২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক এক গণঅভ্যুত্থান বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি গতিপথ, চূর্ণ করে দিয়েছিল ফ্যাসিবাদী ক্ষমতার দেমাগ ও অহংকার। সেই রক্তঝরা অভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও জনমনে স্বস্তির দেখা মেলেনি। চারপাশের বাতাসে যেন এক অজানা শূন্যতা আর দীর্ঘশ্বাস ঘুরে বেড়ায়। অথচ সেদিন একটিমাত্র মহৎ আদর্শকে বুকে ধারণ করে রাজপথে নেমে এসেছিল সর্বস্তরের মানুষÑ স্বপ্ন একটাই ছিল, একটি শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও ফ্যাসিবাদবিরোধী বাংলাদেশ। কিন্তু ফ্যাসিবাদের পতনের পরও কি ঘুচেছে আমাদের দুঃখ? প্রতিদিনের শত হাজার সমস্যা যেন নাগরিক জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। বিশেষ করে নতুন সরকার ক্ষমতা নেওয়ার মাত্র ৬ মাসের মাথায় তীব্র লোডশেডিং আর গ্যাস সংকট যখন ডালপালা মেলল, তখন এক বুক আশা নিয়ে বেঁচে থাকা সাধারণ মানুষের কষ্ট চরমে পৌঁছাল। রান্নার চুল্লিতে আগুন না জ¦ললে বড়রা হয়ত কোনমতে কষ্ট সহ্য করে দিন পার করতে পারে, কিন্তু অবুঝ শিশুর আর্তনাদ কী দিয়ে থামাবে? ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটলেও আমাদের সেই কাক্সিক্ষত সোনার বাংলা যেন অধরাই রয়ে গেল। ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন কোনো একক দল বা জোটের দয়া কিংবা একক কৃতিত্ব ছিল না। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধীদলগুলো হরতাল অবরোধের মত কর্মসূচী পালন করলেও সফল হতে পারেনি। তৎকালীন প্রধান বিরোধীদল বিএনপি তাদের চেয়ারপারসনের বাসার সামনে থেকে একটি বালুর ট্রাকও সরাতে পারেনি। আওয়ামী জুৎসই ও স্বৈরাচারী এই সময়কালকে অনেকে ইতিহাসের নিকৃষ্টতম জালিমদের ক্ষমতার সাথে তুলনা করেছেন। সেনা-সমর্থিত নীলনকশার মাধ্যমে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তারা বিজয়ী হয়ে এ দেশের গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল। ক্ষমতার মসনদে বসার মাত্র ১ মাস ১৯ দিনের মাথায় ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত হয়েছিল কলঙ্কিত বিডিআর হত্যাকাণ্ড- যেখানে আমরা হারিয়েছিলাম আমাদের ৫৭ জন মেধাবী ও দেশের অতন্দ্র প্রহরী চৌকস সেনা কর্মকর্তাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন, ২০১৮ সালের রাতের ভোট এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের হাস্যকর ও প্রহসনমূলক ‘আমি আর ডামির’ নির্বাচন উপহার দিয়েছিল তারা। ২০৪১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অবৈধভাবে টিকে থাকার নীলনকশা আঁকা হয়েছিল। কিন্তু ছাত্র-জনতা, মেহনতি মানুষ, কুলি-মজুর, ভ্যানচালক, রিকশাচালক থেকে শুরু করে ঠেলাওয়ালা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমন্ডলী, আইনজীবী, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও মা-বোনদের চোখের পানি আর রক্তের বিনিময়ে স্বৈরাচারের মসনদ কেঁপে উঠেছিল। প্রশ্ন জাগে, কেন তাদের এমন পরিণতি হলো? এর উত্তর খুঁজতে দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। গত ১৬ বছর ধরে এই ফ্যাসিস্ট সরকারের নিপীড়ন, খুন, গুম আর জুলুম চরম পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল। মানুষ এতটাই ঘৃণায় বর্বরোচিত হয়ে পড়েছিল যে, একে অপরকে ধিক্কার দিয়ে বলত- তুই মানুষ নাকি আওয়ামী লীগ!
ক্ষমতা যে চিরস্থায়ী নয়, তা শাসকরা মসনদে থাকাকালীন বুঝতে চায় না; আর এর চড়া মূল্য দিতে হয় জাতিকে। এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী ভাবার এই অন্ধ অহংকার একসময় যেকোনো স্বৈরাচারকেই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে। ফিলিপাইনের দীর্ঘ ২১ বছরের একনায়ক ফার্দিনান্দ মার্কোস কিংবা ইন্দোনেশিয়ার তিন দশকব্যাপী দমনপীড়ন চালানো সুহার্তোর পতন তার জ¦লন্ত প্রমাণ। ১৯৭২ সালে সামরিক আইন জারি করা মার্কোস ১৯৮৬ সালের ‘পিপল পাওয়ার’ বা গণঅভ্যুত্থানে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন, আর ১৯৯৮ সালে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও ছাত্র -জনতার আন্দোলনের মুখে সুহার্তোও ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। এমনকি নিকট অতীতেও আমরা দেখেছি, রাজাপাকসের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কার কলম্বোর ‘গল ফেস গ্রিন’ তরুণদের সেই ঐতিহাসিক অহিংস প্রতিরোধ, যা শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসেকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল। ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া কিংবা শ্রীলঙ্কা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান- প্রতিটি ঘটনা আমাদের একটি চিরন্তন সত্যকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ফ্যাসিবাদের রক্তচক্ষু আর দমনপীড়ন যতই ভয়াবহ হোক না কেন, জনতার অধিকার আদায় ও মুক্তির বাঁধভাঙা জোয়ারের সামনে কোনো একনায়কই টিকতে পারে না!
শহীদ আবু সাঈদের সেই অগ্নিঝরা উচ্চারণ- ‘‘মনের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতে দিয়েছি, গুলি কর’’ আজও আমাদের বুক কাঁপিয়ে দেয়, মনের অজান্তে চোখ ভিজে ওঠে। এই রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। স্বৈরাচার পালানোর পরও ক্লান্ত ছাত্র সমাজ ঘরে বসে থাকেনি; বরং নিজেদের কাঁধে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও শহর পরিচ্ছন্নতার ভার তুলে নিয়ে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। শাহবাগের ধূলিমলিন সড়কে শিক্ষার্থীদের প্ল্যাকার্ড হাতে ট্রাফিক সামলানোর সেই দৃশ্য আজও আমাদের অফুরন্ত প্রেরণা জোগায়। এই বিজয়ের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। সবাই চেয়েছিল একটু বুকভরে শ্বাস নেওয়ার মতো একটি স্বাধীন দেশ-যেখানে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ভোট ডাকাতি আর ব্যাংক লুটের কোনো ঠাঁই থাকবে না। পুলিশ ও র্যাবকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে নৃশংস মারণাস্ত্র বানানো হয়েছিল, তা সংবাদপত্রের পাতায় আজো জীবন্ত। ১৮ বছরের তাজা প্রাণ থেকে ৬ বছরের নিষ্পাপ শিশুর শরীরে বিদ্ধ শত শত গুলি ও বুলেট আজও আমাদের তাড়া করে বেড়ায়। সেদিনের সেই বিভীষিকাময় স্মৃতিগুলো হৃদয়ের ক্যানভাসে আজো রক্তক্ষরণ ঘটায়- উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সামনে এক পুলিশ সদস্যের বুকফাটা আর্তনাদ ‘‘স্যার, একজনকে মারতে কয়টা গুলি লাগে? আমার সোনারটুকরা সন্তানকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে স্যার।’’ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালকে ভিডিও দেখিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছিলেন- ‘‘স্যার, গুলি খেয়ে পড়ে যায়, কিন্তু তার জায়গায় অন্যরা এসে দাঁড়িয়ে যায়, কেউ পালায় না স্যার।’’ মুগ্ধর অন্তিম আকুতি-পানি লাগবে, পানি লাগবে ভাই’’ কিংবা শহীদ আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানোর দৃশ্য এদেশের মানুষের হৃদয় থেকে কোনোদিন মুছে যাওয়ার নয়।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটলেও সাম্য ও মানবিক মর্যাদার সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আজও শেষ হয়নি। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরলেও ফ্যাসিবাদের দোসররা আজও অন্ধকারের গভীরে নানা ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। একটি মহল সুকৌশলে ‘জুলাই সনদ’ ও অভ্যুত্থানের চেনতাকে খাটো করার জঘন্য অপচেষ্টায় ব্যস্ত। অথচ তারা বেমালুম ভুলে যায়, এদেশের কিশোর তরুণদের রক্তমাখা হাতই ৩৬ জুলাই ঘটিয়ে আমাদের এই মুক্তির পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। ৫ আগস্ট বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী কান্নাকণ্ঠে স্বীকার করেছিলেন- ‘‘তরুণরাই আমাদের নরক থেকে উদ্ধার করেছে।’’ অথচ আজ সেই তরুণ ও সাধারণ মানুষের অবদানকে কেউ কেউ অস্বীকার করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছেন। যারা জুলাইয়ের স্পিরিট ধারণ করতে পারেননি, তাঁরা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূসকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালিয়েছেন, যার ফলে তাঁর শাসনামলে প্রায় ১৪৩টি নজিরবিহীন ধর্মঘটের মতো ঘটনা ঘটেছে। পতিত ফ্যাসিবাদের দোসররা দেশকে অস্থিতিশীল করতে বহুলাংশ সফল হয়েছে। তাই যেসব রাজনৈতিক নেতা এই অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিতে চান, তাঁদের অতীত কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে পর্যালোচনা করা উচিত।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষপটে জুলাই বিপ্লব ছিল এক অভাবনীয় অধ্যায়। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রধান দলগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত নতুন আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব ও মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্তব্য করেছেন যে, জামায়াতে ইসলামী কোনো গণতান্ত্রিক দল নয়। অথচ গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্যই হলো ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় যে দলগুলো গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ করত, আজ তারা সরকারে গিয়েও একই পদাঙ্ক অনুসরণের পায়তারা করছে। কিন্তু বিরোধীদল যখন প্রতিবাদ করছে, তখন আবার তাদেরকেই একাত্তরের ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। সংসদে বা রাজপথে গঠনমূলক সমালোচনা ও মতপার্থক্য রাজনীতির অলংকার ; কিন্তু যখন তা হিংসাত্মক ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপ নেয়, তখন তা ফ্যাসিবাদের ফিরে আসার পথ সুগম করে দেয়। বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বা এনসিপি-প্রত্যেক দলের নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ থাকতে পারে। কিন্তু জুলাইয়ের রক্তের দাগের প্রতি আনুগত্য রেখে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, তবে তা যেন কোনোভাবেই দেশ ও জাতির বৃহত্তর ঐক্যকে ধ্বংস না করে। দীর্ঘদিন লড়াই সংগ্রামের পর ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন দেশবাসীর হৃদয়ে এক নতুন সূর্যোদয়ের প্রত্যাশা জেগে উঠেছিল। কিন্তু কয়েক মাস পেরোতেই সংবিধান সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর অনৈক্য তৃণমূলে আবার সংঘাত ও সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে এনসিপির কর্মসূচিতে হামলা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার সংঘর্ষ জনমনে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এভাবে চলতে থাকলে জুলাইয়ের মূল স্পিরিট অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে। তাই আজ আত্মোপলব্ধির সময় এসেছে- জুলাই স্পিরিট হারালে কেবল কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট হেরে যাবে না, হেরে যাবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ, হেরে যাবে আমাদের হাজারো শহীদের অমূল্য রক্তে কেনা স্বাধীনতা!