‘‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’’ আজকের বাস্তবতার নিরিখে প্রবাদ বাক্যটি কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় একটি প্রথাগত বুলি তা কিন্তু নয়! প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত জটিল ও কঠিন। শিক্ষার বিস্তার ও প্রতিষ্ঠানের বহর যে হারে বাড়ছে- সে তুলনায় শিক্ষার মান কিন্তু বাড়েনি। শিক্ষার মান না বাড়লে মানহীন শিক্ষা শুধু পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে। কিন্তু জাতি গঠনের ভিত্তি হতে পারবে না; কারণ প্রকৃত শিক্ষা ব্যতীত কোনো জাতির ভাগ্যের উন্নয়ন হয় না, যার ভুরি ভুরি উদাহারণ আছে। বর্তমান সভ্যতায় যারাই অগ্রগামী তারাই শিক্ষিত। শিক্ষার সোনালি সোপান গ্রামের ধূলিমলিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দা থেকেই রচিত হয়। যে শিশুটি সেই অবহেলিত প্রাঙ্গণে নিজের ভিত শক্ত করতে পারে, সেই একদিন মহীরূহ হয়ে দেশকে আলো দেখাতে পারে। অথচ আজ সেই সুতিকাগারটিই চরম অবহেলায় ধুঁকছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার করুণ দশা অনুভব করতে কোনো পন্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, কেবল চারপাশের তরুণ প্রজন্মের বিষণ্ন চোখের দিকে তাকালেই সব উত্তর স্পষ্ট হয়ে যাবে। আগের তুলনায় জাঁকজমকপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, কাগজে কলমে শিক্ষার্থীর লাইনও হয়েছে দীর্ঘ। কিন্তু শিক্ষার মানের সূচক প্রশ্নবিদ্ধ। মানহীনতার এই ভিড়ে যেন আজ কারোরই কোনো মাথাব্যথা নেই। প্রতিবছর লাখ লাখ অবুঝ শিশু-কিশোর প্রতিকূল পরিবেশের নির্মম যাঁতাকলে পড়ে অকালেই ঝরে পড়ছে। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার এই নির্মম বৈষম্য ঘোচেনি। সরকার আসে, সরকার যায়। কিন্তু গ্রামের খেটেখাওয়া মানুষের সন্তানের ভাগ্যবদলের কোনো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয় না। বরং আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষা আজ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

শিক্ষার ব্যয় আজ লাগামহীনভাবে বেড়ে চলায় সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা দুচোখে হাজারো স্বপ্ন নিয়েও ঝরে পড়ছে, আর বিপরীতে সব সুযোগ লুফে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বিত্তবানদের সন্তানরা। যদিও এটি সবক্ষেত্রে চিরন্তর সত্য নয়- মাঝে মাঝে কুঁড়েঘরে জন্ম নেয়া কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকের সন্তানও অভাবকে জয় করে বোর্ড সেরা হওয়ার অবিশ্বাস্য নজির গড়ে। তবে সেই ব্যতিক্রমী চিত্র সার্বিক বেদনাবিধুর বাস্তবতাকে ঢাকতে পারে না। সম্প্রতি প্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, শহরের নামি-দামি স্কুলের উজ্জ্বল আলোর বিপরীতে গ্রামের অবহেলিত স্কুলগুলোর দৃশ্য কতটা আঁধারে ঢাকা। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে রাজধানীতে পাসের হার যখন ৮৩ শতাংশের বেশি, তখন ঠিক একই শিক্ষাবোর্ডের অধীন মাদারীপুর জেলায় তা ৫৮ শতাংশের নিচে নেমে আসে। সারা দেশে তিন শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি-এই লজ্জা কার?

গ্রাম ও শহরের এই বৈষম্যের স্বরূপ অত্যন্ত গভীর এবং বহুমুখী। এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কাঠামোগত কারণ। যার অন্যতম প্রধান কারণ হলো শিক্ষক সংকট ও বিষয়ের ভিন্নতা। শহরের নামী-দামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যেখানে প্রতিটি বিষয়ের জন্য স্বতন্ত্র ও দক্ষ বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক থাকেন, সেখানে গ্রামের স্কুলগুলোতে মাত্র একজন শিক্ষককেই একাধিক ভিন্নধর্মী বিষয়, যেমন- ইংরেজি ও গণিতের মতো জটিল বিষয়গুলো পড়াতে হয়। ফলে শিক্ষার কাক্সিক্ষত মান নিশ্চিত হয় না। এছাড়া কোচিং ও প্রযুক্তিগত দিক থেকেও রয়েছে আকাশসমান তফাত। শহরের শিক্ষার্থীরা স্কুল সময়ের বাইয়ে কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউটর এবং প্রযুক্তির সহজলভ্য সুবিধা পেলেও গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থীদের কাছে এই সুযোগগুলো প্রায় আকাশকুসুম কল্পনা। ডিজিটাল বৈষম্যের কারণে শহরের শিক্ষার্থীরা যেখানে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে; গ্রামের শিক্ষার্থীরা সেখানে কেবল পাঠ্যবইয়ের গণ্ডির মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকছে। পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ধরনের ফারাক। শহরের স্কুলগুলাতে বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞানমেলা, ল্যাবে হাতেকলমে শেখার সুযোগ বা সাংস্কৃতিক চর্চার যে অনুকূল পরিবেশ থাকে, গ্রামের অধিকাংশ স্কুলে তার লেশমাত্র নেই। ফলে শহরের শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসী ও সৃজনশীল হয়ে গড়ে উঠলেও গ্রামের শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। গ্রামের শিক্ষার্থীরা সবাই খারাপ তা আমি বলছি না। কিন্তু আমার পরিচিত কয়েকজনের সন্তানের পড়ালেখার খোঁজখবর নিতে গিয়ে দেখলাম যে, ক্লাস সেভেন পড়ুুয়া ছেলেমেয়ে ভালো করে বাংলা ও ইংরেজি পড়তে পারে না। আমি অবাক হলাম। অথচ এই ছেলেমেয়েদের যদি সঠিকভাবে তদারকি করা হতো তাহলে তাদের পড়ালেখার করুণ অবস্থা হতো না। এ জন্য দায়ী কিন্তু পরিবার। সন্তান নন। গ্রামের অভিভাবকদের তদারকির অভাব দৃশ্যমান। সে তুলনায় শহরের অভিভাবকরা প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে সন্তানদের পড়াশোনার নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন। কিন্তু গ্রামের অনেক অভিভাবক শ্রমজীবী বা স্বল্পশিক্ষিত হওয়ায় সন্তানদের পড়াশোনায় সঠিক নির্দেশনা দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এমনকি আধুনিক ল্যাবরেটরি, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং খেলার মাঠের মতো অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধাও শহরের নামীদামী প্রতিষ্ঠানে যতটা উন্নত, গ্রামের স্কুলগুলোতে তা আজ জরাজীর্ণ কিংবা প্রায় অস্তিত্বহীন।

আমাদের দেশে শিক্ষা ও চিকিৎসাকে মুনাফামুক্ত রাখা জরুরি ছিল। অথচ দুঃখজনকভাবে এই দুটি খাতই আজ নির্মম বাণিজ্যিকীকরণের মূল হাতিয়ার। ইউনেস্কোর এক গবেষণায় তথ্য বেরিয়ে এসেছে- বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের ব্যয়ের ৭১ শতাংশই বহন করতে হচ্ছে খেটেখাওয়া সাধারণ পরিবারগুলোকে। বাজারের লাগামছাড়া দ্রব্যমূল্য ও নুন আনতে পান্তা ফুরানো জীবনে মানুষের এমনিতেই পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে, তার ওপর এই পাহাড়সমান শিক্ষা ব্যয় তাদের একেবারেই কোণঠাসা করে দিচ্ছে। আমাদের বুকের ধন সন্তানরা যদি উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে অদক্ষ ও বোঝা হয়ে বড় হয়, তবে তা সমগ্র জাতির জন্যই এক অভিশাপ হিসেবে পরিগণিত হবে। এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার পাসের হার গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, যা আমাদের জাতীয় ব্যর্থতারই এক নীরব দলিল। একটুখানি নম্বরের ব্যবধানে এবং একটিমাত্র বিষয়ে সামান্য হোঁচট খাওয়ার কারণে যে নিষ্ঠুর পরিণতি শিক্ষার্থীদের সহ্য করতে হয় তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে একটি বছর নষ্ট হওয়া তরুণপ্রাণের জন্য এক অসহনীয় বিড়ম্বনা যা অনেক সময় তাদের আত্মহত্যার মতো জঘন্য ও মর্মস্পর্শী পথ বেছে নিতে বাধ্য করে। রাষ্ট্রের কি সামান্য সদিচ্ছা নেই এই নিয়ম বদলানোর? যারা অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের মাত্র এক মাসের ব্যবধানে একটি বিশেষ সুযোগ দিয়ে পুনরায় পরীক্ষা নিয়ে দ্রুত ফলাফল প্রকাশের ব্যবস্থা কি করা যায় না? আমাদের সন্তানেরা তো কোনো অপরাধী নয়, তারা আগামী দিনের সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার অমূল্য হাতিয়ার। আজ কেউ পরীক্ষায় একটু পিছিয়ে পড়লে তাকে সমাজের কটু কথা শোনানো হয়, অভিভাবক ও শিক্ষকরা মুখ ফিরিয়ে নেন। আমরা যদি এই ভেঙে পড়া কিশোরটির পাশে দাঁড়িয়ে একটু স্নেহের হাত বাড়িয়ে না দিই, তবে সে বাধ্য হয়েই অন্ধকার জগতের বা কিশোর গ্যাংয়ের খপ্পরে পা বাড়াবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দক্ষিণ কোরিয়া বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোও একসময় চরম দারিদ্র্য ছিল। কিন্তু রাষ্ট্র যখন শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছে এবং একে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে, তখন সেই দেশগুলো স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বৈশ্বিক পরাশক্তি বা উন্নত জাতিতে পরিণত হয়েছে। ঠিক তেমনি ফিনল্যান্ডসহ উন্নত দেশগুলো পরীক্ষানির্ভর অন্ধ প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে শিশুদের চোখে-মুখে শেখার আনন্দ ফুটিয়ে তুলেছে, যেখানে শিক্ষকরা প্রকৃত অভিভাবক হয়ে শিশুদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতে মূখ্য নিয়ামক ভূমিকা পালন করেন। অথচ আমাদের দেশে তার বিপরীত চিত্র প্রায়ই খবরের পাতায় মুদ্রিত হয়। এই চরম বৈষম্য ঘুচিয়ে একটি মেধাভিত্তিক ও সমতার সমাজ গড়তে রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের এখনই কিছু বাস্তবমুখী ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

প্রথমত শহরের নামীদামী স্কুলগুলোর মতো গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও দক্ষ ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি গ্রামে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা ও পদোন্নতির অগ্রাধিকার রাখা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্কুলগুলোতে আধুনিক বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব ও লাইব্রেরির মতো অবকাঠামোগত উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

তৃতীয়ত শিক্ষা খাতে সরকারি বরাদ্দ বাড়িয়ে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ কঠোর হাতে রোধ করা দরকার, যাতে করে দরিদ্র পরিবারের মেধাবী সন্তানরা অর্থের অভাবে ঝরে না পড়ে।

চতুর্থত প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ পরীক্ষাপদ্ধতি সংস্কার করে অকৃতকার্য শিক্ষাথীদের জন্য সংক্ষিপ্ত সময়ে বিশেষ পরীক্ষা নেয়া যায় কি না সে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখার জন্য বিনীত আহ্বান জানাচ্ছি।

শিক্ষার অধিকার সবার- এটি কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দয়ার বিষয় নয়। এটি সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের বন্দোবস্ত করার বিষয়টি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। সুতরাং আমরা মনে করি গ্রাম ও শহরের এই নির্মম শিক্ষার বৈষম্যের দেওয়াল গুঁড়িয়ে দিতে না পারলে আমাদের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জোয়ার যতই দৃশ্যমান হোক না কেন দেশ কখনো কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে না। গতানুগতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন কিংবা নতুন মুখের ভিড় আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে পাারবে না। প্রয়োজন দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সরকার, বিরোধী দল, সুশীল সমাজ ও অভিভাবক সমাজের সম্মিলিত সদিচ্ছা এবং বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে একটি আধুনিক, মানবিক ও বেকারত্বমুক্ত শিক্ষাকাঠোমো গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি। জিপিএ-৫ এর সোনার হরিণ শিকারের এই অন্ধ প্রতিযোগিতায় আমাদের কোনো শিশুই যেন কোণঠাসা হয়ে হারিয়ে না যায়। গ্রাম বা শহর নির্বিশেষে প্রতিটি শিশু যেন বুকভরা সাহস, মেধা ও আনন্দের সাথে একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার অধিকার পায়। এ বিষয়টি নিশ্চিতকল্পে রাষ্ট্র উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবে, এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।