বাংলাদেশে বর্ষা মানেই নদীর স্ফীতি, বৃষ্টির উচ্ছ্বাস এবং কোথাও না কোথাও বন্যা। এই ভূখণ্ডের জন্মই হয়েছে নদীর পলিতে। তাই বন্যা বাংলাদেশের জন্য অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি একটি প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা। কিন্তু যে প্রশ্নটি আজ সবচেয়ে বেশি সামনে আসে, তা হলো, প্রতিবছর কেন একই ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটে? কেন প্রতি বর্ষায় হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন হয়, ফসল নষ্ট হয়, সড়ক-সেতু ভেঙে যায়, বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয় এবং প্রাণহানি ঘটে? কেন প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও অবকাঠামোতে অগ্রগতির পরও আমরা একই ধরনের দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি দেখি? সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বৃহত্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিপাতজনিত পরিস্থিতি এই প্রশ্নগুলোই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। এরই মধ্যে ৭টি জেলায় সৃষ্ট বন্যায় ও বর্ষণে ৪৪ জন মানুষের মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমসূত্রে পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে একাধিক স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। বান্দরবানের মাতামুহুরী ও সাঙ্গু, নোয়াখালীর ডাকাতিয়া, হবিগঞ্জের খোয়াই, মৌলভীবাজারের মনু এবং সিলেট অঞ্চলের কুশিয়ারা, সুরমা ও মেঘনার বিভিন্ন অংশে নদীর পানি বিপজ্জনক উচ্চতায় পৌঁছেছে। একই সময়ে তিস্তা ও সোমেশ্বরী নদীর পানিও বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। অর্থাৎ দেশের বিভিন্ন নদী অববাহিকায় একই সঙ্গে প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নজিরবিহীন বৃষ্টিপাত। এই লেখাটি ১২ জুলাই রবিবার বসে যখন লিখছি তখনও ঢাকাতে অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে। আজ সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় শুধু ঢাকাতেই ৯৭ মিলিমিটার অতিভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে গত রাতেই (১২টা থেকে সকাল ৬টা) হয়েছে ৭৬ মিলিমিটার। আগের দিন অর্থাৎ ১১ জুলাই দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল চুয়াডাঙ্গায় ১৪৭ মিলিমিটার এবং তার আগের দিনগুলোতে ফরিদপুর (১৪৪ মি.মি.) ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে (গত মঙ্গলবার সর্বোচ্চ ৪১২ মি.মি.) রেকর্ড বৃষ্টি হয়। বান্দরবান ও লামাতেও একই ধরনের অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরে টানা চার দিন প্রতিদিন ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হওয়া বিরল আবহাওয়াগত ঘটনা। এর ফলে শুধু নদীর পানি বৃদ্ধি নয়, শহরাঞ্চলে রেকর্ড মাত্রার জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি এলাকায় প্রাণঘাতী ভূমিধসের ঘটনাও ঘটেছে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে বন্যা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপের প্রায় ৯৩ শতাংশ পানির উৎস দেশের বাইরে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার বিশাল অংশ ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনে অবস্থিত। ফলে উজানে ভারী বৃষ্টি হলে তার প্রভাব কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশের নদীগুলোতে এসে পড়ে। এর সঙ্গে যদি দেশের অভ্যন্তরে ভারী বর্ষণ যোগ হয়, তাহলে নদীগুলোর ওপর একযোগে চাপ সৃষ্টি হয়। কিন্তু প্রাকৃতিক এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের তৈরি বহু সমস্যা। গত কয়েক দশকে নদীর নাব্য কমেছে, অসংখ্য খাল ও জলাশয় ভরাট হয়েছে, প্রাকৃতিক জলাধার সংকুচিত হয়েছে এবং শহর ও গ্রামে অপরিকল্পিত স্থাপনা গড়ে উঠেছে। যে পানি একসময় বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে ধীরে ধীরে নদীতে ফিরে যেত, এখন সেই পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

ফলে অল্প সময়েই পানি জমে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। চট্টগ্রাম তার বড় উদাহরণ। পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ, প্রাকৃতিক ছড়া ও খাল দখল, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং দ্রুত নগরায়নের ফলে কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিই নগরজীবনকে অচল করে দেয়। একই সঙ্গে পাহাড়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ায় ভূমিধসের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়। আরো কিছু কারণ এবার নতুন করে জানা গেছে। যেমন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে রেললাইন স্থাপনের পর বাড়তি পানি যাতায়াতের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি আটকা পড়ে আছে। আবার প্রভাবশালীদের মাছের ঘের স্থাপনের সুবিধার্থে যত্রতত্র পানির গতিপথ পাল্টানো হয়েছে- যা চলমান সংকটকে আরো তীব্র করেছে। এবারের বন্যায় কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। প্রায় প্রতি বর্ষায় একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। আর এই সমস্যাটি শুধু প্রাকৃতিক নয়; পরিকল্পনা, আইন প্রয়োগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ব্যবস্থাপনাতেও বড়ো ধরনের সংকট রয়েছে।

বাংলাদেশ বহু বছর ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এখন পরিবর্তনটি শুধু ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং একইসঙ্গে নির্মম বাস্তবতা। গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর প্রভাবে উষ্ণ পৃথিবীতে বায়ুমণ্ডল আরও বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে। ফলে যখন বৃষ্টি হয়, তখন তা স্বল্প সময়ে অনেক বেশি পরিমাণে হয়। বিজ্ঞানীরা এটিকে “এক্সট্রিম রেইনফল ইভেন্ট” বা চরম বৃষ্টিপাতের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন। এবারের পরিস্থিতিও অনেকটা তেমন। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় ছিল। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিপুল পরিমাণ আর্দ্রতা নিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে প্রবেশ করে। এই আর্দ্র বায়ু চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ভারতের ত্রিপুরা এবং মিয়ানমারের রাখাইন পর্বতমালায় বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ওরোগ্রাফিক প্রভাবে একই এলাকায় টানা ভারী বৃষ্টিপাত ঘটাচ্ছে। অর্থাৎ এখানে শুধু বর্ষা নয়; বর্ষার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও যুক্ত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে সবখানেই কমবেশি একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ইউরোপে আকস্মিক বন্যা, চীনের রেকর্ড বৃষ্টিপাত কিংবা বিভিন্ন প্রদেশে সৃষ্ট বন্যা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা, সব ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানীরা চরম আবহাওয়ার ঘটনার সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধির কথা বলছেন। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয়।

বাংলাদেশের বন্যার ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৮৮ সালের বন্যা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত করেছিল। ১৯৯৮ সালের বন্যায় দেশের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি এলাকা দীর্ঘ সময় পানির নিচে ছিল। ২০০৪ সালে আবারও বড় বন্যা হয়। ২০১৭ সালে উত্তরাঞ্চল ও হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যা কৃষিখাতে ব্যাপক ক্ষতি করে। ২০২২ সালে সিলেট ও সুনামগঞ্জে আকস্মিক বন্যা কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্যোগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০২৪ সালে ফেনী, কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলে অল্প সময়ে সৃষ্ট বন্যা দেখিয়ে দেয়, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলও এখন নতুন ঝুঁকির মুখে। আর এবারের পরিস্থিতিও ক্রমাগত যেন সেদিকেই অগ্রসর হচ্ছে। প্রতিটি দুর্যোগের পর আমরা ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করি, ত্রাণ বিতরণ করি, পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিই। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই দুর্যোগ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাগুলো পরবর্তীতে এসে বাস্তবায়িত হয়েছে। ফলে একই ধরনের দুর্যোগ ও দুর্ভোগে আমরা বারবার পতিত হচ্ছি।

গত কয়েক দশকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় অবশ্য বাংলাদেশ কিছুটা সফলতা পেয়েছে। বিশেষ করে, গত তিন দশকে আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্র এবং জনসচেতনতার কারণে ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে কমেছে। বন্যার ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন সম্ভব। আমাদের এখন শুধু পূর্বাভাস নয়, পূর্বপ্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। বন্যা পূর্বাভাসকে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবহারযোগ্য তথ্য হিসেবে রূপান্তর করা জরুরি। কোন্ কোন্ ইউনিয়ন প্লাবিত হতে পারে, কোন্ সড়ক ডুবে যেতে পারে, কোথায় আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হবে, কোন হাসপাতাল বিকল্প ব্যবস্থা নেবে, কোথায় আগে ত্রাণ মজুত করতে হবে, এ ধরনের পরিকল্পনাগুলো আগে থেকেই প্রস্তুত করে রাখতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, কার্যকর রাডারের সংখ্যা কমে গেলে ভারী বৃষ্টিপাত পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাস উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি আধুনিক হাইড্রোমেট নেটওয়ার্ক, যেখানে আবহাওয়া রাডার, স্বয়ংক্রিয় বৃষ্টিমাপক যন্ত্র, নদীর রিয়েল-টাইম পানি পর্যবেক্ষণ, স্যাটেলাইট তথ্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস একসঙ্গে কাজ করবে। বর্তমান পৃথিবীতে তথ্যই দুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে বড় শক্তি। এক ঘণ্টা আগে সঠিক তথ্য পেলেও অনেক সময় সহস্র মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, বন্যা ও আবহাওয়ার তথ্য প্রতি ঘণ্টায় হালনাগাদ করে সহজ ভাষায় জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে। তৃতীয়ত, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। চতুর্থত, দুর্গম এলাকায় নৌ ও আকাশপথে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ এবং জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে। পঞ্চমত, বন্যার পরে পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন এবং চিকিৎসাসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে এগুলো সবই স্বল্পমেয়াদি এবং আপাত দুর্যোগ মোকাবেলাকরণ কার্যক্রম। দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের বন্যা ব্যবস্থাপনাকে নতুনভাবে ভাবতে হবে।

বিশেষ করে, নদী, খাল ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার করতে হবে। নিয়মিত ড্রেজিং, দখলমুক্তকরণ এবং প্রাকৃতিক জলাধারণ এলাকা সংরক্ষণ ছাড়া ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়। একইসাথে, সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বৃষ্টিপাত, উজানের প্রবাহ এবং বাঁধ ব্যবস্থাপনা নিয়ে তথ্য আদান-প্রদান আরও কার্যকর করতে হবে। শহর পরিকল্পনায় জলাবদ্ধতা প্রতিরোধকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। খাল ভরাট করে উন্নয়ন নয়, বরং পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ সংরক্ষণ করতে হবে। পাহাড় কাটা এবং বন উজাড়ের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের বড় কারণগুলোর একটি হলো মানুষের হস্তক্ষেপ। সেই সাথে, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, বন্যাসহিষ্ণু কৃষি, উঁচু আশ্রয়কেন্দ্র, বহুমুখী স্কুল-আশ্রয়কেন্দ্র এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত দুর্যোগ স্বেচ্ছাসেবক গড়ে তুলতে হবে।

পঞ্চমত, আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, ডপলার আবহাওয়া রাডার, স্বয়ংক্রিয় বৃষ্টিপাত পরিমাপক যন্ত্র, নদীর রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কেননা, নির্ভুল পূর্বাভাসই কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রথম শর্ত। আর সবশেষে, স্থানীয় জনগণকে দুর্যোগ-সহনশীল সমাজ গঠনের জন্য প্রশিক্ষিত করতে হবে। স্কুল, কলেজ, ইউনিয়ন পরিষদ এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়মিত মহড়া, উদ্ধার প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের কাজ হিসেবে না দেখে এটি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশকে বন্যামুক্ত করা সম্ভব নয়, কিন্তু বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশ বন্যার দেশ, কিন্তু তাই বলে আমরা দুর্যোগের দেশে পরিণত হবো- এমনটা মেনে নেয়া যায় না। বিশ্বের অনেক দেশ সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকলেও এখনো পর্যন্ত টিকে আছে পরিকল্পনার মাধ্যমে। জাপান ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হয়েও প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেকটাই কমিয়েছে। বাংলাদেশও কিছুটা পেরেছে। বিশেষ করে, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশেষত, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ প্রমাণ করেছে যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অদম্য মনোবল, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং জনসম্পৃক্ততা থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। বন্যার ক্ষেত্রেও এখন আমাদের মান্ধাতা আমলের মানসিকতা পরিবর্তনের সময় এসেছে। প্রতিবছর ত্রাণ বিতরণ, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এবং পুনর্বাসনের চক্রে ঘুরপাক খাওয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যবস্থা, যেখানে দুর্যোগের পর নয়, বরং দুর্যোগের আগেই যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকবে। যেখানে নদীকে শত্রু নয়, বরং প্রাকৃতিক বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে; যেখানে উন্নয়নের প্রতিটি পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকি ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এবারের টানা বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল, বন্যা ও পাহাড় ধসের ঘটনাবলী আমাদের জন্য আরেকটি সতর্কবার্তা। আমরা কি এবারও এই পরিস্থিতিকে শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবেই দেখব, নাকি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে গ্রহণ করব- সেই সিদ্ধান্তও সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদেরই নিতে হবে।