জাফর আহমাদ

বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় উল্লেখিত কবিরাহ গোনাহগুলো ব্যাপক ও মহামারি আকার ধারণ করেছে। দেশের সর্বোচ্চ জ্ঞানী-গুণী ও ভালো মানুষ নামে খ্যাত ব্যক্তিরা এ রোগে বেশি করে আক্রান্ত। যা সমাজ ব্যবস্থাকে বিশেষভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। যারা মসজিদ, মাদরাসায় ও বিভিন্ন জনপদে মানুষকে এগুলোর মারাত্মক কুফল সম্পর্কে সচেতন করবেন,তারাই আজ তার ছাত্র ও ভক্তবৃন্দকে এগুলোর সফল প্রয়োগের ট্রেনিং দিচ্ছেন। তাঁর ছাত্ররা গায়ের জোরে যাকে মনে চাচ্ছে হেয় প্রতিপন্ন করছে, কুৎসা রটনা করছে, অপবাদের ট্যাগ লাগিয়ে ব্যক্তিকে হেনস্তা করছে। যারা এগুলোকে সমাজে প্রচলন ঘটাচ্ছেন, তারা আসলে বিদেশী নাস্তিক শক্তির ক্রীড়নক হয়ে বিদেশীদের হাতকেই শক্তিশালী করছেন। সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এ বিষয়গুলোকে তারা খামখেয়ালির বিষয় মনে করছেন। আগামীকাল কিয়ামতে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে সে ব্যাপারে যারা নির্ভীক শুধু তাদের দ্বারাই এগুলো করা সম্ভব।

গীবত, নামীমা বা চোগলখুরি করা, অপবাদ রটনা, অহংকার করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দান, গোপন দোষ খুঁজে বের করা, অনুগ্রহের খোটা দেয়া, ওয়াদা খেলাপ, অভিশাপ, গালি ও প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া, অযথা ঝগড়া-বিবাদ ও দ্বন্ধে লিপ্ত হওয়া, ধোঁকাবাজি, ছলছাতুরী ও ষড়যন্ত্র করা ইত্যাদি মানুষের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ও সামাজিক শান্তিকে বিনষ্ট করে এবং সমাজকে বিশৃঙ্খলার অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে। এজন্য এই সবগুলোই কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। সামাজিক সম্পর্ক ও ভ্রাতৃত্ববোধ ধ্বংসের যতগুলো আচরণ উল্লেখ করা হলো, তন্মধ্যে গীবত এক মারাত্মক ও ভয়াবহ বিধ্বংসী অস্ত্র। আল-কুরআন ও হাদীসে যতগুলো নিষিদ্ধ কাজ পরিলক্ষিত হয় তন্মধ্যে গীবত ও সুদের উপস্থাপনা ব্যতিক্রমধর্মী। এ দু’টিকে সমাজের ঘৃণিত ও লজ্জাজনক কাজের সাথে উপমা দেয়া হয়েছে। যেমন সুদ সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন: “সুদের সত্তর প্রকার গুনাহ রয়েছে। এর সর্বনিম্ন গুনাহ হলো, নিজের মায়ের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হবার সমতুল্য।” (ইবনে মাজাহ) তদ্রুপ গীবত সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন;“ তোমরা পরস্পরের গীবত করোনা। তোমাদের কেউ কি নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? নিশ্চয় তোমরা এটা অপছন্দ করবে।” (সূরা হুজরাত : ১২)

গীবতের সংজ্ঞা: কোন ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা সে শুনলে অপছন্দ করবে। খোদ রাসুল (সা.) থেকে গীবতের এ সংজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে। মুসলিম শরীফ, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী এবং আরো অনেক হাদীস বর্ণনাকারী হযরত আবু হোরায়রা রা. থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। ঐ হাদীসে নবী (সা.) গীবতের যে সংজ্ঞা বর্ণনা করেছেন তা হচ্ছেঃ “গীবত হচ্ছে, তুমি এমনভাবে তোমার ভাইয়ের কিছু বললে যা তার কাছে অপছন্দনীয়। প্রশ্ন করা হলো, আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে সত্যিই থেকে থাকে তাহলে আপনার মত কি ? তিনি বললেনঃ তুমি যা বলছো তা যদি তার মধ্যে থাকে তাহলেই তো তুমি গীবত করলে। আর যদি তা না থাকে তাহলে অপবাদ আরোপ করলে।” তাই গীবত ও অপবাদ দু’টোই ইসলামে নিষিদ্ধ।

গীবতের গোনাহ: উল্লেখিত আয়াতে “মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার শামিল” বাক্যাংশটি বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, প্রথমত: মৃতের গোশত খাওয়া হারাম, দ্বিতীয়ত: তাও আবার গোশত অন্য কোন জন্তুর নয়, মানুষের গোশত। আর মানুষ জীবিত হোক অথবা মৃত হোক, উভয় অবস্থায় মানুষের গোশত খাওয়া হারাম, তৃতীয়ত: সে মানুষটিও আবার নিজের আপন ভাই। অবশ্য অপরাপদের বেলায় একই হুকুম প্রযোজ্য। অর্থাৎ আপন ভাই উল্লেখ করার অর্থ এই নহে যে অন্য মানুষের গোশত খাওয়া যাবে। গীবত আদতেই একটি অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ তা বুঝানোই এর লক্ষ্য। একটি গীবত একই সাথে তিনটি বড় বড় গোনাহ সৃষ্টি হয়, যাকে আমরা ত্রিফল গুণাহ হিসাবে আখ্যায়িত করতে পারি।

গীবতের প্রভাব: বাস্তবিকই যদি কোন সমাজের অধিবাসীরা মৃত ভাইয়ের লাশ ছিঁড়ে খাবলে খেতে থাকে, তবে সে সমাজ ব্যবস্থাটির দিকে একটু গভীর মনযোগ সহকারে চিন্তা করে দেখুন, কি এক বিভৎস দৃশ্যের অবতারণা হবে। প্রকৃতপক্ষেই গীবত এ ধরনের একটি বিশৃঙ্খল সমাজই উপহার দেয়। যে সমাজটির মানুষগুলো পরস্পরের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে থাকে,তাদের মধ্যে তখন অনৈক্যে সৃষ্টি হয়। ফলে সে সমাজের সার্বিক উন্নয়ন তথা নৈতিক কি বৈষয়িক কোনটিই সম্ভব নয়।

গোপন দোষ-ত্রুটি তালাশ করা ও খারাপ ধারণা পোষণ করা : মানুষের গোপন বিষয় তালাশ করবেন না। কারণ তার গোপন বিষয় আল্লাহই বেশি অবহিত। তার বোঝাপড়া সে আল্লাহর সাথে হবে। আমরা শুধু প্রকাশ্য বিষয়েই শরীয়তের হুকুম প্রয়োগ করতে পারি। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “দোষ অন্বেষণ করো না।”(সূরা হুজরাত: ১২) একজন আরেকজনের দোষ খুঁজে বেড়িও না। অন্যদের অবস্থা ও ব্যাপারস্যাপার অনুসন্ধান করে বেড়াবে না। খারাপ ধারণার বশবর্তী হয়ে এ আচরণ করা হোক কিংবা অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য করা হোক অথবা শুধু নিজের কৌতুহল ও ঔৎসুক্য নিবারণের জন্য করা হোক শরীয়তের দৃষ্টিতে সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ। অন্যদের যেসব বিষয় লোক চক্ষুর অন্তরালে আছে তা খোঁজাখুঁজি করা এবং কার কি দোষ-ত্রুটি আছে ও কার কি কি দুর্বলতা গোপন আছে পর্দার অন্তরালে উঁকি দিয়ে তা জানার চেষ্টা করা কোন মু’মিনের কাজ নয়।

বিনা কারণে কারো প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করা কিংবা অন্যদের ব্যাপারে মতস্থির করার বেলায় সবসময় খারাপ ধারণার ওপর ভিত্তি করেই শুরু করা কিংবা এমন লোকেদের ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করা যাদের বাহ্যিক অবস্থা তাদের সৎ ও শিষ্ট হওয়ার প্রমাণ দেয়। অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তি কথা ও কাজে যদি ভাল ও মন্দের সমান সম্ভবনা থাকে কিন্তু খারাপ ধারণার বশবর্তী হয়ে আমরা যদি তা খারাপ হিসেবেই ধরে নেই তাহলে তা গোনাহের কাজ বলে গণ্য হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“হে ঈমানদারগণ, বেশি ধারণা ও অনুমান করা থেকে বিরত থাকো কারণ কোন কোন ধারণা ও অনুমান গোনাহ।” (সূরা হুজরাত : ১২)

কাউকে উপহাস ও হাসি-তামাসার লক্ষ্য বানানো হারাম: ইসলামের পবিত্রতম সম্পর্কের ভিত্তিতে তারা একে অপরের ভাই এবং আল্লাহর ভয়েই তাদেরকে নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক ঠিক রাখা উচিত। একে অপরের ইজ্জতের ওপর হামলা, একে অপরকে মনোকষ্ট দেয়া, একে অপরের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করা এবং একে অপরের দোষ-ত্রুটি তালাশ করা পারস্পরিক শত্রুতা সৃষ্টির জন্য এগুলোই মূল কারণ। এ সব কারণ অন্যান্য কারণের সাথে মিশে বড় বড় ফিতনার সৃষ্টি করে। এবং সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। এ জন্য আল্লাহ তা’আলা বলেছেন,“ হে ঈমানদারগণ, পুরুষরা যেন অন্য পুরুষদের বিদ্রুপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। আর মহিলারাও যেন অন্য মহিলাদের বিদ্রুপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না এবং পরস্পরকে খারাপ নামে ডেকো না। ঈমান গ্রহণের পর খারাপ নামে ডাকা অত্যন্ত জঘণ্য ব্যাপার। যারা এ আচরণ পরিত্যাগ করেনি তারাই জালেম।” (সূরা হুজরাত : ১৯)

বিদ্রুপ করা: অর্থ কেবল কথার দ্বারা হাসি-তামাসা করাই নয়। বরং কারো কোন কাজের অভিনয় করা, তার প্রতি ইংগিত করা, তার কথা, কাজ, চেহেরা বা পোশাক নিয়ে হাসাহাসি করা অথবা তার কোন ত্রুটি বা দোষের দিকে এমনভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাতে অন্যদের হাসি পায়। এ সবই হাসি-তামাসার অন্তরভুক্ত। মূল নিষিদ্ধ বিষয় হলো কেউ যেন কোনভাবেই কাউকে উপহাস ও হাসি-তামাসার লক্ষ না বানায়। কারণ এ ধরণের হাসি-তামাসা ও ঠাট্রা-বিদ্রুপের পেছনে নিশ্চিতভাবে অন্যকে ছোট করা, অপমানিত ও হেয় করে নিজের বড়ত্ব প্রদর্শনের মনেবৃত্তি কার্যকর। এ কারণেই এ কাজকে হারাম করে দেয়া হয়েছে।

নামের বিকৃতি: ইসলামী নামের মাধ্যমে ব্যক্তি সামান্য হলেও ইসলামের চেতনা ফিরে পায়। এজন্য ইসলামী নাম রাখার প্রতি ইসলাম গুরুত্বারোপ করেছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই পবিত্র নামগুলোর বিকৃতি আমাদের এ অঞ্চলে এত বেশি করা হয়, যা অন্য কোন অঞ্চলে তেমনটি লক্ষ্য করা যায় না। রহিম্যা, করিম্যা, রহমান্যা, কুদ্দুচ্ছা ও রফিক্যা এবং আহাম্মদ, আহমেদ বা আহম্মদ এগুলো পবিত্র নামের বিকৃতি। যা আমাদের ঈমান ও আমলের পরিপন্থী। তাই মু’মিন ও মুসলমানদের এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।

আহমাদ বা আহমদ হলো, আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর শুদ্ধ নাম। এ নামটি বিকৃত করে আহাম্মদ, আহমেদ বা আহম্মদ ইত্যাদি নামে ডাকা অত্যন্ত গোনাহের কাজ। রহিম, করিম, রহমান ও কুদ্দুস শব্দগুলো আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর অন্যতম। এ নামগুলো বিকৃত করে রহিম্যা, করিম্যা, রহমান্যা, কুদ্দুচ্ছা নামে ডাকা আরো মারাত্মক গোনাহ। আল কুরআনের পরিভাষায় এ ধরণের বিকৃতি সুস্পষ্ট জুলুম।

লেখক: ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।