মুহাম্মদ খায়রুল বাশার
ভারতের নতুন সংসদ ভবনে একটি ম্যুরাল প্রদর্শন করা হয়েছে। যেটাতে অখণ্ড ভারতের স্বপ্নকে তুলে ধরা হয়েছে। দেশটি পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং নেপালকে একীভূত করে ‘অখণ্ড ভারত’-এর স্বপ্ন দেখে। আসলে অখণ্ড ভারতের ধারণাটি জার্মানির নাৎসি দর্শনের ‘লেবেনস্রাউম’ বা বসবাসের স্থান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নেয়া হয়েছে। আর এস এস’র দর্শন অনুসারে হিমালয়ের দক্ষিণে এবং ভারত মহাসাগরের উত্তরেই ভারত অবস্থিত। আমরা জানি, সব প্রতিবেশীর সাথেই ভারতের সীমান্ত বিরোধ রয়েছে এবং আধিপত্যবাদী পরিকল্পনা ও মনোভাবের কারণে কারো সাথেই তাদের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক নেই।
তথাকথিত গ্রেটার ইসরাইল প্রতিষ্ঠার জন্যই বর্তমানে গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালানো অব্যাহত রাখা হয়েছে। ইহুদিদের এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইরানে অন্যায়ভাবে নজিরবিহীন যুদ্ধ এবং লেবাননে হামলা চালাচ্ছে। ইসরাইলের অকৃত্রিম বন্ধু নরেন্দ্র মোদী ও বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ গোটা উপমহাদেশ দখল করে অখণ্ড ভারত তথা উগ্র হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছেন। ভারতের এই স্বপ্ন কি সফল হবে নাকি এই অপরিণামদর্শী কল্পনা বিলাসের জন্য তাদেরকে বড় ধরনের মূল্য দিতে হবে?
আরব বণিকরা ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। ভারতের পশ্চিম উপকূলে তারা ইসলামের আলো মানুষের মাঝে প্রচার করেছিলেন। ভারতের বিখ্যাত লেখক খুশবন্দ সিং তার ‘ইন্ডিয়া : অ্যান ইন্ট্রোডাকশন’ বইতে লিখেছেন, হিন্দুরা তাদের কন্যাদের আরবদের সাথে বিয়ে দিতো, ফলে পশ্চিম উপকূলে মুসলিম উপনিবেশ গড়ে ওঠে। ১০০০ খ্রিস্টাব্দে গজনীর সুলতান মাহমুদ যিনি ছিলেন একজন তুর্কিÑ তিনি ভারতে ১৭টি অভিযান পরিচালনা করেন এবং তার পরে আসেন আরেক তুর্কি মোহাম্মদ ঘোরি যিনি তরাইনের যুদ্ধে পৃথ্বিরাজকে পরাজিত করে ১১৯২ সালে দাস রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত মুসলিমরা উপমহাদেশ শাসন করেছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশরা এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। খুশবন্ত সিং-এর মতে, তুর্কি, মোঙ্গল, আফগান এবং পারস্যের সৈন্যরা তাদের হিন্দু প্রতিপক্ষের চেয়ে আকারে বড়, শক্তিশালী এবং অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল।
ব্রিটিশ শাসনামলে আর্যসমাজ নামে একটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯২৫ সালে হেডগেওয়ার নাগপুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) প্রতিষ্ঠান করেন। আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা হেডগেওয়ার এবং সাভারকর হিটলার ও মুসলিনির বড় ভক্ত ছিলেন। তাই আরএসএস এবং নাৎসি জার্মানির মধ্যে শতভাগ মিল রয়েছে। আরএসএস গঠনের মূল কারণ ছিল তারা হাজার বছরের মুসলিম শাসনে সন্তুষ্ট ছিল না। ১৯২৮ সালে আরএসএসের রাজনৈতিক শাখা ভারতীয় জনসংঘ বিজেপিতে রূপান্তরিত হয়।
তথাকথিত অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন থেকেই বিজেপি সব প্রতিবেশী দেশকে নিজেদের করায়ত্ত অথবা নতজানু করার প্রয়াস চালায়। তারই অংশ হিসেবে ‘র’ এর সুনিপুণ পরিকল্পনায় ৭৫ পরবর্তীতে ভারত থেকে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে আগমন, ৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়ার নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে ১/১১ এর মাধ্যমে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা গ্রহণ, বিডিআর বিদ্রোহের ছদ্মাবরণে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর অফিসারদের হত্যা, ভোটারবিহীন নির্বাচন, গুম, খুন, আয়নাঘর প্রতিষ্ঠা করে দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতা দখল করে ভারতের প্রেসক্রিপশনে দেশ পরিচালনা করা হয়। বিজেপি ক্ষমতায় আসার দিন থেকেই ভারতজুড়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, বিদ্বেষ সৃষ্টি এবং গণপিটুনির মাধ্যমে হত্যা ও নির্যাতন বেড়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী মোদিসহ বিজেপি/আরএসএস নেতা ও মন্ত্রীরা প্রায়ই মুসলমানদের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশকারী, উইপোকা এবং বহু সন্তানের জনকের মতো অপমানজনক ও অবমাননাকর মন্তব্য ব্যবহার করেন। ২০০২ সালে মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন সেখানে মুসলমানদের ওপর একটি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। তিনি এ বিষয়ে চোখ বন্ধ করেছিলেন এবং তার সরকার হিন্দুদের মব সৃষ্টি করে মুসলমানদের হত্যা করতে সহায়তা করেছিল। বিজেপি-আরএসএস সরকারের ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) প্রবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের মর্যাদা কমিয়ে অবৈধ অভিবাসীতে পরিণত করা। এর ফলে ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয় এবং হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়।
ভারতের পাঞ্জাবে স্বর্ণমন্দির ও তার আশপাশে ‘অপারেশন ব্লুস্টার চলাকালে বিশ হাজার শিখকে হত্যা করা হয়েছিল। শিখ দেহরক্ষীদের হাতে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড ভারতজুড়ে সবচেয়ে ভয়াবহ শিখ গণহত্যার জন্ম দেয়। তখন আড়াইহাজার শিখকে হত্যা করা হয়েছিল। নতুন খালিস্তান আন্দোলনের নেতা অমৃত লালসহ ৫২ হাজার মানুষকে কারাগারে বন্দী করা হয়েছে।
মনিপুরে, ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর মদদে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেইরা খ্রিষ্টানদের (কুকি) ওপর গণহত্যা চালায়। এখনো সেখানে সংখ্যালঘুদের ওপর হিন্দুদের বর্বরতা অব্যাহত রয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যেই স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম চলছে। তারা নিজেদেরকে মঙ্গোলিয়েড হিসেবে মূলভূখণ্ড থেকে আলাদা মনে করে এবং হিন্দু বর্ণ প্রথায় তাদেরকে অস্পৃশ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই অঞ্চলটি সবচেয়ে অস্থিতিশীল, সেখানে ১২০টিরও বেশি উগ্রবাদী গ্রুপ সক্রিয় এবং কেবল আসামেই ৩৬টি উগ্রবাদী গোষ্ঠী তৎপর রয়েছে।
নকশালীরা তাদের নিজস্ব মাওবাদী সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মধ্যভারত নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ১৩টি রাজ্যের ওপর তাদের প্রভাব রয়েছে এবং ৯২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে তাদের প্রভাব বিস্তৃত রয়েছে। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং নকশালীদের ভারতের এক নম্বর অভ্যন্তরীণ হুমকি বলে উল্লেখ করেছিলেন। দলিত তথা নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ভারতে অত্যন্ত দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। তারা চাকর বাকরের মতো মর্যাদাহানিকর কাজ করে জীবনধারন করছে। তারা হিন্দু মন্দিরে প্রবেশ করতে পারে না, গ্রামের কুপের জল থেকে তাদের জল আনা নিষিদ্ধ এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সাথে তাদের একই ঘরে খাবার গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। অব্যাহত অত্যাচার নির্যাতনের কারণে দলিতরা ইসলাম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে। ভারতীয় সমাজ জাতিভেদ প্রথায় বিশ্বাস করে। মোট জনসংখ্যার পাঁচশতাংশ ব্রাহ্মণরা গোটা ভারত নিয়ন্ত্রণ করে। এরপর রয়েছে ক্ষৈত্রীয় এবং বৈষ্ণবরা। জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও সেখানে শূদ্রদের (দলিত) কোন স্থান নেই।
ভারতের তথাকথিত হুমকির মুখে ফেলা আরেকটি প্রধান সমস্যা হলো উত্তর-দক্ষিণ বিভাজন। ভারতের প্রাচীনতম জাতিগোষ্ঠী হলো আদিবাসী বা প্রথম বসতি স্থাপনকারীরা, যারা উত্তর-পূর্বের আসাম থেকে দক্ষিণের কন্যাকুমারী পর্যন্ত বাস করে। আর্য জাতিগোষ্ঠী উত্তর কেন্দ্রে এবং দ্রাবিড়রা দক্ষিণে বাস করে। দ্রাবিড়দের বিশ্বাস যে তাদের হিন্দুধর্ম উত্তরের হিন্দুধর্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। দ্রাবিড়রা বর্ণ প্রথায় বিশ্বাস করে না এবং তারা ব্রাহ্মণবিরোধী ও হিন্দুত্ববাদের ধারণার বিরোধী। তামিলরা দ্রাবিড়নাড়ুর দাবির পক্ষে, যা একটি স্বাধীন রাজ্যের নাম। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও রাজনীতিবিদ চন্দ্রবাবু নাইড়ু, বিজেপি/আরএসএসের আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য দক্ষিণের রাজ্যগুলোর একটি ফেডারেশন গঠনের দাবি জানিয়ে ছিলেন।
জম্মু ও কাশ্মির হচ্ছে একটি অত্যন্ত সামরিকায়িত অঞ্চল। কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী মুসলমানরা কাশ্মিরকে স্বাধীন করার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদও কাশ্মিরে গণভোট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী সেখানকার ভাগ্যনির্ধারণের জন্য প্রস্তাব পাস করেছিল। কিন্তু ভারত গায়ের জোরে জম্মু ও কাশ্মিরকে নিজেদের দখলে রেখেছে। জম্মু ও কাশ্মীরই ভারত শাসিত অঞ্চল যেখানে বেসামরিক নাগরিকদের তুলনায় বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ছয়জন কাশ্মিরির জন্য একজন সৈন্য। মজার বিষয় হলো জুম্মু ও কাশ্মীরে ৩০ হাজার কাশ্মীরীর জন্য মাত্র একজন ডাক্তার রয়েছেন। ভারতীয় দখলদার বাহিনী সেখানে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। তারা সেখানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড প্রদান, ধর্ষণ, নির্যাতন এবং নিরস্ত্র কাশ্মিরিদের ওপর নির্বিচারে গুলিচালিয়ে তাদের হত্যা করছে।
ভারতের পররাষ্ট্রনীতি দুই হাজার চারশত বছর আগে লিখিত চানক্য কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রী গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। কৌটিল্যের মান্দালাতত্ত্ব অনুসারে, অবশ্যই শত্রুর কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে আক্রমণ করতে হবে। তিনি শত্রুর শক্তঘাঁটির পরিবর্তে তার দুর্বলস্থানে অবস্থিত জায়গায় আক্রমণ করার পরামর্শ দেন। মার্কই হকের পরে ভারতীয় পররাষ্ট্র দফতর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝাতে এবং ভারতের শত্রু রাষ্ট্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় সম্মান বিক্রি করতে কূটনীতিক, থিংকট্যাংক এবং রাজনীতিবিদদের বাঁচিয়েছিল।
তাদের উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানকে বিশ্ব সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন করার, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা নিজেরাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবন্ধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে বিশ্ব দরবারে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।
বর্তমানে ভারত দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মধ্যভারতে নকশালবিদ্রোহ, অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মির এবং খালিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যভাবে শাসন ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আইনের শাসন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দিল্লি, গুজরাট, অমৃতসর এবং মনিপুরের মত জায়গায় হিন্দু চরমপপন্থীরা মব সৃষ্টি করে মুসলিম, খ্রিষ্টান, শিখ এবং দলিতদের লক্ষ্য করে হামলা, গণপিটুনিসহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটাচ্ছে।
যদি নিপীড়িত সম্প্রদায় মুসলিম, শিখ, খ্রিষ্টান এবং দলিতদের ওপর হত্যা, গণপিটুনি, গণহত্যা, ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি অবলীলায় চলতে থাকেÑ যদি এসব অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ করা না হয় তা হলে ভারতের জন্য এর ভবিষ্যৎ পরিণতি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে এবং সীমালংঘন ও বাড়াবাড়ির কারণে ওইসব অঞ্চলের নির্যাতিত মানুষ জেগে ওঠে তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও স্বাধীনতা আন্দোলন জোরদার করলে ভারত শেষ পর্যন্ত খণ্ড খণ্ড হয়ে বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে বলে পর্যবেক্ষক মহল আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
লেখক : সাংবাদিক।