রবিউল আউয়াল মাস আমাদের সামনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, কর্ম ও আদর্শকে নতুন করে স্মরণ করার সুযোগ এনে দেয়। তবে সীরাতুন্নবী (সা.) কেবল একটি নির্দিষ্ট মাসের আলোচনার বিষয় নয়। তিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল এবং ‘রাহমাতুল্লিল আলামীন’। তাঁর জীবন ও আদর্শের মূল শিক্ষা ছিল মানবতার কল্যাণ, ন্যায় প্রতিষ্ঠা, অন্যায়-অবিচারের অবসান, মানুষের মর্যাদা রক্ষা এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা। আজকের অশান্ত, সংঘাতময় ও মূল্যবোধের সংকটে আক্রান্ত পৃথিবীতে সে শিক্ষা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তাঁর আগমন কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা ভূখণ্ডের মানুষের জন্য ছিল না। তিনি এমন এক সময় পৃথিবীতে আবির্ভূত হন, যখন আরব সমাজে গোত্রীয় সংঘাত, সামাজিক বৈষম্য, দুর্বলদের ওপর শক্তিশালীদের আধিপত্য, নারী অবমাননা, অর্থনৈতিক শোষণ এবং নানা ধরনের নৈতিক অবক্ষয় ব্যাপকভাবে বিদ্যমান ছিল। তাঁর দাওয়াত ও নেতৃত্ব সেই সমাজে একটি মৌলিক পরিবর্তন সৃষ্টি করে। তিনি মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার, সততা, দয়া, ক্ষমা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্মানের শিক্ষা দেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল পবিত্র কুরআনের শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন। তিনি যা বলেছেন, নিজ জীবনে তা বাস্তবায়ন করেছেন। তিনি ছিলেন শিক্ষক, কিন্তু শুধু শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা দেননি; তাঁর কথা, কাজ, আচরণ ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রনায়ক, কিন্তু ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত মর্যাদা বা সম্পদ অর্জনের উপায় হিসেবে ব্যবহার করেননি। তিনি ছিলেন সেনাপতি, কিন্তু যুদ্ধের মধ্যেও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করেননি। তিনি ছিলেন পরিবারের কর্তা, কিন্তু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভালোবাসা, সম্মান ও কোমলতার আচরণ করেছেন। ফলে তাঁর সীরাত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার বাস্তব দৃষ্টান্ত।
বর্তমান পৃথিবীর দিকে তাকালে তাঁর আদর্শের প্রয়োজনীয়তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ চলছে, নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। রাজনৈতিক সংঘাত, ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি, সহিংসতা এবং সামাজিক অবক্ষয় মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অভূতপূর্ব হলেও মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংকট প্রকট। এই বাস্তবতায় মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া শুধু মুসলমানদের ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, মানবিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
তবে সীরাতের শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের একটি বড় দুর্বলতা হলো, আমরা অনেক সময় এটিকে আনুষ্ঠানিকতা ও আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি। রবিউল আউয়াল এলে সীরাত নিয়ে আলোচনা হয়, মাহফিল হয়, বক্তৃতা হয়; কিন্তু মাস শেষ হলে সেই চর্চাও অনেকটা স্তিমিত হয়ে যায়। অথচ মহানবী (সা.)-এর আদর্শ কোনো একটি মাসের জন্য নয়। একজন মুসলমানের জীবনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ অনুসরণের প্রয়োজন রয়েছে। তাই সীরাতুন্নবী (সা.)-এর চর্চাকে আরও গভীর ও কার্যকর করতে হবে। শুধু তাঁর জীবনের ঘটনা জানা যথেষ্ট নয়; সে ঘটনাগুলোর শিক্ষা বুঝতে হবে এবং বর্তমান জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। শিশুদের কাছে তাঁর সত্যবাদিতা ও দয়ার শিক্ষা, তরুণদের কাছে তাঁর নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধ, ব্যবসায়ীদের কাছে তাঁর সততা, রাজনীতিবিদদের কাছে তাঁর ন্যায়বোধ, পরিবারগুলোর কাছে তাঁর পারিবারিক আদর্শ এবং সমাজের সব মানুষের কাছে তাঁর মানবিকতার শিক্ষা তুলে ধরতে হবে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে সীরাতকে প্রাসঙ্গিকভাবে উপস্থাপন করা আজ অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক বিশ্বের নানা মতাদর্শ, ভোগবাদ, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে তরুণদের মূল্যবোধ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। তাদের কাছে মহানবী (সা.)-কে শুধু ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নয়, বরং একজন আদর্শ মানুষ, শিক্ষক, নেতৃত্বদাতা, সমাজসংস্কারক ও মানবতার পথপ্রদর্শক হিসেবে তুলে ধরতে হবে। সীরাতচর্চায় গবেষণা, যুক্তি, ইতিহাস ও সমকালীন বাস্তবতার সমন্বয় ঘটানো প্রয়োজন। রবিউল আউয়ালের শিক্ষা হোক সারা বছরের শিক্ষা। সীরাতুন্নবী (সা.)-এর আলোচনা হোক শুধু মঞ্চে নয়, জীবনে; শুধু বক্তৃতায় নয়, আচরণে; শুধু স্মরণে নয়, বাস্তবায়নে। মহানবী (সা.) যে ন্যায়, শান্তি, মানবিকতা ও কল্যাণের সমাজ প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, সেই আদর্শ ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে প্রকৃত সীরাতচর্চার সার্থকতা। আর মানবতার জন্য তাঁর প্রদর্শিত এই পথই হতে পারে অশান্ত পৃথিবীতে শান্তি ও কল্যাণের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি।