ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করার পর যে নতুন আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিলো মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তা রীতিমত হরিষে-বিষাদে পরিণত হতে চলেছে। ফলে দেশ ও জাতি আবরো সংকটের মুখোমুখি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জাতীয় ঐক্যমত অপরিহার্য হলেও এক্ষেত্রে আশাবাদী হওয়ার মত লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। চলমান রাজনীতি নেতিবাচক বৃত্ত থেকে কোন ভাবেই বেরিয়ে আসতে পারছে না। মূলত, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় বাস্তবতা, প্রতিবেশী দেশ ভারতে উগ্রবাদের লাগামীন উত্থান আমাদের জাতীয় রাজনীতি এক জটিল সমীকরণে মুখে ঠেলে দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পশ্চিমাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় চীনের শক্ত অবস্থান পুরো পরিস্থিতিকে সমস্যাসঙ্কুল করে তুলেছে। একই সাথে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে সরকার এবং বিরোধী পক্ষের বিপরীতমুখী অবস্থান সার্বিক পরিস্থিতিকে আরো জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে সরকার পক্ষের পয়েন্ট অব নো রিটার্নে অবস্থান আমাদের জন্য মোটেই কোন শুভ লক্ষণ নয়।

ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, অনিয়ন্ত্রিত বেকারত্ব, ভঙ্গুর অর্থনীতি, বর্ধিত জনসংখ্যার চাপ, রাজনৈতিক সংঘাত-সঙ্কট পুরো পরিস্থিতিকে আরো সমস্যাসঙ্কুল করে তুলেছে। পতিত স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের অপশাসন-দুঃশাসনে পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে প্রায় ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। দলীয়করণ, আত্মীয়করণ ও পারিবারিকীকরণ করা হয়েছে রাষ্ট্রের সকল সেক্টর। ফলে স্বৈরাচারের প্রায় ১৬ বছর দেশে কোন সুশাসন ছিলো না বরং দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিলো। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে পরিণত করা হয়েছিলো সরকার দলের অঙ্গ প্রতিষ্ঠানে। দুর্নীতি দমন কমিশন রূপ নিয়েছিলো বিরোধী দল দমন কমিশনে। দেশের নির্বাচনগুলো পরিণত করা হয়েছিলো রীতিমত প্রহসনে। ফলে গণতন্ত্রের পরিবর্তে অঘোষিতভাবে কায়েম হয়েছিলো পরিবারতন্ত্র। এমন বাস্তবতায় একটা পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠেছিলো। তা সাধিত হয়েছিলো ছাত্র-জনতার যুগপৎ জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে। এ বিপ্লবের ফলাফল স্থায়িত্ব দিয়ে দেশে সাংবিধানিক ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের অপরিহার্যতা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু উপর্যুপরি রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে আমরা এক্ষেত্রে সফল হতে পারিনি বরং ব্যর্থতা আমাদেরকে অক্টোপাশের মত চেপে ধরেছে।

রাজনীতিতে জাতীয় ঐক্যের আকাক্সক্ষা, চিন্তা ও স্লোগান নতুন কিছু নয় বরং এটি একটি বহুল চর্চিত ও আলোচিত বিষয়। বস্তুত, আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘জাতীয় ঐক্য’ এমন এক শব্দ, যা প্রায় প্রত্যেক যুগে ও সকল রাজনৈতিক সঙ্কটের সময়ে বারবার উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু নেতিবাচক ও স্বার্থান্ধ রাজনীতির বৃত্তে আমাদের সে স্বপ্ন বরাবরই অধরা ও অপূর্ণই থেকে গেছে। কোন রাজনৈতিক সংগঠন বা শক্তি জাতীয় ঐক্যের তাগিদকে কোন ভাবেই পাশ কাটাতে পারে না। তবে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে আন্তরিকতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলেই বারবার প্রতীয়মান হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবেচেয়ে বড় অন্তরায় হলো দেশ ও জাতীয় স্বার্থের বিপরীতে দল, গোষ্ঠী, ব্যক্তি ও পরিবারপ্রীতি। একই সাথে অবৈধ রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষও এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায় বলে মনে করে রাজনৈতিক বোদ্ধামহল। সঙ্গত কারণেই জাতীয় ঐক্যমতের ধারণাটি শুধু মাত্র বক্তৃতার মঞ্চ, রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণা কিংবা টকশোর আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ রয়েছে। তা কখনোই আলোর মুখ দেখেনি বরং ঐক্যের পরিবর্তে বিভেদকেই আমরা বেছে নিয়েছি। একই সাথে আত্মপুঁজা ও দলান্ধতাকে নিজেদের অত্যাবশ্যকীয় কর্মে পরিণত করেছি। যা আমাদের জাতিস্বত্ত্বার ভিত্তিমূলকেই দুর্বল ও ভঙ্গুর করে দিয়েছে।

পৃথিবীতে সকল বড় বড় অর্জনই এসেছে জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে। আর এ ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সামনে থেকে কাউকে কাণ্ডারীর ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। একথা কারো অজানা নয় যে, পৃথিবীর ইতিহাসে যত বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, তার প্রায় সবই কোনো না কোনো জাতীয় নেতার আহ্বানে সংঘটিত হয়েছে। যেমন ১৯৭৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানের ইসলামি বিপ্লব হয়েছিলো। বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে একটি গণভোটের মাধ্যমে ইরানকে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং আয়াতুল্লাহ খোমেনি দেশের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। কিন্তু একমাত্র জুলাই বিপ্লবই এর ব্যতিক্রম।

কিউবার ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে বিপ্লবী বাহিনী ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি রাজধানী হাভানায় প্রবেশ করে এবং কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবা সরকারের পতন নিশ্চিত হয়। ১ জানুয়ারি কিউবার বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয়ের দিন হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার বিপ্লব ছিল এক অভূতপূর্ব ও অবিশ্বাস্য ঘটনা-একটি জাতীয় নেতাহীন বিপ্লব, যা নিজস্ব শক্তিতে সফলতা অর্জন করেছে। এ ঐতিহাসিক বিজয়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী ও মাফিয়াতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে জাতি মুক্তি লাভ করলেও এখনো জাতির কাক্সিক্ষত স্বপ্ন পূর্ণ বাস্তবতায় রূপ নিতে পারছে না। যা আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা।

মূলত, জাতীয় ঐক্য হলো একটি দেশের সকল নাগরিকের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, ভাষা, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে একতা, সংহতি ও ভ্রাতৃত্বের গভীর অনুভূতি। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী দুঃশাসনের অবসান ঘটেছিল এক ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে, যে বিপ্লব বিশ্ব ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থান পেয়েছে। এটি ছিল এমন এক ঐতিহাসিক ও কালজয়ী বিপ্লব, যার ফলশ্রুতিতে জাতীয় সংসদের ৩শ’ জন সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, সচিব, উপসচিব ও বিচারক থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, দলীয় নেতা, এমনকি জাতীয় মসজিদের খতিব ও বিভিন্ন এলাকার জনপ্রতিনিধি পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালিয়েছে নিজেদের অপকর্মের জন্য। যা বৈশ্বিক রাজনীতিতে কালেভদ্রেও দেখা যায় না।

অবশ্য ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লব নিছক একটি শাসনব্যবস্থার পতন নয়, বরং জাতীয় ঐক্যের শক্তি ও জনগণের অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য প্রমাণ হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছে এবং থাকবে। কিন্তু একশ্রেণির রাজনীতিকের ধারাবাহিক ব্যর্থতা ও ক্ষমতা প্রেমের কারণে ম্লান, রূপ, রস ও গন্ধহীন হতে চলেছে আমাদের এ জাতীয় অর্জন।

একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, জুলাই বিপ্লবের পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে ছাত্র সমন্বয়কদের প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রপতি, সংবিধান, পরিবর্তন করে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের জোরালো প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বিভেদ ও মহল বিশেষের খামখেয়ালীপনার কারণেই তা বাস্তবতার মুখ দেখেনি। মূলত, রাজনৈতিক সকল পক্ষই জুলাই সনদে স্বতোঃপ্রণোদিত হয়ে স্বাক্ষর করলেও শ্রেণি বিশেষের হীন ও নেতিবাচক মনোবৃত্তির কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না বরং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটকেও অসাংবিধানিক বলা হচ্ছে। যা উপর দিকে থুথু দেয়ার মতই চরম আত্মঘাতি। কারণ, গণভোট অধ্যাদেশ অবৈধ হলে সরকারসহ পুরো সংসদই অবৈধ হয়ে পড়বে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে জুলাই সনদ, রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম মতপার্থক্য এবং জাতীয় ঐক্য বিনষ্টের চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে। যা জুলাই চেতনার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং আমাদের জাতীয় আত্মপ্রতারণার দলিল।

আমাদের জাতীয় ঐক্য বিনষ্টের অনেক কারণের মধ্যে প্রধান হচ্ছে একশ্রেণির রাজনীতিকের অতিমাত্রায় ক্ষমতালিপ্সা এবং ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার হীনমানসিকতা। শ্রেণি বিশেষের ক্ষমতাকেন্দ্রীক রাজনীতির কারণেই বিফলে যেতে চলছে আমাদের জাতীয় জীবনের সকল বড় বড় আর্জন। ফলে স্বাধীনতার সুফলগুলোও অনেক ক্ষেত্রে আমাদের কাছে অধরাই থেকে যাচ্ছে। সকল রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে ‘জাতীয় স্বার্থ’ বা ‘জনগণের ঐক্য’র কথা বলা হলেও এদের কারো কারো অবস্থান এবং কার্যকলাপ অনেক ক্ষেত্রেই শুধু স্ববিরোধীই নয় বরং জাতীয় স্বার্থ বিরোধীও। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক বা আদর্শিকভাবে মোকাবেলা না করে জান-প্রাণের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা, মতভেদকে বিশ্বাসঘাতকতা এবং জনগণকে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিভক্ত করা-এসবই জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্রে পর্বতপ্রমাণ অন্তরায়।

২০২৪-এর ছাত্র-জনতার যুগপৎ আন্দোলন নতুন এক ঐক্যের বার্তা দিলেও দলীয় সংকীর্ণতার জন্যই এমন কিছু করা হচ্ছে যা জুলাই চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক। তারা জুলাই বিপ্লবের বেনিফিসিয়ারী হলেও তা স্বীকার করতে চান না। ফলে জুলাই চেতনা ধারণ করে যেখানে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে তা রাজনীতির নেতিবাচক জালে আটকে পড়েছে।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে সামাজিক ঐক্যের ঘাটতির কথা উল্লেখ করার মত। জাতীয় ঐক্য কেবল রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত ঐক্যের ওপরও নির্ভর করে। সমাজে বিভাজন; ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম, শিক্ষাবঞ্চিত ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিতদের মধ্যে দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে। একশ্রেণির মানুষ রাষ্ট্রের সুবিধাভোগী, অন্য শ্রেণি বঞ্চনা ও অবহেলার শিকার। এমন বৈষম্যের মধ্যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের আহ্বান শুধু বেমানানই নয় বরং শূন্যে প্রাসাদ নির্মাণের কল্পনাবিলাসই বলা যায়। তাই জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার ধারণাকে মজবুত ভিত্তি দিতে হলে বৈষম্য দূর সহ সকল ক্ষেত্রে ন্যায় ও ইনসাফ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আমাদের তেমন কোন অর্জন নেই।

এক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো দেশ স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদ মুক্ত হলেও রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে ঘাপটি মেরে রয়েছে মাফিয়াতন্ত্রীদের প্রতিভূরা। এরাই জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায় ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। প্রশাসনের নানা স্তর ও রন্ধ্রে রন্ধ্রে তারা অত্যন্ত কৌশল ও যত্নসহকারে বিপ্লবের চেতনাকে দমন ও নিবৃত্ত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং এসব ক্ষেত্রে তারা সফলতাও পাচ্ছে। বিদেশি হস্তক্ষেপ-বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে-বিভিন্ন ক্ষেত্রে কলকাঠি নাড়া হচ্ছে। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ-বিরোধী অপপ্রচার’ এবং ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রত্যক্ষ ওপরোক্ষ হস্তক্ষেপ’ বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। বিশেষ করে ভারতের পশ্চিম বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় আসায় সার্বিক পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। মূলত, পলাতক বিগত সরকারের কিছু মন্ত্রী ও নেতারা পূর্বে পাচার করা বিপুল অর্থের জোরে কলকাতা ও আশপাশের রাজ্যগুলোতে অবস্থান নিয়ে বারবার জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট ও দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর সে ফাঁদেই পা দিচ্ছেন আমাদের দেশের ক্ষমতাসীনরা।

বিপ্লব-উত্তর বাংলাদেশে ‘জাতীয় ঐক্য’ এখন শুধু একটি রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়-এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, স্থিতি ও ভবিষ্যৎ অগ্রগতি টিকিয়ে রাখার অপরিহার্য শর্তে পরিণত হয়েছে। এখন রাষ্ট্র যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে-প্রশাসনিক অনৈতিকতা, সামাজিক বিভাজন, ধর্মীয় মেরুকরণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও নৈতিক অবক্ষয়-সেগুলো মোকাবিলায় কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে একা লড়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সর্বজনীন ঐক্য, যা মতাদর্শ নয়, আদর্শের ভিত্তিতে দাঁড়াবে। নেতৃত্বকে বুঝতে হবে, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাই রাজনীতির লক্ষ্য নয়; বরং জনগণের আস্থা অর্জনই টেকসই রাজনীতির ভিত্তি।

যদি জাতীয় নেতৃত্ব, রাজনৈতিক দল ও জনগণ একসঙ্গে এ নৈতিক ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, তবে আমরা আমাদের হারানো আস্থা, আত্মমর্যাদা ও ন্যায়ের পথ ফিরে পাবো। কিন্তু যদি বিভাজনের রাজনীতি, অবিশ্বাস ও স্বার্থপরতার সংস্কৃতি চলতে থাকে, তাহলে ‘জাতীয় ঐক্য’ শব্দটি রয়ে যাবে কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতার অলংকার হিসেবে। আর জাতি ধীরে ধীরে নিমজ্জিত হবে বিভাজনের অন্ধকারে; যেখানে রাষ্ট্র থাকবে অস্তিত্ব সংকটে আর জনগণ থাকবে দিকহারা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অপেক্ষায়। যা অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত।

মূলত, বৈশ্বিক রাজনীতি, আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট এবং বৃহৎ প্রতিবেশীর বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক অবস্থান ও সে দেশের উগ্রবাদী অপতৎপরতার বিপরীতে আমাদের জন্য রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা একান্তভাবে অপরিহার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। জাতিকে বহুধাবিভক্তি ও অনৈক্যের বৃত্তে রেখে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা কোন সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়। এ ঐক্যের ভিত্তি হবে জুলাই সনদ অবিকৃতভাবে অনতিবিলম্বে পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন। মূলত, জুলাই সনদকে উপেক্ষা করে জাতিকে কোনভাবেই ঐক্যবদ্ধ করা যাবে না। বিষয়টি সরকার সহ সংশ্লিষ্টরা যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করবে ততই মঙ্গল।

www.syedmasud.com