রাষ্ট্র তো কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের তালুক নয়। রাষ্ট্র অনেক বড় ব্যাপার। রাষ্ট্র নাগরিকদের সবার। রাষ্ট্রে নানা মত থাকে, দল থাকে। আর ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য তো রাষ্ট্রের সৌন্দর্য। এই বিষয়গুলো নিয়ে রাষ্ট্রে গড়ে তুলতে হয় ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’। যে দেশের রাজনীতিবিদরা এই বিষয়টি বোঝেন এবং লালন করেন, তারা সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ দেশ গঠনে সক্ষম হন। এর ব্যত্যয় ঘটলে রাজনীতিবিদরা ব্যর্থ হন। ফলে দেশ প্রগতির বদলে পিছিয়ে পড়ে। তখন ধর্ম, বর্ণ ও ভাষাকে কেন্দ্র করে সমাজে লক্ষ্য করা যায় বিভেদ ও হানাহানি। হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা ও নীতিহীনতার এমন পরিবেশে চারদিকে লক্ষ্য করা যায় দুর্নীতি ও জুলুমের রাজত্ব। মানুষ তখন প্রশ্ন করে-এ জন্যই কি আমরা ভোট দিয়েছি, সরকার গঠন করেছি? এমন বাতাবরণে শুধু সরকারের প্রতি নয়, রাজনীতির প্রতিও মানুষের মনে সৃষ্টি হয় ক্ষোভ ও অনীহা। এমন অনীহায় রাজনৈতিক নেতাদের কতটা ক্ষতি হয় জানি না, তবে বড় ক্ষতি হয়ে যায় দেশের এবং মানুষের।

বহুদিন ধরে আমরা জেনে এসেছি ভারত পৃথিবীর বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ। দেশটির নেতারাও এ নিয়ে গর্ভবোধ করে থাকেন। একাডেমিক আলোচনায় ভারতের বুদ্ধিজীবীরা তাদের ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ দর্শন নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন হতে ভালোবাসেন। কিন্তু ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনের চিত্রটা কেমন? বিজেপি সরকার কি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে বৈচিত্র্যের ভারত গড়তে চান, নাকি নির্মাণ করতে চান উগ্র হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিতে ভেদ-বিভেদের এক সংকীর্ণ দেশ? এমন দেশ কি কারো জন্য মঙ্গল জনক হবে, এখন যারা উগ্রতায় উদ্দাম নৃত্য করছেন- তাদের জন্যও কি আদৌ মঙ্গলজনক হবে? মঙ্গলের জন্য আসলে মঙ্গল ভাবনা, উদার ভাবনা প্রয়োজন। উগ্রতা ও সংকীর্ণতা দিয়ে মঙ্গল হয় না, এ বিষয়টি তো সাধারণ মানুষেরও বোঝার কথা। তাহলে বড় বড় প-িত ও বিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা বিষয়টি বুঝতে অসমর্থ কেন? নাকি তারা বিষয়টি বুঝতে চাচ্ছেন না। হয়তো এটাই তাদের রাজনীতি। বহু আগে একটি বইতে পড়েছিলাম ‘প-কর্মে পক্ক যারা, তারাই হলেন প-িতপ্রবর’। দেশে দেশে এই প-িতপ্রবরদের দৌরাত্ম্য চলছে এখন।

১০ আগস্ট বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতে বিদ্বেষ ও ঘৃণামূলক প্রচারণার কারণে গত তিনমাসে কমপক্ষে ২৫ জন মুসলিম হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন। চলতি বছরের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত এই তিন মাসে ভারতীয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও বিজেপির উগ্র হিন্দুদের হামলায় তারা নিহত হন। তাদের মধ্যে ১৫ জন নিহত হয়েছেন পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। বাকি ১০ জনকে হত্যা করেছে উগ্রবাদী হিন্দুরা। অন্যদিকে গত সাত মাসে হেট ক্রাইমে (ঘৃণামূলক অপরাধ) নিহত মুসলমানদের সংখ্যা ৪৪ ছাড়িয়েছে। একই সময় মুসলমানদের বাড়িঘর ও ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে তিন হাজারের বেশি। দক্ষিণ এশিয়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘সাউথ এশিয়া জাস্টিস’-এই তথ্য প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির ভারত বিষয়ক প্রকল্প ‘ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার-এর মাধ্যমে’ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, মুসলিম নিপীড়নের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ।

‘ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার’ জানিয়েছে, তারা ২০২২ সাল থেকে ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণার কারণে হত্যাকা-ের তথ্য সংগ্রহ করে আসছে। এরমধ্যে চলতি বছরেই এ ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মুসলমান হত্যার শিকার হয়েছেন। তাই এ বছরটি হতে চলেছে ভরতে মুসলমানদের জন্য প্রাণঘাতী বছর। সংস্থাটি জানায়, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ৪৪ জন মুসলিম নিহত হয়েছেন হেট ক্রাইমের কারণে। এরমধ্যে ১৯ জন নিহত হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। গণপিটুনি দিয়ে ২৫ জনকে হতা করেছে উগ্রবাদী হিন্দুরা। যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন-তাদের কেউ সাজানো এনকাউন্টারে, কেউ নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন। আর উগ্রবাদী হিন্দুদের হামলা থেকে রক্ষায় সাহায্য চেয়েও ভুক্তভোগীরা সাহায্য পান না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শতশত মুসলমানকে আটক করেছে এ সময়। অনেকের বাড়িঘর, মসজিদসহ ধর্মীয় বহু প্রতিষ্ঠান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ, আসাম, কাশ্মীর এবং সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর এ ধরনের ঘটনার হার বেড়েছে।

ইন্ডিয়া পারসিকিউশান ট্র্যাকারের তথ্য বলছে, শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মুসলিমবিদ্বেষী ও ঘৃণামূলক বক্তব্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও ঘৃণামূলক আপরাধের পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রতিবেদনে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধিদের সতর্কবার্তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ভারতের শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা যেভাবে মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আখ্যায়িত করছেন, তা ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদের বিদেশী নাগরিকদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং এটি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বৈষম্যে উসকানি দেওয়ার শামিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন মুসলিম বিচারক গণপিটুনির জন্য ১৪ জন গোরক্ষককে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছিলেন। এজন্য তিনি হিন্দু চরমপন্থিদের কাছ থেকে হুমকির শিকার হন। এ কারণে তার জন্য বিশেষ পুলিশী নিরাপত্তার প্রয়োজন দেখা দেয়। আইন, নীতি এবং সরকারি বক্তব্যের মাধ্যমে এখন ভারতে মুসলিমদের বহিরাগত গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এর ফলে ভারতের মুসলমানরা এখন নিজেদের দেশেই ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন এবং ভারতে তাদের নাগরিক হিসেবে টিকে থাকা ও অন্তর্ভুক্তি হওয়া স্থায়ীভাবে কঠিন শর্তের জালে আবদ্ধ করা হচ্ছে। কোনো রোষ্ট্রের সরকার যখন ভেদবিভেদের কাজে ব্যস্ত থাকেন, সংখ্যালঘু নাগরিকদের আধিকারহারা করার কাজকে বিশেষ গুরুত্ব দেনÑ তখন সে দেশ সংবিধানে আলোকে পরিচালিত হবে কেমন করে? আর নাগরিকদের সমস্যার সমাধানই-বা হবে কীভাবে? এর বড় প্রমাণ ভারতের শিক্ষাঙ্গন।

ভারতে গত ১০ বছরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেড়েছে। অভিভাবকদের মতে, শিক্ষাক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনার জেরেই আত্মহত্যার হার বাড়ছে। রোববার বৃটেনের সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানে এ ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাইয়ে কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভের পর ভারতীয় সরকার যখন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণা দেয়, তখন সারা ভারতে যেন উৎসব ছড়িয়ে পাড়ে। ব্যাঙ্গাত্মক রাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আয়োজনে ভারতজুড়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে অংশ নেন। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বারবার পরীক্ষা বাতিলের যন্ত্রণায় এ বিক্ষোভ শুরু হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শিক্ষাক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনার কারণে ভারতে পরীক্ষার চাপ বেড়েছে। ভারতের জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ও আত্মহত্যা প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে বিগত ১০ বছরে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার ৮০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৪ সালে ভারতে মোট আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল আট হাজার ৬৮। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪৮৮ জনে। পারিবারিক সমস্যার পর পরীক্ষায় ব্যর্থতা শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার বড় কারণ। শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যর্থতার জের আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলোর মধ্যে সাম্প্রতিক তেলাপোকা বিক্ষোভের বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ খুশি যে, ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা এ ধরনের পরিণতি থেকে রক্ষা পেতে পারে।

আবার কেউ কেউ প্রশ্ন করছেন, এ ধরনের বিক্ষোভ আগে কেন হলো না? দিল্লির ট্যাক্সিচালক ইন্দ্রধর ২০ বছর বয়সি অংশিকা পান্ডের ঘটনা বলছিলেন। চার ভাই-বোনের মধ্যে বড় অংশিকা পান্ডে। চলতি বছর তৃতীয়বারের মতো মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। ৩ মে পরীক্ষা দেওয়ার পর বেশ আশাবাদী ছিলেন তিনি। কিন্তু ১২ মে জানতে পারেন, টানা দ্বিতীয় বছরের মতো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। আবার পরীক্ষা দিতে হবে। তাকে সান্ত¡না দেওয়ার চেষ্টা করলে বলে, কীভাবে সে আবার একটি ভালো পরীক্ষা দেওয়ার আশা করতে পারে। ১৪ মে সবাই যখন কাজে বেরিয়ে যান এবং ছোট ভাই-বোনরা ঘুমাচ্ছিল, তখন গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন অংশিকা পান্ডে। এ যেন শিক্ষার আত্মহত্যা। দেশের সরকার এবং রাজনীতিবিদরা যখন ছাত্র-জনতার মূল ইস্যুগুলোকে সঙ্গত গুরুত্ব না দিয়ে ক্ষমতার রাজনীতি করেন; ভেদ-বিভেদ ও ঘৃণাকে উসকে দেন, সংখ্যালঘু ও দুর্বলদের ওপর জুলুম-নিপীড়ন চালান, তখন রাজনীতির মেরুদ-ে ভাঙন ধরে। সামান্য ধাক্কাতেই পতন ঘটে। পতন ঘটে ক্ষমতার এবং মানুষের আশা-আকাক্সক্ষারও। এ কারণেই হয়তো বিশিষ্ট লেখিকা এবং বিশ্লেষক অরুন্ধতী রায় বলেছেন, রাজনীতিতে নির্বাচনই সবকিছু নয়, কখনো কখনো জনতার আন্দোলন বহু বছর ধরে নির্মিত রাজনৈতিক বয়ান ও ভাবমূর্তিকে সহসাই নাড়িয়ে দিতে পারে।