আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে স্মরণ করে আবেগঘন পোস্ট করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) ফেসবুকে ডা. শফিকুর রহমান এ পোস্ট দেন।

পোস্টে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কিছু মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যান, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন অনাদিকাল ধরে। আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রাহিমাহুল্লাহ তেমনই একজন মানুষ। আল্লাহ তাআলা বলেন, "তাঁর চেয়ে উত্তম কথা আর কার, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।" (সূরা ফুসসিলাত: ৩৩)

তিনি আরও লেখেন, অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন এই জনপদের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, শহরের মঞ্চ থেকে গ্রামের ধুলোমাখা ময়দানে, একটিমাত্র আহ্বান বুকে নিয়ে, আল্লাহর দিকে ফিরে আসার আহ্বান নিয়ে, ডেকে ফিরেছেন কুরআনের দিকে। দেশের গন্ডি অতিক্রম করে বিশ্বেও তাঁর বিচরণ ছিল সমান তালে। শীতের রাতে খোলা মাঠে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে থাকা লাখো মানুষ তাঁর কণ্ঠে কুরআনের তাফসির শুনেছেন। বহু মানুষের ধর্মীয় জীবনের মোড় ঘুরে গেছে সেই আলোচনায়।

বিরোধীদলীয় নেতা আরও লেখেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।" (সহিহ বুখারি) আল্লামা সাঈদীর জীবনের বড় একটি অংশই কেটেছে এই কাজে, কুরআন শেখা, কুরআন শেখানো, আর কুরআনের কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কুরআনের শিক্ষা ও প্রসারের জন্য তিনি নানা প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর ওয়াজের ময়দান হয়ে উঠেছিল অসংখ্য মানুষের ধর্মীয় শিক্ষার পাঠশালা।

জামায়াতে ইসলামীর আমীর লেখেন, মানুষের ভালোবাসা তাঁকে তাফসীরের ময়দান থেকে নিয়ে গিয়েছিল জাতীয় সংসদে। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি কথা বলেছেন ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে, আলিয়া ও ক্বওমি মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে, সাধারণ মানুষের নানা দাবি নিয়ে। সংসদে স্পিকারের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে ঢোকার যে শিরকি রীতি ছিল, আল্লামা সাঈদীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তা বন্ধ হয়েছিল। তাঁর রাজনীতি ও মতাদর্শ নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে ; কিন্তু তাঁর বিপুল অনুসারী আর জনসমর্থন এ দেশের ধর্মীয়-রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অস্বীকার করার উপায় নেই এমন বাস্তবতা।

‘যুগে-যুগে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ওপর যেমন জুলুমের খড়গ নেমে এসেছে, তেমনি আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ওপরও নেমে এসেছিল নির্মম জুলুম-নির্যাতন। আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে যাকে হাজির করা হয়েছিল, সেই সুখরঞ্জন বালি বরং আল্লামার পক্ষেই সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন। আর সেই সাক্ষ্যের কারণেই ফ্যাসিস্টরা তাকে গুম করেছিল।’

‘আল্লামা সাঈদীর ফাঁসির রায়ের দিন দেশজুড়ে নেমে এসেছিল মানুষের ঢল। প্রিয় মানুষটির প্রতি ভালোবাসা আর তাঁর ওপর জুলুমের প্রতিবাদে অগণিত মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন। সেই প্রতিবাদে শহীদ হন দেড় শতাধিক মানুষ। রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ, কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে মুছে ফেলা যায়নি আল্লামা সাঈদীর প্রতি সেই অকৃত্রিম ভালোবাসা।’

‘একদিন বাংলাদেশে আল্লামা সাঈদীর রায়-পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের বিচার করার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, ইনশাআল্লাহ। কারাগারের দেয়াল একজন মানুষের শরীরকে আটকে রাখতে পারে কিন্তু মানুষের ভালোবাসাকে আটকে রাখতে পারে কোন কারাগার?’

‘বছরের পর বছর তিনি কারাবন্দি থেকেছেন। তবুও এ দেশের অসংখ্য ঘরে সন্ধ্যাবেলা বেজেছে তাঁর কণ্ঠে ধারণ করা তাফসিরের রেকর্ডিং; মানুষ শুনেছে, কেঁদেছে, তাঁর জন্য হাত তুলে দোয়া করেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে তাঁর পরিচয় থেকে গেছে কুরআনের একজন আলোচক ও দাঈ হিসেবে।’

‘আজ আল্লামা সাঈদী আমাদের মাঝে নেই। সময়ের পালাবদলে তাঁকে বন্দি রাখা সেই ফ্যাসিস্ট শাসনেরও অবসান ঘটেছে। রয়ে গেছে শুধু তাঁর কণ্ঠের স্মৃতি, তাঁর তাফসির, তাঁর কাজ, আর অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা।

মানুষ চলে যায়, দাওয়াত থেকে যায়।’

‘কণ্ঠ থেমে যায়, রেখে যাওয়া আহ্বান থামে না।

কারাগারের দরজা একজন মানুষকে বন্দি করতে পারে, মানুষের হৃদয়ে তাঁর জায়গাকে বন্দি করতে পারে না।

কবি আল মাহমুদ লিখেছেন—

"পৌঁছুতে চাই প্রভু তোমার সান্নিধ্যে

তোমার সিংহাসনের নীচে একটি ফুরফুরে প্রজাপতি হয়ে

যার পাখায় আঁকা অনাদিকালের অনন্ত রহস্য।"

‘যে কণ্ঠ অর্ধশতাব্দী ধরে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডেকেছে, সে আজ নীরব হয়ে গেছে। কিন্তু কে জানে, হয়তো এই নীরবতাই প্রিয় প্রভুর কাছে পৌঁছে যাওয়া। হয়তো যে মানুষটি সারাজীবন মানুষকে ডেকেছেন প্রভুর দিকে, তিনি আজ সেই সিংহাসনের নিচে একটি ফুরফুরে প্রজাপতির মতো, যার পাখায় আঁকা আছে সেই অনন্ত রহস্য, যার কথা তিনি সারাজীবন বলে গেছেন কিন্তু কোনোদিন পুরোটা বলে শেষ করতে পারেননি।’

‘আল্লাহ তাআলা আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রাহিমাহুল্লাহ এর ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, তাঁর নেক আমলগুলো কবুল করুন এবং তাঁকে শাহাদাতের মর্যাদা দিয়ে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচু মাকাম দান করুন। আমিন।’