মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট-এসএসসি ছাত্র জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা। এ ব্যাপারে ছাত্রছাত্রীদের সেনসেশসন, ভয়, আতংক থাকে তেমনি থাকে বড় হওয়ার আনন্দ। সে বুঝতে শেখে তার নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে। ফলে এ পরীক্ষার গুরুত্ব অধিক। আগের দিনে অনেক পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়ে পরের বছরের জন্য প্রস্তÍুতি নিত। কিন্তু বদিন হলো সিলোবাস ও পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনায় পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। পরীক্ষার ফল মানেই ছিল সাফল্যের উল্লাস, পাসের হার বৃদ্ধির নতুন রেকর্ড আর জিপিএ-৫ এর ছড়াছড়ি। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে শিক্ষায় কি আসলেই ছাত্রছাত্রীরা ভাল হয়ে উঠেছিল? তা হলে এ ধারায় এ বছর ছন্দ পতন কেন?
পতনের সে ধারা শুরু হয় গত বছর। এবার সে পতনকেও ছাড়িয়ে গেল। এ বছর পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গতবার এ হার ছিল ৬৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে আরও ৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। এর আগে ২০০৭ সালে সর্বনিম্ন পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। মাত্র কয়েক বছর আগেও এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৮০ শতাংশের ওপর। ২০২৪ সালে তা ছিল ৮৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। ২০২১ সালে ছিল রেকর্ড ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যে কথা আগে বলেছি। আগের সঙ্গে তুলনা করলে এবার মোটেই তা মেলানো যাচ্ছে না।
১০ আগস্ট প্রকাশিত ২০২৬ সালের ফলাফলে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। ১৮ লাখের বেশি পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৬ লাখ ৯১ হাজার শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। ২০২৫ সালে গড় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার ও সর্বোচ্চ গ্রেড দুই সূচকেই অবনতি হয়েছে। ফলের এ পতন শুধু একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যান নয়; বরং দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার গতিপথ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এখন এ নিয়ে সর্ব মহলে আলোচনা সমালোচনা। এটা হওয়াই উচিৎ।
কারণ এর কারণ যেমন জানা দরকার তেমনি এর থেকে উত্তরণও দরকার। আমরা উন্নত জাতি বা জনশক্তি গঠন করতে চাইলে ভাল ছাত্রের দরকার, ভাল পাসের হার দরকার। যাতে দেশে কী প্রবাসে তারা নিজেদের কর্মের যোগ্য করে তুলতে পারে। এসএসসি শুধু একটি সনদ অর্জনের পরীক্ষা নয়; উচ্চশিক্ষা, কর্মজীবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ফলে এ পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটলে তা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হওয়া স্বাভাবিক।
শিক্ষাবিদরা সামগ্রিক ফল বিপর্যয়ের একাধিক কারণকে সামনে এনেছেন। তারা মনে করছেন, বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকার শিক্ষার হার ও জিপিএ কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখাত। এ প্রবণতা বন্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি বদলায় অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমান বিএনপি সরকারও এ ধারা অব্যাহত রেখেছে। এটা শিক্ষার জন্য ইতিবাচক বলছেন তারা। তবে আরেকটা কথাও প্রনিধানযোগ্য।
দেশে শিক্ষার মানের কতটুকু উন্নতি এটা বোঝাতে পাসের হারকে বিবেচনা করা হলেও হার যে শিক্ষার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না, তার প্রমাণ এইচএসসির পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা। প্রতি বছর এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করে। অথচ তাদের ১০ থেকে ১২ শতাংশও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাস নম্বর তুলতে পারে না।
এবারের ফলাফলে গণিত ও ইংরেজিতে তুলনামূলক বেশি অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। এটি অবশ্য নতুন কোনো সমস্যা নয়। বছরের পর বছর এ দুটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন হওয়া উচিত সমস্যাটি এত দীর্ঘস্থায়ী কেন? গণিত শেখার ক্ষেত্রে শুধু সূত্র মুখস্থ করানো বা পরীক্ষার আগে কিছু প্রশ্ন অনুশীলন করানো যথেষ্ট নয়। একটি শিশুকে ছোটবেলা থেকেই সংখ্যাবোধ, যুক্তি, বিশ্লেষণ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি করে দিতে হয়। একইভাবে ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রেও শুধু ব্যাকরণের নিয়ম মুখস্থ করালে ভাষাজ্ঞান তৈরি হয় না। পড়া, লেখা, শোনা ও বলার সমন্বিত অনুশীলন দরকার। কিন্তু আমাদের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনাই প্রধান। ফলে শিক্ষার্থী প্রশ্নের ধরন চিনতে শেখে, কিন্তু অনেক সময় বিষয়টি বুঝে শেখে না। পরীক্ষার প্রশ্ন একটু ভিন্ন হলেই তার প্রস্তুতির দুর্বলতা প্রকাশ পায়।
এবারের ফলাফলের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি মানবিক বিভাগের ফল। বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগের মধ্যে ফলাফলে বড় ব্যবধান দেখা গেছে। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের দুর্বল ফল শুধু ওই বিভাগের শিক্ষার্থীদের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মাধ্যমিক শিক্ষার সামগ্রিক ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন তোলে। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের অনেকেই তুলনামূলকভাবে গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বল থাকে। অথচ উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে এগোতে এ দুই বিষয়ের ভিত্তি অপরিহার্য। মানবিক বিভাগকে ‘দুর্বল শিক্ষার্থীদের বিভাগ’ হিসেবে দেখার সামাজিক প্রবণতাও বদলাতে হবে। ইতিহাস, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ভাষা ও সাহিত্য এসব বিষয়ও একটি দক্ষ ও চিন্তাশীল জনশক্তি তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষার অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব ধারায় দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এখানে শিক্ষক সংকট, বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি, অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং ব্যবহারিক শিক্ষার দুর্বলতা থাকলে তার প্রভাব সরাসরি ফলাফলে পড়বে। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে শুধু পরীক্ষায় পাস করানোই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। শিক্ষার্থী যেন বাস্তবে একটি কাজ করতে পারে, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে এবং শ্রমবাজারে প্রবেশের উপযোগী দক্ষতা অর্জন করে সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। মাদরাসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির ভিত্তি শক্তিশালী করা জরুরি।
এবার ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। বিপরীতে ৬৬৯টি প্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস যেমন স্বাভাবিকভাবেই আনন্দের বিষয়, তেমনি কোনো প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস না করা গভীরভাবে তদন্তের দাবি রাখে। সেখানে কি শিক্ষক সংকট ছিল? নিয়মিত ক্লাস হয়নি? শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম ছিল? প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় সমস্যা ছিল? নাকি পরীক্ষার্থীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন? শুধু শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে দায়ী করলে সমাধান হবে না। প্রতিটি শূন্য-পাস প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক একাডেমিক অডিট করা দরকার। একইভাবে দীর্ঘদিন শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষণপদ্ধতিও বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সময় কমে যাওয়ার একটি কারণ হিসেবে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে শিক্ষক-অভিভাবকদের উদ্বেগ রয়েছে। বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে এটিকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মোবাইল ফোন শিক্ষার্থীর জন্য যেমন বিভ্রান্তির উৎস হতে পারে, তেমনি হতে পারে শিক্ষার শক্তিশালী মাধ্যম। সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়; সমস্যা এর ব্যবহারবিধিতে। শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল শৃঙ্খলা শেখাতে হবে। একই সঙ্গে অভিভাবক ও শিক্ষককে নজরদারি ও নির্দেশনার দায়িত্ব নিতে হবে।
কোচিংনির্ভরতাও আরেকটি বিষয়। অনেক শিক্ষার্থী স্কুলের শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে কোচিংকেই মূল শিক্ষার জায়গা হিসেবে বিবেচনা করে। এতে বিদ্যালয়ের পাঠদান দুর্বল হলে তার প্রভাব আরও বাড়ে। শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার মান বাড়ানো গেলে কোচিংনির্ভরতা স্বাভাবিকভাবেই কমবে। ‘কৃত্রিমভাবে ভালো ফল’ অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত দরকার। কারণ অতীতে উন্নতির কথা বলে দেশের ক্ষতি করা হয়েছে। অতীতে ফলাফলে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া বা পাসের হার বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু এ ধরনের গুরুতর অভিযোগকে তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে যাচাই করা দরকার।
প্রথম কাজ হওয়া উচিত একটি পূর্ণাঙ্গ ফলাফল বিশ্লেষণ। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোকে বিষয়ভিত্তিক ফল, বিভাগভিত্তিক ফল, অঞ্চলভিত্তিক ফল এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফল প্রকাশ করতে হবে। বিশেষ করে গণিত ও ইংরেজিতে কেন শিক্ষার্থীরা ব্যর্থ হচ্ছে, তা গবেষণার মাধ্যমে চিহ্নিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য নবম-দশম শ্রেণিতেই ‘রেমিডিয়াল’ বা অতিরিক্ত সহায়ক শিক্ষা চালু করা যেতে পারে। শুধু পরীক্ষার কয়েক মাস আগে প্রস্তুতি নিলে হবে না। সারা বছর ধরে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে তাদের আলাদা সহায়তা দিতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণকে আরও কার্যকর করতে হবে। প্রশিক্ষণ যেন শুধু কাগজে-কলমে না থাকে; শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে কীভাবে পড়াচ্ছেন, শিক্ষার্থীরা কতটা বুঝছে তার ওপরও নজরদারি প্রয়োজন। চতুর্থত, প্রশ্নপত্র এমন হতে হবে যাতে মুখস্থবিদ্যার পাশাপাশি ধারণা, যুক্তি, প্রয়োগ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাই হয়। একই সঙ্গে প্রশ্নের মান এমন হতে হবে, যাতে ভালোভাবে প্রস্তুত একজন শিক্ষার্থী অযথা আতঙ্কিত না হয়।
মনে রাখতে হবে, এসএসসির ফলাফলে টানা অবনতি হলে সেটি অবশ্যই সতর্কসংকেত। ২০২৫ সালে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমে আসা সে সতর্ক সংকেতকে আরও জোরালো করেছে। তাই এবারের ফলকে ব্যর্থতার তালিকায় কোথায় ঘাটতি, কেন ঘাটতি এবং কীভাবে তা পূরণ করা যায় এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময়।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।