল্পের অনুকূলে ভূমি অধিগ্রহণে অথবা ক্রয়ে বিলম্ব। এছাড়া প্রতিবারই দেখা যায়, অর্থবছরের শুরুতে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। অর্থবছরের শেষের দুই মাস অর্থাৎ মে এবং জুন মাসে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এতে বাস্তবায়িত প্রকল্পের গুণগত মান ক্ষুণ্ন হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ বছরের শুরু থেকেই দ্রুততর করতে হবে। এছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থে একান্ত আবশ্যক এমন প্রকল্পকেই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে স্থান দিতে হবে।

প্রস্তাবিত বাজেট গতানুগতিক এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অর্জনযোগ্য নয়।

লেখক : সাবেক ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।