মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত রবিবারের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সফর এবং বিভিন্ন জনসভায় দেওয়া বক্তব্য ইতোমধ্যে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামে জনসভা এবং একটি মাদরাসায় ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্য জাতীয় গণমাধ্যম, পত্রপত্রিকা, সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হয়েছে। ফলে তাঁর বক্তব্যের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি রাজনৈতিক ইঙ্গিত জনপরিসরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বিরোধী রাজনৈতিক দলের ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ, স্বৈরাচারী শাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং ১৯৭১ সালের অবস্থানের প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন। একই সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে ‘গুপ্ত বাহিনী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং তাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের মুখ থেকে উচ্চারিত এ ধরনের বক্তব্যকে নিছক একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের প্রধান যখন প্রকাশ্য জনসভায় বিরোধী শক্তিকে ‘ছাড় না দেওয়া’ কিংবা ‘রুখে দাঁড়ানোর’ কথা বলেন, তখন তার অভিঘাত বক্তৃতার মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের মধ্যে যদি এ ধারণা জন্ম নেয় যে বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রতিহত করা তাদের রাজনৈতিক কর্তব্য, তাহলে সভা-সমাবেশে বাধা, কর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মাঠে দাঁড়াতে না দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। আর সেখান থেকেই খুব সহজে জন্ম নিতে পারে সংঘাত। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে-প্রধানমন্ত্রী কেন সংঘাতমুখী ভাষা ব্যবহার করলেন?

এর একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক ব্যাখ্যা হতে পারে, সরকার উপলব্ধি করছে যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার, অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানিসহ জনজীবনের নানা সংকট নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও কর্মসূচি জনগণের মধ্যে প্রভাব সৃষ্টি করছে। ফলে রাজনৈতিক বিতর্কের মূল বিষয়গুলো থেকে জনদৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দিতে রাজনৈতিক মাঠকে উত্তপ্ত করার কোনো কৌশল নেওয়া হচ্ছে কি না-এই প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না।

সরকার বারবার বলছে, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্তু জনগণের প্রশ্ন হলো-সনদে বর্ণিত রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের রূপরেখা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার কতদূর এগিয়েছে? জুলাই সনদের ওপর গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে ম্যান্ডেট দিয়েছে, তার আলোকে সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, সংবিধানের পরিবর্তন, সংশোধন ও পরিমার্জনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হলে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিশেষ করে যখন জুলাইয়ের শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী ব্যক্তিরা তাদের দাবি নিয়ে সোচ্চার এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছে, তখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য সংঘাতমুখী বক্তব্য ব্যবহার করা হচ্ছে কি না-তা ভেবে দেখা জরুরি। যদি এমন কোনো কৌশল সত্যিই গ্রহণ করা হয়ে থাকে, তবে তা শুধু রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ নয়; শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের জন্যও আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

১৯৮৬-এর রাজনীতি : ইতিহাস কি একপাক্ষিকভাবে লেখা যায়?

প্রধানমন্ত্রী ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ তুলেছেন। নিঃসন্দেহে এটি ইতিহাসের একটি ঘটনা। কিন্তু ইতিহাসকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার আলোকে বিচার করলে তার পূর্ণতা থাকে না। সে সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিভিন্ন দলের অবস্থান এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক যোগাযোগও একই সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্ব এ বিষয়ে তাদের অবস্থান বহুবার জাতির সামনে ব্যাখ্যা করেছে। ফলে কয়েক দশক পুরোনো একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একমাত্রিক অভিযোগ হিসেবে ব্যবহার কতটা যুক্তিসঙ্গত, সেটি জনগণের বিবেচনার বিষয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ১৯৯১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা। বিএনপি এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সে সময় জামায়াতের তৎকালীন আমীর অধ্যাপক গোলাম আজমের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমর্থন চাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ। অধ্যাপক গোলাম আজম বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, জামায়াতের সমর্থন লাভের জন্য তাঁকে কয়েকটি মন্ত্রিত্বের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনো পদ গ্রহণ না করে নিঃশর্ত সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন-জামায়াতের এ ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। এ ঘটনাকে যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হোক না কেন, একটি বিষয় স্পষ্ট রাজনীতিতে কেবল নিজের সুবিধাজনক অধ্যায় স্মরণ করে অন্যের ইতিহাস বিচার করলে পূর্ণ সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় না।

যদি স্বৈরাচারের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক রাখা একটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে কারা কার সঙ্গে সমঝোতা করেছে, কার সমর্থনে কে সরকার গঠন করেছে এবং কোন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোন দল কাকে সহযোগিতা করেছে সেসব প্রশ্নও একই মানদণ্ডে বিচার করতে হবে।

অতীত কি বর্তমানের বিকল্প?

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আবারও ১৯৭১ সালের প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং ১৯৭১-এর রাজনৈতিক অবস্থান নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়। এ ইতিহাসকে সম্মান করা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। এ দীর্ঘ সময়ে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছে, সরকার পরিচালনা করেছে এবং বিরোধী দলের ভূমিকাও পালন করেছে। জনগণ তাদের সমর্থন প্রদান করে তাদের মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে। তাই যখন কোনো রাজনৈতিক দল বর্তমান সময়ে জনসমর্থন অর্জনের পথে এগিয়ে যায়, তখন কয়েক দশক পুরোনো একই অভিযোগকে বারবার রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে সামনে আনা হলে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠতে পারে বর্তমানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে অতীতের বিতর্ককে সামনে আনার কারণ কী? জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক উত্থান, সাংগঠনিক বিস্তার ও জনসমর্থন আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। তাদের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে, বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়।

বিরোধী দলের রাজপথের কর্মসূচি কি সত্যিই বিশৃঙ্খলা?

প্রধানমন্ত্রী বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু এখানে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে বিরোধী দলগুলো কি সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে পরিকল্পিতভাবে ভাঙচুর করেছে? জনসম্পদ ধ্বংস করেছে? সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালিয়েছে? যদি এসব না ঘটে থাকে এবং রাজনৈতিক দলগুলো শান্তিপূর্ণভাবে সভা-সমাবেশ ও কর্মসূচি পালন করে থাকে, তাহলে তাদের কর্মকাণ্ডকে সরাসরি ‘বিশৃঙ্খলা’ হিসেবে অভিহিত করার যৌক্তিকতা কোথায়? গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজই হলো সরকারের নীতির সমালোচনা করা, জনগণের দাবি তুলে ধরা এবং তাদের বক্তব্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা। সভা-সমাবেশ, মিছিল কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচি তাই গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চারই অংশ-যতক্ষণ তা শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত থাকে। বরং রাজনৈতিক দলগুলো যদি জনদুর্ভোগ কমানোর চেষ্টা করে, যানজট এড়ানোর ব্যবস্থা নেয় এবং শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে, তাহলে সে দায়িত্বশীলতাকে উৎসাহিত করাই কাম্য। রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর নয়। সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষেরই দায়িত্ব হলো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে সহনশীল, শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে রাখা।

সংঘাত নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সহনশীলতা

বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে কর্তৃত্ববাদ ও স্বৈরাচারী রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। সেই সংগ্রামের অন্যতম আকাক্সক্ষা ছিল-মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা এবং ভিন্নমতকে সম্মান করা। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানও ছিল সে আকাক্সক্ষারই এক ঐতিহাসিক বহিঃপ্রকাশ। তরুণ সমাজ, ছাত্র-যুবক, কৃষক-শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, শিল্পী, সাহিত্যিক, গবেষকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পরিবর্তনের প্রত্যাশায় রাজপথে নেমেছিল। তাদের আকাক্সক্ষা ছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে আর কোনো কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরে আসবে না এবং রাষ্ট্র জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে। এমন প্রেক্ষাপটে ‘রুখে দাঁড়ানো’ কিংবা ‘কোনো ছাড় না দেওয়ার’ মতো ভাষা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ এ ভাষা যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন বা বাধাগ্রস্থ করার সংস্কৃতির দিকে ইঙ্গিত করে, তাহলে তা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মৌলিক প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়বে। গণতন্ত্রে সরকারের শক্তি বিরোধী দলকে দমন করার মধ্যে নয়; বরং বিরোধী মতকে সহ্য করার সক্ষমতার মধ্যেই সরকারের প্রকৃত শক্তি নিহিত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সাময়িকভাবে দমন করে মাঠ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে; কিন্তু জনগণের মন জয় করা যায় কেবল আস্থা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির মাধ্যমে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো—যে রাজনৈতিক শক্তি জনগণের অনুভূতি ও আকাক্সক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, একসময় জনগণও সেই শক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

ক্ষমতা নয়, জনগণই হোক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু : মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আরও একটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাই-বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দুঃখজনক বৈশিষ্ট্য হলো, ক্ষমতায় যাওয়ার পর অনেক রাজনৈতিক শক্তিই ধীরে ধীরে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ক্ষমতার অন্দরমহলে অবস্থান করতে করতে তারা একসময় জনগণের ভাষা শুনতে পান না, তাদের দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি করতে পারেন না, তাদের ক্ষোভ ও প্রত্যাশার সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের দূরত্বও বুঝতে পারেন না। একপর্যায়ে জনগণের সেবা করার পরিবর্তে ক্ষমতাকে ধরে রাখাই রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। এ সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রত্যাশাই ছিল জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম অন্তর্নিহিত আকাক্সক্ষা।

তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জনগণের প্রত্যাশা—এমন কোনো বক্তব্য যেন না আসে, যা রাজনৈতিক বিভাজন ও সংঘাতকে আরও তীব্র করে। বিরোধী মতকে দমন করার আহ্বান নয়; বরং বিরোধী মতকে গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে সম্মান করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হোক। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশকে শত্রুতার চোখে নয়, গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে দেখতে হবে। তাদের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত থাকতে পারে, তাদের কর্মসূচির সমালোচনা করা যেতে পারে; কিন্তু তাদের কথা বলার অধিকার, সভা করার অধিকার এবং জনগণের কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার অধিকারকে সম্মান করতে হবে। কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য মতের অভিন্নতায় নয়; মতের ভিন্নতার মধ্যেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে।

মনে রাখতে হবে, বিরোধী দল কোনো শত্রুপক্ষ নয়; তারাও জনগণেরই একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। আজ যারা সরকারে, আগামীকাল তারা বিরোধী দলে থাকতে পারে। আবার আজ যারা বিরোধী দলে, জনগণের রায়ে আগামীকাল তারাই সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেতে পারে। এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চক্র। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের একটি চিরন্তন শিক্ষা দিয়েছে-ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, জনগণের রায়ই চূড়ান্ত। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান ক্ষমতাকে আঁকড়ে থাকার রাজনীতি নয়, জনগণের আস্থা অর্জনের রাজনীতি করুন। প্রতিপক্ষকে রুখে দেওয়ার রাজনীতি নয়, প্রতিপক্ষের কথা শোনার রাজনীতি করুন। বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্য, সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ এবং প্রতিহিংসার পরিবর্তে সহনশীলতাকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি করুন।

বাংলাদেশের মানুষ অনেক রক্ত দিয়েছে, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। তারা এমন একটি দেশ চায়, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশের জন্য কাউকে ভয় পেতে হবে না, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে হয়রানির শিকার হতে হবে না এবং ক্ষমতার পরিবর্তন হবে জনগণের ভোটে সংঘাতের মাধ্যমে নয়। বাংলাদেশের সামনে আজ যে সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে, তাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাজনৈতিক সহাবস্থান, পরমতসহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার কোনো বিকল্প নেই। শেষ পর্যন্ত রাজনীতির শক্তি প্রতিপক্ষকে রুখে দেওয়ায় নয়-জনগণের আস্থা অর্জনে। আর সেই কারণেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে মনে রাখতে হবে-ক্ষমতা জনগণের জন্য; জনগণ ক্ষমতার জন্য নয়। রুখে দেওয়ার রাজনীতি সংঘাতকেই উসকে দেয়; আর সহাবস্থানের রাজনীতিই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।

লেখক : রাজনীতিক।