মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

গত ৪ আগস্ট দৈনিক সংগ্রামে দাউদকান্দি (কুমিল্লা) সংবাদদাতার বরাতে একটি নিউজ ‘‘টেঁটাযুদ্ধে নারী নিহত গ্রেফতার ৪” শিরোনামে ছাপানো হয়েছে। ‘টেঁটাযুদ্ধ’ কথাটা যারা পত্র পত্রিকা পড়েন সচেতন পাঠকগণ সহজেই বুঝবেন। কিন্তু যারা শহুরে মানুষ তারা এবং শহর গ্রাম নির্বিশেষ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নতুন প্রজন্ম বিষয়টি বুঝতে একটু কষ্ট হবে বৈকি। গ্রামীণ জীবনে মারামারিতে ব্যবহৃত এ জাতীয় স্থানীয় অস্ত্রের মধ্যে আরেকটি বহুল ব্যবহৃত অস্ত্র হলো হলংগা। ইংরেজ আমলে হলংগার আঘাতে মৃত্যু ও আঘাতপ্রাপ্তদের বিচার কার্যক্রম চালানোর সময় নাকি ইংরেজ জজ প্রশ্ন করেছিলেন What is Holonga ? উকিল সাহেব তখন জবাব দিয়েছিলেন A kind of weapon made of Barak Bash and one of its Side is Chukka and another Side is Bhotha. This is called Holonga. ইংরেজ বিচারক সাহেব নাকি তখন প্রশ্ন করেছিলেন যে What is Chukka and Bhotha. তখন উকিল সাহেব বললেন Chukka means sharp and Bhotha means not Chukka i.e. not sharp rather its opposite shape. যাক ইংরেজ বিচারক সাহেব এখন থাকলে হয়তো জিজ্ঞাসা করতেন What is called Tet? হয়তো তখন তাঁকে বুঝানো হতো যে এটি এক ধরনের অস্ত্র। লোহার বা স্টিলের সরু একাধিক ধারালো ফলা দিয়ে তৈরি এ ধরনের অন্য একটি অস্ত্রের নাম হলো কোঁচ। এটি ধারালো ফলা কিন্তু সরল হওয়ায় সহজে খোলা যায়। মাছ ধরার কাজেই এটি মূলত ব্যবহৃত হয়। কাঁটাযুক্ত তিনটি লোহার পাত বাঁকিয়ে এগুলোর এক অংশ চিকন বাঁশের আগায় আটকে তৈরি করা এক ধরনের স্থানীয় অস্ত্রকেই টেঁটা বলে। মাছ ধরার কাজেই মানুষ এটি মূলত ব্যবহার করে থাকে। এর প্রতিটি ফলার অগ্রভাগ অত্যন্ত ধারালো ও মাছ ধরার বর্শির ন্যায় একটু বাঁকানো থাকায় এটি শরীরে বিঁধলে বের করা যায় না। বরং যেদিকে ধাবিত সেদিক দিয়ে বের করতে হয়। ফলে এটি একটি জটিল অস্ত্র। শরীরের কোন কোন যায়গায় এটি ঢুকলে অস্ত্রোপাচার করে বের করা সম্ভব হয় কিন্তু এটি যদি গলায় বা মুখে বিঁধে তাহলে আর বাঁচার সুযোগ নেই। কুমিল্লার আলোচিত ঘটনাটি মেঘনা ও তিতাস উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার চর দখলকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের ভয়াবহ টেঁটাযুদ্ধের ঘটনা। এ যুদ্ধে কূহিনূর আক্তার (৩৮) নামে এক নারী গলায় টেঁটাবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কথাই বলা আছে। সেখানে তিনি সহ উভয়পক্ষে আরো ৪০ জন আহত হবার খবর উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে চরভাটেরা এবং চর বিনোদপুর দুটি চর এলাকার লোকদের মধ্যেই জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে সাব রেজিস্ট্রি অফিসেই তর্কাতর্কীর সূত্র ধরেই ঘটনার সূত্রপাত। মেঘনা থানার ওসির ভাষ্যেও চর দখলকে কেন্দ্র করেই যে ঘটনার সূত্রপাত সেটিও উক্ত নিউজে উল্লেখ আছে। যে কথা বলছিলাম মারামারির সময় গ্রামের লোকজন সাধারণত লাঠি, চোঁখা বাঁশ, হলংগা, টেঁটা, গুলতি, ধনুক, তলোয়ার, কিরিচ, রামদা, খুন্তি ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে। প্রতিরক্ষার জন্য তারা মোটা টিনের তৈরি এক ধরনের ঢালও ব্যবহার করে থাকে। সাধারণত দলবদ্ধভাবে লোকদের এ ধরনের মারামারিতে অংশ নেয়াকে বলে হাজ বা সাজ (দাঙ্গা)।

আগের দিনে কোথাও জমি দখল বা প্রতিপক্ষকে মুকাবেলায় এ ধরনের অস্ত্র চালনায় দক্ষ লোকেরা ভাড়াটিয়া গুন্ডা হিসেবে অংশ নিতো। বিশেষত এক জমিদার অন্য জমিদারের সাথে কোন বিশাল এলাকা উদ্ধারে এসব ভাড়াটিয়া গুন্ডাদের ব্যবহার করতো। নানা ধরনের কসরত শেখার জন্য জমিদারগণ এ জাতীয় লোকদের ঢোল সহরত ও নানান উপকরণ কিনে দিয়ে শারীরীক প্রশিক্ষণ দিয়ে যাতে চাহিবা মাত্র হাজিরা দিতে পারে সেজন্য পোষ্য হিসেবে লালন করতো।

মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর সঙ্গমস্থলে (বর্তমান ভৈরব) পলি ও বালু পড়ে যখন একটি বিশাল চর এলাকা জেগে ওঠে সেটি দখল করার জন্য গত শতাব্দীতে সেখানে একাধিক সাজ বা হাজ (দাঙ্গা হাঙ্গামা) হয় মুক্তাগাছার জমিদার ভবানী কিশোর আচার্য আর মুরাদনগর বিটঘরের দেওয়ান ভৈরব চন্দ্র রায় এর মধ্যে। সেই সাজ বা দাঙ্গায় মানুষের রক্তে মেঘনার পানি লাল হলো। সেই থেকে একটু ভাটিতে দক্ষিণের এক চরের নাম হয়ে যায় ‘লালপুর’। বাবু কালিপ্রসন্ন সিংহ রচিত রাজমালায় এ কাহিনী লিপিবদ্ধ হয়ে চর নিয়ে মারামারি এবং হানাহানি ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন খ্যাতনামা সাহিত্যিক মিন্নাত আলী তাঁর এক লেখায়।

প্রধানত মেঘনার চরের মানুষের মারামারিকে কেন্দ্র করেই আধুনিক কালের টেঁটার যুদ্ধের ব্স্তিৃতি। নদীতে জেগে ওঠা চর দখলকে কেন্দ্র করে গোটা বাংলাদেশের অনেক যায়গাতেই মারামারি হয়। যেসব মানুষছিন্নমূল তারা এসব চরের জমি দখল করার জন্য কোন লোকের অধীনে প্রথমে লাঠিয়াল হয় ও পরে জমির মালিক হয়। এ কারণে চর এলাকার মানুষজন সাধারণত হয় দাঙ্গাবাজ। কোন ভদ্রলোক বিয়ে শাদি সম্বন্ধ করতে গিয়ে যখন জানতে পারে লোকটির বাড়ি কোন চর অঞ্চলে তখন সে আস্তে করে কেটে পড়ে সেখানকার মানুষদের এই অবস্থানগত চরিত্রের জন্য।

বিশেষ করে পাহার বা পর্বত থেকে বয়ে আসা পানির বিশাল জলরাশি বহনকারী নদীকে বলে খরস্রোতা। এর বৈশিষ্ট্যই হলো ভাঙ্গা গড়া। আর ভাঙ্গা-গড়ার বৈশিষ্ট্যের কারণেই যখন কোন অংশ ভাঙে সেখানকার মানুষগুলো নিঃস হয়ে যায়। তারা আবার নতুন করে অন্যস্থানে বসতি নির্মাণ করে। আবার যে স্থানটায় ভাঙে তার ভাটিতে কিন্তু চর জেগে ওঠে। সেখানে আবার নতুন করে আবাদ হয় মানুষের বসতি হয়। মেঘনা বিধৌত অঞ্চল ছাড়াও সমুদ্র উপকূলেও এ রকম নতুন চর জেগে ওঠে। সেখানেও একই অবস্থা। তবে এসব চরাঞ্চলের নামকরণগুলো বিশ্লেষণ করলেই একজন মানুষ বুঝতে পারবে যে এর প্রতিটি ধূলিকনায় মিশে আছে রক্তের কণিকা। যার নেতৃত্বে যে চর দখল হয় সেটি তখন তার নামে নামকরণ হয়ে যায়। কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করেও নামকরণ হয়। কয়েকটি নামের উদাহরণ দিলেই বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। যেমন নোয়াখালির চরহাজারি, কাছিয়ার চর, চর কৃষ্ণপুর, কক্সবাজারের ঘটিভাঙ্গা, হাতিয়ার জাহাজ মারা, চর ওসমান, নারায়নগঞ্জের চরহাজি, চর হোগলা, চর রমজান সোনউল্যা, মুন্সীগঞ্জে সংগ্রামবিল, নিবিরচর, ভাটেরচর, নরসিংদির মুন্সেফের চর, বাদুয়ারচর, চর মাধবপুর, চর ভাষানিয়া, চরসিন্দুর, চরমান্দালিয়া, কাটুয়ারচর, শেরপুরের চর পক্ষিমারি, মানিকগঞ্জের খাসেরচর, ঢাকা দোহার চরবিলাসপুর, মৈনট, বরিশালের চরবাড়িয়া, চরমোনাই, সাহেবের চর, চর ডাকাতিয়া, কমিশনারের চর, চর বাউসিয়া ঘোড়দৌড়, তালূকদারের চর, পটুয়াখালির চর জৈনকাঠি, নতুন চর বাসুদেবপাশা, কুমির মারা, কাউয়ার চর, বরগুনায় জাঙ্গালিয়া, চর লাঠিমারা, চরহাজিপুর, চরবাঘমারা, ভোলার চরকুকরিমুকরি, সোনারচর, চরফৈজদ্দিন, কুষ্টিয়া চর গোলাপনগর, রাজশাহী আষাড়িয়াদহ খাসমহল, খারিজাগাতি ইত্যাদি।

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ হিসেবে চর জেগে ওঠা ও নদীভাঙনের ফলে এসব চর নামকরণ হয়েছে। উপরে যে চরগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো সরকারের দিয়ারা সেটেলমেন্টে উল্লেখিত নতুন জেগে ওঠা চরগুলোর সামান্য উদাহরণ। চরগুলো সরকারী জরিপ অধিদপ্তরের আওতায় ভূমি জরিপ করে এর মালিকানা নির্ধারণ করে দেয়ায় সেখানে নতুন করে কোন দাঙ্গা আর হওয়ার কথা নয়। তবে যেহেতু চরগুলো আগে থেকেই একটি মারামারির বা জবর দখলের মাধ্যমে কোন ব্যক্তির নামে পরিচিতি পেয়েছে সেগুলো পরবর্তীতে জরিপের সময় সেই নামকেই এলাকার নাম হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এ ধারার চর জেগে ওঠা ভূমিতে মালিকানা হলো সরকারের। আর ভূমি জরিপের চলমান ধারায় চর জেগে ওঠার লক্ষণ দেখা দিলেই সেটিকে চিহ্নিত করে নিশান টানিয়ে দেয়া হলো জরিপ বিভাগের কাজ। আর এ কাজটি করাকেই বলে দিয়ারা সেটেলমেন্ট। দিয়ারা শব্দটি সাগর শব্দজাত। যার অর্থ হলো সাগর বা নদী থেকে ভেসে ওঠা চরকে জরিপ করে এটিকে সরকারী ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসা। এ কাজটি যখন করা হয় না তখন পতিত জমিতে লোকেরা আবাদ শুরু করে এবং তাদের মালিকানার স্বত্ব সৃষ্টি করে। আর এ ধারায় যারা শক্তিশালী তারা টিকে থাকে আর দুর্বলরা মার কেয়ে ভেগে যায়। এভাবেই চর দখলকে কেন্দ্র করে যুগ যুগ ধরে দাঙ্গা হাঙ্গামার কত যে ঘটনা ঘটেছে তার কোন ইয়ত্তা নেই।

উপরের প্যারাটিতে ‘দিয়ারা সেটেলমেন্ট’ নামে যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তার মধ্যেই এ মারামারি, কাটাকাটি, টেঁটা যুদ্ধ ইত্যাদির একটি দীর্ঘমেয়াদি মিথস্ক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ব্রিটিশ আমলে এ বিষয়টি লক্ষ্য করেই সরকার ১৮৬২ সালে এর সুষ্ঠু সমাধানে ‘দিয়ারা সেটেলমেন্ট’ প্রথা প্রবর্তন করে। আইনটি প্রবর্তনের প্রথম দিকে এর প্রয়োগ ও কার্যকারিতা থাকলেও পরবর্তীতে এটি শিথিল হয়ে আসে। রোগীর চিকিৎসা না করে রোগীর মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত করে কি কারণে মৃত্যু হলো নির্নয়ের মত। দীর্ঘকাল যাবৎ চলে আসা এ সমস্যাটির সমাধান কোন পথে সেটি নিয়েই এখন কথা বলবো।

নদী মাতৃক অঞ্চলে নদীর ভাঙন এবং নতুন চর জেগে ওঠার ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জমির মালিকানা ও সিমানা নির্ধারণের জন্য সেই কোম্পানী আমলেই (১৭৬৫-১৮৫৭) ১৮৪৭ সালের ৯ নম্বর আইনে প্রভিশন সৃষ্টি করা হয়। নদী গর্ভে বিলীন হওয়া জমি বা নদী সিকস্তির এবং নতুন জেগে ওঠা চর বা নদী পয়স্তির ভূমি ছিলো এ আইনের আওতায় জরিপ করা। পরবর্তীতে ১৮৬২ সালের একটি আইনের মাধ্যমে ১৮৪৭ সালের আইনকে নুতন করে চালু করে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ভূমি জরিপের ব্যবস্থা করা হয়। এ ধারার নদী ও সাগর সংশ্লিষ্ট ভূমির জরিপের নামকরণ করা হয় ‘দিয়ারা জরিপ’। এ জরিপের মাধ্যমে নতুন খতিয়ান সৃষ্টির ব্যবস্থা করা হয়। ভাঙনের ফলে যখন কোনো জমি বিলীন হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে অন্য কোনো স্থানে নতুন চর বা জমি জেগে ওঠে, তখন সেই জমির মালিকানা নির্ধারণের জন্য যে খতিয়ান তৈরি করা হয় তাকেই দিয়ারা খতিয়ান বলে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে জেগে ওঠা এই নতুন ভূমির সীমানা নির্ধারণ এবং ম্যাপ তৈরির জন্য বিশেষ জরিপ চালানো হয়। এই জরিপের মাধ্যমে সরকারি খাস জমি এবং সাধারণ মানুষের মালিকানাধীন জমি আলাদা করে রেকর্ড করা হয়। যে এলাকার ভাঙনের কারণে ভাটিতে চর জেগেছে উপদ্রুত ও ক্ষতিগ্রস্ত লোকগুলোকে নতুন জেগে ওঠা চরে পুনর্বাসনে অগ্রধিকার দেয়া হয়। ফলে চরের জমি নিয়ে মারামারির অবকাশ থাকে না বা চরের জমি নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো আইনগত জটিলতা বা বিরোধ হওয়ার সুযোগও থাকে না। বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় দিয়ারা খতিয়ান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই খতিয়ান মূলত সরকারের সেটেলমেন্ট অফিসের তত্ত্বাবধানে প্রস্তুত করা হয়। এবং এর মাধ্যমে প্রকৃত ভূমিহীনদের পুনর্বাসন বা জমির মালিকানা বণ্টন করা সহজ হয়। প্রচলিত ধারার জরিপের স্থলে বর্তমানে ড্রোনের মাধ্যমে এ জরিপ চালানো যুক্ত হয়েছে। কিন্তু আমাদের ভূমি জরিপের ঐতিহ্যে দিয়ারা জরিপটি যে গতি ও পদ্ধতিতে এবং যত দ্রুত এটি করার কথা সেটি হচ্ছে না। আর সে কারণেই চরের জমি আগে পাবলিক দখল করে মারামারি করে এরপর জরিপ অধিদপ্তর যায় সেখানে জরিপ করতে আর খতিয়ান তৈরি করতে। এসব বিষয় নিয়ে জরিপের লোকদের নানা কেলেংকারীর অন্ত নেই। তারা জোরামলে দখলবাজদের কাছ থেকে ফায়দা নিয়ে তাদের নামে জমির রেকর্ড করে। মাঠ জরিপের সময় মাঠ পরচা লোকদের হাতে না থাকায় সেগুলোর সংশোধন করার সুযোগ পায় না এবং সেটি তসদিককৃত হয়ে ছাপা হয়ে স্থায়ী রূপ ধারণ করে। এগুলো নিয়ে তখন শুরু হয় মামলা এবং দীর্ঘ মেয়াদে কেওয়াছ জারি থাকে। আর এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করেই প্রধানত টেঁটা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এসব টেঁটা যুদ্ধে কত মানুষযে প্রাণ দেয় সেটি আলাদা একটি এমফিল গবেষণার বিষয় হিসেবে আমাদের সামনে আসা উচিত। দলবদ্ধ হয়ে টেঁটাযুদ্ধে যারা একবার অংশ নেয় তারা সমাজবদ্ধ হয়ে একটি পক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তীতে যুদ্ধের প্রয়োজন দেখা দিলে যদি কেউ অংশ না নেয় তাহলে তাকেও হেনস্থার শিকার হতে হয় এবং তাকেও করা হয় সমাজচ্যুত। এভাবে আরবদেশের আইয়ামে জাহেলিয়াত এবং ভারত-বাংলাদেশের মাৎসন্যায় এর ন্যায় জোর জার মুল্লুক তার এ নীতিতে চলে চর এলাকার সামাজিক জীবন।

নদী তীরের বসতিতে নদী ভাঙনে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদেরকে বলে নদী সিকস্তি। আবার ভাটিতে চর জেগে ওঠলে সে চরে যাদের পুনর্বাসন করা হয় তাদেরকে বলে নদী পয়স্তি। কোন এলাকায় এ রকম চর দেখা দিলে তখন এটি দখল করে স্থানীয় দাঙ্গাবাজরা। সেখানেই হয় মারামারি। কিন্তু সরকারের জরিপ বিভাগ যদি কোন স্থানে নতুন চর জেগে ওঠার সাথে সাথে সেখানে ঝান্ডা গেঁড়ে দিয়ে সেটিকে খাস জমি হিসেবে চিহ্নিত করে দিয়ারা জরিপের আয়োজন করতো তাহলে কিন্তু সেটা নিয়ে মারামারি বা টেঁটা যুদ্ধ করার প্রশ্নই ওঠতোনা। বিষয়গুলো সরকারি প্রচার মাধ্যমে বা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে যদি লোকদের অবহিত করা হয় তা হলে তারা স্থানীয় জেলা প্রশাসক বরাবরে এলাকায় জরিপ চালানোর আবেদন করে বিষয়টির সুষ্ঠু সুরাহা করতে পারে। ভূমি জরিপের এ বিষয়টি যদি সরকারের সংসদ সদস্যগণ, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ইউনিয়নি পরিষদ চেয়ারম্যানকে অবহতি করে প্রশিক্ষিত করে তাহলে তারাই এসব জমির বিষয়ে যথা সময়ে উদ্যোগ নিয়ে দিয়ারা জরিপের ব্যবস্থা করে তা হলে আর কখনো জোর যার মুল্লুক তার পদ্ধতিতে এ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সুযোগ থাকবে না। নদী সিকস্তি ও নদী পয়স্তির বিধানে যাদের বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয় অর্থাৎ যারা নদী সিকস্তি তাদের জন্য পরবর্তীতে জেগে ওঠা চরে পুনর্বাসনের বেলায় অগ্রাধিকার দেয়া থাকে। ফলে নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো লোকগুলো পুনর্বাসনেরও সুযোগ পায়। যুগ যুগ ধরে চলে আসা দেশের এ মৌলিক সমস্যার সমাধানে আমারা সবাই সজাগ ও সোচ্চার হই। তাহলে টেঁটাযুদ্ধ বন্ধ হয়ে শান্তির পরিবশে ফিরে আসবে। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে আইন প্রণেতাগণ চিন্তা ভাবনা করবেন বা বিল উত্থাপন করে এটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাক্রমে বাস্তব ধর্মী আইন প্রণয়ন করে দীর্ঘদিনের এ কঠিন এবং জটিল একটি জন সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসবেন সেটাই সকলের প্রত্যাশা।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক